পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এখানে দুই পক্ষেরই আলাদা দায়িত্ব আছে। যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব খোঁজেন, সেটি যেমন ভুল; তেমনি রাজনৈতিক নেতাদেরও উচিত সেই সুযোগ না দেওয়া।
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকালে দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে চর্চিত শব্দ ‘পুলিশ’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলা’। এসব বিষয়ে খোলামেলা নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও সাবেক ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আশরাফুল হুদা। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশেষ প্রতিনিধি সাখাওয়াত কাওসার।
প্রশ্ন : ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় অনেকেই লক্ষ করেছেন, পুলিশ বাহিনীও এক ধরনের ট্রমার মধ্যে ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে, মব সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। আপনার মতে, সেই ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে ফিরতে পুলিশের এত সময় লাগল কেন?
আশরাফুল হুদা : এ প্রশ্নটি বোঝার জন্য আমাদের একটু পেছনের প্রেক্ষাপটে যেতে হবে। প্রায় দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠানই বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে কাজ করেছে। পুলিশও তার ব্যতিক্রম নয়। এর ফলে বাহিনীর ভিতরে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। যখন হঠাৎ করে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সময় লাগে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল অত্যন্ত অস্থির। বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে, থানায় হামলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। অনেক পুলিশ সদস্যও তখন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি যে কোনো বাহিনীর মধ্যেই মানসিক চাপ তৈরি করে। ফলে বাহিনীকে আবার সংগঠিত করে স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরতে সময় লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। আমার মতে, এখন পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল।
প্রশ্ন : ৫ আগস্টের পর প্রথমদিকে ইন-সার্ভিস কর্মকর্তাদের দিয়েই দায়িত্ব পরিচালনা করা হচ্ছিল। পরে দেখা গেল অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে কমিশনার থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হলো। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বাহিনীর ভিতরে কিছু অসন্তোষের কথাও শোনা গেছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এভাবে দায়িত্ব দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
আশরাফুল হুদা : আমার দৃষ্টিতে বিষয়টি পুরোপুরি অযৌক্তিক ছিল না। কারণ তখন পুলিশের উচ্চপর্যায়ে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অনেক কর্মকর্তা অনুপস্থিত ছিলেন, কেউ আত্মগোপনে ছিলেন, কেউ আবার আইনি জটিলতার মধ্যে পড়েছিলেন। ফলে নেতৃত্বের জায়গায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এ অবস্থায় অভিজ্ঞ ও সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাহিনীর ভিতরে দ্রুত একটি স্থিতিশীল কমান্ড কাঠামো তৈরি করা যায়। অভিজ্ঞতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সংকটের মুহূর্তে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়, যারা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। তারা তো দেশের ইতিহাসে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিয়েছেন। যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য খুব দরকার ছিল।
প্রশ্ন : ইন-সার্ভিস কর্মকর্তাদের ওপরই আস্থা রাখা যেত না? তাতে কি সমস্যা তৈরি হতো?
আশরাফুল হুদা : বাহিনীর কমান্ড ধরে রাখা খুব জরুরি ছিল ওই সময়। ওই মুহূর্তে নিচের থেকে হঠাৎ করে কাউকে ওপরে বসিয়ে দিলে আরও ডিফিকাল্ট হতো। বাস্তবতার দিক থেকে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকত। নেতৃত্বের একটি স্বাভাবিক ধাপ থাকে। একজন কর্মকর্তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতা ছাড়া হঠাৎ করে খুব উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সে সময় অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আনা হয়েছিল যারা পুরো বাহিনীকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারবেন।
প্রশ্ন : মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৮ মাসে মব সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
আশরাফুল হুদা : মব সহিংসতার বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে এটিকে শুধু পুলিশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগে অনেক জায়গায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা স্বার্থ হাসিলের জন্য মবের নামে সহিংসতা ঘটেছে। অবশ্যই পুলিশের দায়িত্ব ছিল দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সেই সক্ষমতা আবার অর্জন করেছে বলেই আমি মনে করি।
প্রশ্ন : পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম নিয়েও সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন থেকেও আপত্তি জানানো হয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
আশরাফুল হুদা : ইউনিফর্ম একটি বাহিনীর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিছু বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, দেশের আবহাওয়া ও কাজের পরিবেশ বিবেচনা করতে হবে। যদি এসব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, তাহলে এ ধরনের বিতর্ক হয়তো উঠত না। ইউনিফর্ম পরিবর্তনের বিষয়টি খুব তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে। যা ঠিক হয়নি।
প্রশ্ন : পুলিশে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাস্তবতা বিবেচনায় এটি নিয়ন্ত্রণে কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আশরাফুল হুদা : দুর্নীতি শুধু পুলিশের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের একটি বড় সমস্যা। তবে পুলিশের ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও শাস্তির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ করলে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, আবার ভালো কাজের স্বীকৃতিও দিতে হবে। পুরস্কার ও শাস্তি এই দুই ব্যবস্থাকে সমানভাবে কার্যকর করতে পারলে অনেক সমস্যা কমে যাবে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে। সিনিয়র অফিসারদের সুপারভিশন আরও বাড়াতে হবে। অপরাধ করলে সাজা দিতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কারও দিতে হবে। একজন মানুষের ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা না দিয়ে তার কাছ থেকে শুধু ভালো রেজাল্ট প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। জনগণেরও কিন্তু এখানে একটা বিরাট ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কারণ ২৪ আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে।
প্রশ্ন : পুলিশের ভিতরে আরও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নজরদারি বা কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা দরকার বলে অনেকে মনে করেন। আপনি কি একমত?
আশরাফুল হুদা : হ্যাঁ, আমি মনে করি অভ্যন্তরীণ নজরদারি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পুলিশের মধ্যেও এমন একটি কাঠামো থাকতে পারে, যারা নিয়মিতভাবে বাহিনীর ভিতরের অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রশ্ন : পুলিশের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব কীভাবে?
আশরাফুল হুদা : রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এখানে দুই পক্ষেরই আলাদা দায়িত্ব আছে। যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব খোঁজেন, সেটি যেমন ভুল; তেমনি রাজনৈতিক নেতাদেরও উচিত সেই সুযোগ না দেওয়া। কোনো মন্ত্রী মহোদয়কে তার নিজ জেলার পুলিশ সুপার যদি বলেন, ‘স্যার আমি আপনার লোক। তখন ওই মন্ত্রীর উচিত হবে, ওই দিনই ওই পুলিশ অফিসারকে ওখান থেকে তাড়ানো। তার ইউনিফর্মটা খোলার ব্যবস্থা করা। তাকে বলতে হবে, ‘তুমি যখন আমার লোক, তখন তোমার ইউনিফর্ম পরার দরকার নাই। তুমি আসো। আমার ব্যক্তিগত কাজগুলো কর।’ তবে অনেক রাজনীতিবিদ তাদের প্রশ্রয় দেন। তবে যেসব পুলিশ অফিসার এসব রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য চেষ্টা করেন তাদের বিষয়ে যদি বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাহলে আমি নিশ্চিত, এটা বহুলাংশে কমে আসবে। জনগণও প্রকৃত সেবাটা পুলিশের কাছ থেকে পাবে।
প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে আপনার মতামত কী?
আশরাফুল হুদা : সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অনেক সময় আমরা ভালো সুপারিশ করি, কিন্তু বাস্তবায়ন করি না। বাস্তবায়নই আসল বিষয়। আমি একটি দলের পুলিশ সংস্কার কমিটির সদস্য ছিলাম। সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের সঙ্গে আমাদের রিপোর্ট ৯০ শতাংশ মিলে গেছে। একটা সাজেশন ছিল যে, পুলিশ কমিশন তৈরি করা হবে। তবে কমিশনে কে চেয়ারম্যান হবেন? কে মেম্বার হবেন? এটা বড় কথা নয়। কাজটাই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়।
প্রশ্ন : পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সংস্কার কমিশনের কাছে দেওয়া প্রস্তাবনায় দুই পুলিশ বিভাগে দুই স্তরে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান তিন স্তরের চেয়ে আরও এক স্তরে অর্থাৎ এএসআই পদে নিয়োগ দিয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আশরাফুল হুদা : নিয়োগে তিনটা টায়ার থেকে দুই টায়ার নিয়ে আসা সম্ভব ছিল। এটা ভালো হতো। পদোন্নতিসহ অনেক জটিলতার নিরসন হতো।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতে আপনি বাংলাদেশ পুলিশকে কেমন দেখতে চান?
আশরাফুল হুদা : আমি চাই পুলিশ সত্যিকার অর্থে জনগণের বন্ধু হয়ে উঠুক। থানার সামনে লেখা থাকে ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’ এ কথাটি যেন বাস্তবেও প্রতিফলিত হয়। পুলিশ যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে জনগণও পুলিশকে সহযোগিতা করবে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা অনেক সহজ হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একের পর এক যেভাবে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও তাদের জীবনাচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ঠিক এ বিষয়টিই যদি আইজিপি তাঁর অধস্তনদের ওপর প্রয়োগ করতে পারেন, থানার ওসি যদি তাঁর আচরণের মাধ্যমে কনস্টেবলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, তাহলে পুলিশ দ্রুতই জনগণের সত্যিকারের বন্ধু হয়ে উঠবে।