দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশের স্বার্থে জুলাই সনদকে জনগণের কল্যাণে বাস্তবায়ন করা হোক। আমরা চাই এ পরিবর্তনের অঙ্গীকারগুলো যেন কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
২০২৬ সালের বহুল আলোচিত জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এ নির্বাচন নিয়ে জনমনে যেমন ব্যাপক কৌতূহল ছিল, ফলাফল-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে নানান বিতর্ক। নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে অংশগ্রহণ করে একটি মাত্র আসন লাভ করলেও দলটির দাবি তাদের জনসমর্থন ছিল ব্যাপক। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জোটের রাজনীতি এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (পীর চরমোনাই)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক হাসান ইমন
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সদ্য শেষ হলো। একজন শীর্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে এ নির্বাচনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রেজাউল করীম : এ নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। বিশেষ করে একটি গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যখন নির্বাচন হলো, তখন আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচনের আগে একটি প্রকৃত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হবে। কিন্তু নির্বাচনের মাঠ এবং ফলাফল-পরবর্তী বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা যা দেখছি, তাতে স্পষ্ট যে এ নির্বাচনে একটি ‘সূক্ষ্ম এবং কঠিন পরিকল্পিত মেকানিজম’ কাজ করেছে। আমাদের দেশের ছাত্র-জনতা, মা-বোন এমনকি শিশুরাও রাজপথে রক্ত দিয়েছিল একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায়। তারা চেয়েছিল জুলুম, চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার এবং মিথ্যা মামলার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই শুভবুদ্ধির উদয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এখনো পুরোপুরি ঘটেনি। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে বারবার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা নস্যাৎ করার জন্য এখনো নেপথ্য কারিগররা সক্রিয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাদের দল এককভাবে নির্বাচন করে মাত্র একটি আসন (বরগুনা-১) পেয়েছে। এটাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন? আপনাদের প্রত্যাশা কেমন ছিল?
রেজাউল করীম : আসনসংখ্যা দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বিচার করা ভুল হবে। আমরা নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে যে জরিপ চালিয়েছি এবং আমাদের পরামর্শক কমিটির যে তথ্য ছিল, তাতে আমরা অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আসনে জয়ের ব্যাপারে সুনিশ্চিত ছিলাম। বিশেষ করে বরগুনা-১ আসনে আমাদের বিজয় ঠেকানো সম্ভব হয়নি কারণ সেখানে আমাদের জনসমর্থন এতই বেশি ছিল যে কোনো মেকানিজমই টেকেনি। কিন্তু লক্ষ্মীপুর (২টি আসন), কুড়িগ্রাম (প্রায় ২টি আসন), বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর, বি-বাড়িয়া-৫, বরিশাল (৫-৬ আসন), পটুয়াখালী-১, ৩ ও ৪ এবং যশোর ও খুলনার বেশ কিছু আসনে আমাদের প্রার্থীরা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। সেখানে কালোটাকার দৌরাত্ম্য, মেকানিজম এবং পেশিশক্তি ব্যবহার করে জনমত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে নৈতিক মূল্যবোধের যে উত্থান ঘটেছে, তাকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে ইসলামী আন্দোলনকে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর একটি জোট বা সমঝোতার কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু পরে আপনারা কেন সেই সমঝোতা থেকে সরে এলেন?
রেজাউল করীম : এ বিষয়টি নিয়ে জনমনে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। আমরা সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে জোট করিনি। প্রথমে আমরা পাঁচটি সমমনা ইসলামী রাজনৈতিক দল মিলে একটি সমঝোতা এবং লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছিলাম। পরবর্তীতে ফ্যাসিজমবিরোধী আন্দোলনে শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে জামায়াত, জাগপা এবং ডেভেলপমেন্ট পার্টি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এ ঐক্যের ভবিষ্যৎ কেন অন্ধকারে গেল? কারণ হলো নেতৃত্বের অহমিকা। আমাদের মূল শর্ত ছিল প্রতিটি সিদ্ধান্ত পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে হবে। কিন্তু জামায়াত হঠাৎ করেই সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে শুরু করে এবং আমাদের ওপর তাদের নেতৃত্ব চাপিয়ে দিতে চায়। যেখানে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, মানবতা এবং দেশরক্ষার গ্যারান্টি আলোচনা বা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আসে না, সেখানে ইসলামী আন্দোলন থাকার প্রয়োজন মনে করেনি। আমরা নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস করিনি বলেই তখনই সেই সমঝোতা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিই।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগে আপনাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেই বৈঠকে আপনাদের দাবি বা প্রত্যাশা কী ছিল?
রেজাউল করীম : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। আমরা বলেছি, যদি আপনারা জনগণের চাওয়াপাওয়া এবং দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ পরিচালনা করেন, তবে ইসলামী আন্দোলন আপনাদের পাশে থাকবে। কিন্তু যদি আপনারা গত সাড়ে ১৫-১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চরিত্রের পুনরাবৃত্তি করেন, তবে আমরা রাজপথে আপনাদের কঠোর প্রতিবাদ জানাব। বর্তমান সরকারের উদ্দেশে আমাদের পরামর্শ হলো, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। দেশে বর্তমানে খুন, ধর্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলার যে অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারের পরিণতিও আগের মতো ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
রেজাউল করীম : স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমরা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। আমরা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সরকার কি স্থানীয় নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতো মেকানিজম বজায় রাখবে নাকি একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদি আমরা দেখি যে সরকার কেবল নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী করার নীলনকশা হাতে নিয়েছে, তবে আমরা সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ‘জুলাই সনদ’ এবং সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের মতো রাজনৈতিক সংস্কারগুলো নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
রেজাউল করীম : জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের মধ্যে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল, যা এখনো বিদ্যমান। কারণ সংস্কার কমিশনগুলোতে বিএনপি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছে। এখন তারা যেহেতু ক্ষমতায় এবং তাদের হাতে আইন পাসের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তাই তারা এ সংস্কারগুলো কতটুকু করবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমাদের দাবি হলো, দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশের স্বার্থে জুলাই সনদকে জনগণের কল্যাণে বাস্তবায়ন করা হোক। আমরা চাই এ পরিবর্তনের অঙ্গীকারগুলো যেন কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী পাঁচ বছরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?
রেজাউল করীম : ইনশাল্লাহ, আল্লাহ যদি কবুল করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ইসলামী আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে চাই। বর্তমান বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ মুসলমান বসবাস করে এবং তারা ইসলামকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। হয়তো অনেকে এখনো রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ বা বিভ্রান্তির কারণে বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছে না, কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যে তারা ইনশাল্লাহ সঠিক পথ খুঁজে পাবে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে দুর্নীতির মুক্তি এবং প্রকৃত ইনসাফ কায়েমের জন্য ‘হাতপাখা’ প্রতীকের বিকল্প নেই। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে একটি বৈষম্যহীন এবং ইসলামের আদর্শে উদ্ভাসিত বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই।