কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ করা সম্ভব নয়। সেটা করতে হলে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে
যেকোনো ক্রাইসিস যখন হয়, তখন একটা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম থাকা দরকার। আমাদের দুর্বলতা হলো আমরা এখনো ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ বলে কিছু করতে পারিনি। একটা ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল যদি থাকে, যেখানে সব ধরনের স্টেকহোল্ডাররা থাকবে। সেখানে সিভিলিয়ান পলিসি মেকারস, সামরিক পলিসি মেকারস, ব্যবসায়ী, একাডেমিশিয়ান, গবেষক, মিডিয়া, ইন্টেলিজেন্সসহ সব শ্রেণির অংশগ্রহণ থাকবে। এমন একটা কাঠামো থাকা দরকার, যারা আগে থেকেই সিনারিও (কাঠামো) তৈরি করে রাখবে। মধ্যপ্রাচের এ সংঘাত শুরুর আগে থেকেই যুদ্ধের বিষয়টি বোঝা যাচ্ছিল। এ কাঠামো থাকলে তারা যুদ্ধের স্থায়িত্ব বিবেচনায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে পারত। সার্বক্ষণিক গবেষণার মধ্যে থাকার কারণে তারা নতুন সরকারকেও বিভিন্ন বিকল্প সিনারিও দিতে পারেন। এসব বিকল্প থেকে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারত। আমাদের এ ধরনের কাঠামো থাকা জরুরি।
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির একটি ইতিহাস আছে। জিয়াউর রহমানের আমলের সেই গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ থেকে এটি এসেছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি করতে গেলে কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। আমাদের বড় দুর্বলতা হলো, দেশের এলিট শ্রেণি কিংবা পলিসি মেকারদের অনেকেরই এক পা দেশের বাইরে। দুই দেশের নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট রেখে বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব নয়। যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তাদের দুই পা-ই বাংলাদেশেই থাকতে হবে। ভারত, চীন বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশে একক নাগরিকত্বের নিয়ম আছে। আমাদের নিয়ম থাকলেও অনেকে তা মানেন না। সংকটের সময় এলিটরা যদি বিদেশে চলে যান, তবে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে না।
এ ছাড়া অর্থনীতিকে ডাইভার্সিফাই (বহুমুখী) করতে হবে। একসময় আমরা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। বর্তমানে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে আমাদের অর্থনীতি রপ্তানিকারী দু-একটি দেশের ওপর অধিক নির্ভরশীল। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ করা সম্ভব নয়। সেটা করতে হলে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। আসন্ন বহুমাত্রিক কাঠামোতে টিকে থাকতে হলে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
বর্তমান সরকারের সামনে ইমিডিয়েট চ্যালেঞ্জ হলো-মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়া এবং জ্বালানিসংকটের কারণে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের প্রবাসী আয়ের সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী কর্মীরা সেখানে থাকতে চাইবে না এবং সুযোগ পেলেই দেশে ফেরত আসবেন। এর জন্য সরকারের প্রস্তুতি দরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেতিবাচক ছিল। দেশে সমালোচনা আছে যে, ভারত কেবল একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক করেছিল, জনগণের সঙ্গে নয়। সেই জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে পেশাদারত্বের প্রয়োজন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল বিবেচনায় বাংলাদেশের জনগণ মনে করে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল একতরফা। সেখানে ভারত যতটা লাভ করতে পেরেছে, বাংলাদেশ তত লাভ করতে পারেনি। এটাই ভারত সম্পর্কে মানুষের ধারণা। এটা ভুলও হতে পারে। তবে এ ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে এ ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। ভারতেরও উপলব্ধি হয়েছে, তারা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল, যা তাদের উচিত হয়নি। তাদের সম্পর্ক করা উচিত জনগণের সঙ্গে। এর জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ভারতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কথাবার্তায় পেশাদারত্ব আনা প্রয়োজন। অনেক সময় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির অযাচিত কথার কারণে সম্পর্কের অবনতি হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তেমন প্রভাব পড়ার কথা নয়। শেখ হাসিনা তার জীবনে তৃতীয়বারের মতো ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ভারত দালাই লামাকে আশ্রয় দিয়েছে। এর ফলে কিন্তু চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। লন্ডনেও বিভিন্ন দেশের নেতারা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকেন। এর কারণে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয় না। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত রাজনীতি না করে অর্থনৈতিক ও কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করতে হবে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যু এই সরকারের জন্যও বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। দাতা সংস্থাগুলো অনেকটা বলতে শুরু করেছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থাকুক। তারা মিয়ানমারের ওপর বড় ধরনের কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হলে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গে বসতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের সহায়তার প্রয়োজন আছে। এ চারটি পক্ষকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এ চার পক্ষকে ছাড়া বাইরের কেউ এসে এ সংকটের সমাধান করতে পারবে না।
পশ্চিমা রাষ্ট্র সম্পর্কে আমরা যতটা জানি পূর্বের দেশগুলো সম্পর্কে খুব ভালোভাবে চিনি না। মিয়ানমারের কাঠামো সম্পর্কে জানার বিরাট ঘাটতি রয়েছে আমাদের মধ্যে। মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত নয়, তাদের আলাদা আলাদা স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। এখানে কয়েকটা জিনিস খেয়াল রাখা দরকার, আরাকান আর্মি সম্ভবত স্বাধীন রাষ্ট্র চাইছে না, বরং তারা মিয়ানমারের ভিতরই উচ্চতম স্বায়ত্তশাসন (হাইপার অটোনমি) চাইছে। ফলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে বাদ দিয়ে শুধু আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত হবে না।
রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ‘চাপের’ বদলে ‘সুযোগ’ তৈরি করতে হবে। এটাকে আমরা বলছি ‘রাখাইন রিকনস্ট্রাকশন প্ল্যান’, যা অনেকটা মার্শাল প্ল্যানের মতো। যেখানে আমরা একটা আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারি। যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করবে। এতে সব পক্ষই লাভবান হবে। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মিকে সঙ্গে নিয়েই রোহিঙ্গাসংকট সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
তবে কিছু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওর স্বার্থের কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রেখে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কারণ এতে তাদের আর্থিক সুবিধা হয়। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক হতে হবে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সামরিক সম্পর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ একটি ‘নেট সিকিউরিটি রিসিভার’ হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে বন্দর সুবিধা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশকে নয় বরং একাধিক দেশকে সমানভাবে দেওয়া হবে। জিবুতি ও সিঙ্গাপুর এ কাজটি করে। বাংলাদেশকে ঘিরে চীন ও আমেরিকার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এ দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে। আধাদক্ষ কর্মীর পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। তবে এখানে কাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আধাদক্ষ যেসব কর্মী, যায় তারা সেখানে পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় একটা সময় পর তারা দেশে ফিরে আসে। তবে তারা নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। অন্যদিকে একজন দক্ষ কর্মী যখন ইউরোপে যান তখন সেই কর্মী সেখানে স্থায়ী হওয়ার চিন্তা করেন। দেশেও ঠিকঠাক রেমিট্যান্স পাঠান না। ফলে দক্ষ কর্মী রপ্তানিতে একটা রিস্ক থেকেই যাচ্ছে। এজন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন যেখানে কর্মীর পেছনে বিনিয়োগের অংশ রাষ্ট্র আদায় করতে পারে। থাইল্যান্ডে এ ধরনের একটি সিস্টেম রয়েছে। জলবায়ুসংকট নিরসনে কপ সম্মেলন কিংবা আন্তর্জাতিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের আশায় বসে থাকা বৃথা। কারণ ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চাহিদার বিপরীতে ১০০ বিলিয়নও জমা হয়নি। জলবায়ু সমস্যার সমাধানে নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের প্রচণ্ড উদ্ভাবন শক্তি আছে, সেখানে মনোযোগ দিতে হবে। ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ- ঝড় ও বন্যা পরিস্থিতি নিরসনে স্থাপত্যের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। এসব জলবায়ু ঝুঁকি মাথায় রেখেই আমাদের স্কুল, বাড়িঘর ও নৌপথ পরিকল্পনা করা দরকার।