শিক্ষা এমন সেক্টর যেখানে তড়িঘড়ি করে কিছু করা ঠিক নয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী আমলে আমরা দেখলাম, কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পড়ে তড়িঘড়ি করে শিক্ষা আইন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে একজন আদর্শ নাগরিকের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারে ছিল না শিক্ষা খাত। তাদের এজেন্ডা থেকে শিক্ষায় অগ্রাধিকারের বিষয়টি ছুটে গিয়েছিল মনে হয়। তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। মানবসম্পদ তৈরির শিক্ষা খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে আমরা দেখেছি শিক্ষায় তেমন কাজ তো হয়নি, বরং নেতিবাচক কিছু সংস্কৃতি আমরা দেখেছি। শিক্ষাটা অগ্রাধিকার থেকে বিচ্যুত হওয়ায় গত ১৮ মাসে সরকার এদিকে দৃষ্টি দিতে পারেনি বলে মনে করি। শিক্ষা নিয়ে একটি কমিশনও করতে পারেনি তারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও অনেক অভিভাবকের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষায় যে নেতিবাচক বিভিন্ন সংস্কৃতি অন্তর্বর্তী আমলে তৈরি হলো, তা আমরা অতীতে দেখিনি। এসব ঘটনা দেখে আমরা হতচকিত হয়েছি। আমরা দেখলাম শিক্ষকদের হেনস্তা করা হলো, নানান অজুহাতে তাদের শারীরিক হেনস্তা করে পদ থেকে টেনে নামানো হলো। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এমন চিত্র আমরা লক্ষ করেছি। ঢালাওভাবে অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই রেশ ধরে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এ সম্পর্ক উন্নয়নে শক্ত হাতে কিছুই করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। গুটিকয় শিক্ষার্থীর কাছে সরকার হার মেনেছে বিভিন্ন সময়। অস্থিরতার সেই শুরু। সমাজে কিশোর অপরাধ এখন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বড় উদ্বেগের কারণ। অনেক ছাত্র এখন শিক্ষকদের অমান্য করেন। অভিভাবকদেরও মানতে চান না। আমরা উদ্বেগের মধ্যে লক্ষ করেছি অন্তর্বর্তী আমলে অনেক শিক্ষকের চাকরি চলে গেছে। একটি গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অভিযুক্তদের চাকরিচ্যুত করেছে। তড়িঘড়ি করে এ বিষয়গুলো করা হলো। চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা বেতনভাতা নিয়ে রাজপথে আন্দোলন শুরু করলেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলন করলেও শিক্ষকদের কথা না শুনে জলকামান দিয়ে হেনস্তা করা হলো। এগুলো তো কাম্য ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হলেও তারা এসেছিল সময়ের প্রয়োজনে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে আমরা খুবই হতাশ হয়েছি। একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী আমলে।
প্রথম দিকে একটা অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছিল মব সংস্কৃতি বা অস্থিরতার মাধ্যমে। অন্তর্বর্তী আমলের শুরুতে গুটিকয় এইচএসসি পরীক্ষার্থী সচিবালয়ে গিয়ে মব তৈরি করল। যারা সচিবালয়ে মব তৈরি করল, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাস দিয়ে দিল! তখন পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর কথা বিবেচনা করেনি সরকার। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মব সংস্কৃতি শুরু হলো। সে জায়গা থেকে হতাশা বিরাজ করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। একদিকে মব সংস্কৃতি, অন্যদিকে পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। সংগত কারণেই শিক্ষার্থীরা তখন লেখাপড়ামুখী ছিল না।
মহামারি করোনার পর থেকে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় যে ধস নেমেছে, তা সামাল দেওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী আমলে মব সংস্কৃতির মাধ্যমে আরেকটি ধস নেমে এসেছে। এ রেশ কাটতে কত দিন লাগবে তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী আমলে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদেরও সরিয়ে দেওয়া হলো, কিন্তু তাদের নিয়োগ তো দেওয়া হয় একটি নিয়মনীতি অনুসরণ করে। উপাচার্যদের পরিবর্তন করতে হলে তো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সে প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে সরানো হলো। কেউ কেউ অবশ্য আত্মসম্মানের দায়ে নিজ থেকে সরে গেছেন। উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এই নেতিবাচক সংস্কৃতি যে তৈরি হলো, এটার ধাক্কা সামাল দিতে আমাদের দীর্ঘ সময় লাগবে। এ ধরনের পদে পরিবর্তনের জন্য সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া মেনটেইন করা উচিত, তা অনেকটা ধামাচাপাই পড়ে গেছে বলা যায়। এটি আমাদের জন্য অশনিসংকেত। দলগতভাবে শিক্ষকদের আনুগত্যকে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আনুগত্য দেখে কখনো উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।
শিক্ষা এমন সেক্টর যেখানে তড়িঘড়ি করে কিছু করা ঠিক নয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী আমলে আমরা দেখলাম, কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পড়ে তড়িঘড়ি করে শিক্ষা আইন করার চেষ্টা হয়েছে। এ আইন নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র চার দিন সময় দেওয়া হয়েছিল, এর মধ্যে দুই দিনই ছিল ছুটি। অর্থাৎ মাত্র দুই কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল। আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই শিক্ষা আইন করা হচ্ছিল। এ আইন তো দেশের পুরো মানুষকেই প্রভাবিত করবে। কীভাবে তড়িঘড়ি এ আইন করার চেষ্টা হয়েছিল তা আমার বোধগম্য হয়নি। বর্তমান সরকার পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এ পরীক্ষা চালুর ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় এটি এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীরা কোটা নিরসনের জন্য প্রাণ দিল, অথচ এখানে আবার কোটার ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তা ছাড়া বৃত্তি পদ্ধতির কারণে কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বই বাণিজ্য উৎসাহিত হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় এমন দেখেছি আমরা। বৃত্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণায় ইতোমধ্যে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কমপক্ষে পাঁচটি গাইড বাজারে এসেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাড়তি খরচের চাপ বেড়েছে। তাদের মানসিকতায় এটি গেঁথে গেছে, পরীক্ষায় বৃত্তি পেতেই হবে। এটি বৈষম্য তৈরি করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময় শিক্ষা বাণিজ্য ভীষণভাবে শুরু হয়েছিল। নিয়োগ বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য ইত্যাদি চলে এসেছে শিক্ষা সেক্টরে। বাণিজ্যের মধ্যে শিক্ষা পড়ে গেলে তো শিক্ষার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে শিক্ষার ব্যয়ের ৭১ শতাংশ অভিভাবককে বহন করতে হয়। এটি দরিদ্র মানুষের জন্য বড় বোঝা। বাজেটকে কেবল বরাদ্দ হিসেবে না দেখে মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত।
সরকার কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি রিভিউ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এর ভিত্তিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং সেসব ক্লাসের শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনা/ভাতা প্রদান করা যেতে পারে। কারিকুলাম রিভিউ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার সুপারিশ করছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইডনির্ভর হয়ে না ওঠে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি।
আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শিখন দক্ষতা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। করোনা-পরবর্তী অনেক গবেষণা বলছে, ইংরেজি বা গণিত নয়, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাতেও কাম্য দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও এমন দেখেছি আমরা। প্রাথমিকে ঘাটতি থাকলে পরবর্তী শ্রেণিতে এ ঘাটতি বাড়তেই থাকে। এমনকি সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বলেছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অত্যন্ত নিম্নমানের। দেশে-বিদেশে সবখানেই যদি শিক্ষার মানে এমন নেতিবাচক চিত্র দেখা যায়, দক্ষতার সংকট দেখা যায় তবে বাইরের পৃথিবী আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রসারিত না হয়ে বরং সংকুচিত হয়ে যাবে।
এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তন শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উপকূলীয় এলাকায় মার্চ মাসেই নানান দুর্যোগ শুরু হয়। সতর্ক সংকেতের কারণে তারা কাজে যেতে পারছে না, তাদের রুটিরুজির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্যের সংস্থানের সংকুলান না থাকলে তো শিক্ষায় বড় প্রভাব পড়বেই। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা বা ঝড়ের কারণে স্কুল বন্ধ থাকে, পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার অনেক বেড়ে গেছে। জেলে পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ায় শিশুদের শিক্ষার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজেটে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত, কিন্তু আমরা ২ শতাংশের ওপরে উঠতে পারিনি। অতীতে কর্তৃত্ববাদী সরকার এটা নিয়ে কোনো পাত্তাই দেয়নি। শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি করে ঝরে পড়া, বাল্যবিয়ের শিকার, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী (প্রতিবন্ধী, ভিন্ন জাতিসত্তা, চা বাগানের অধিবাসী) ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ চর, হাওড়, পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাজেট যথাযথভাবে ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারি নিশ্চিতকরণের জন্য যথাযথ মেন্টরিং ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে। উচ্চশিক্ষা খাতে দেশে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এ খাতকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষায় নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উচ্চশিক্ষার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নির্বাহী পরিচালক গণসাক্ষরতা অভিযান