ইরান যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-উত্তর সময়ে বাংলাদেশকে একসঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে এবং এতে বাংলাদেশের সক্রিয় ও সার্বিক অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক
বিদেশে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে প্রবাসী জনগোষ্ঠী পালন করছেন এক বিশাল ভূমিকা। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজজীবন প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে শক্তিশালী ভিত্তি পেয়েছে। দাঁড়িয়ে আছে আপন মহিমায়। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রবাসীরা পালন করছেন পাইলটের ভূমিকা। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ঝুঁকিতে ফেলেছে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানকে। বাংলাদেশ বিশ্বের টপ টেন রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। বিশ্বের ১৬৪টি দেশ থেকে প্রায় ২ কোটি প্রবাসী কর্মী ও দ্বৈত নাগরিক মিলে গত ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৩২.৮১ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ৫০ বছরে (১৯৭৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত) প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৫৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যার পুরোটাই ব্যাংকিং চ্যানেলে এসেছে এবং দেশের মূল অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে যুক্ত হয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম এই আর্থিক খাতকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনাগত দিনগুলোতে এ ক্ষতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে প্রবাসী কর্মীদের। তাদের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগার অচল হয়ে গেছে। কর্মহীনতার পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের জীবন। ইতোমধ্যে চার বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন গোলার আঘাতে। আহত হয়েছেন অনেকে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ছয়টি দেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রেরিত প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা- সৌদি আরবে ৭১ লাখ ৬১ হাজার ৮৬৯, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৯৪৪, ওমানে ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৪, কাতারে ১০ লাখ ৮৪ হাজার ৪৭৩, কুয়েতে ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৮, বাহরাইনে ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৯১ এবং লেবাননে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩০ জন। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ২৩৯ জন। দুঃখের খবর হলো-বাংলাদেশের প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সাতটি দেশই আজ যুদ্ধবিধ্বস্ত।
প্রবাসীদের অসামান্য অবদানের ফলে বেশ কয় বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের টপ টেন রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ হিসেবে আসন করে নিয়েছে। ২০২৫ সালে ৩২.৮১ বিলিয়ন ইউএস ডলার রেমিট্যান্স আহরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী বিশ্বের পঞ্চম স্থান অর্জনকারী দেশ হিসেবে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশসমূহের মধ্যে জিসিসির ছয়টি দেশ থেকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স পেয়েছে মোট রেমিট্যান্সের ৫১ শতাংশ। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ইরান যুদ্ধ বড় আঘাত হেনেছে ঠিক এ অঞ্চলটিতেই। বাংলাদেশের জন্য আরও বড় দুঃসংবাদ হলো, ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শ্রমবাজার ও জ্বালানিসহ খাদ্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করে বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতির এই মহাসংকট কাটিয়ে ওঠা সরকারের জন্য এক পাহাড়সমান বিপদ। সরকার বিকল্প ব্যবস্থায় জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থা নিয়েছে এবং অন্যান্য ঘাটতি মোকাবিলায় উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে এখনই কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। এ সময় গোটা দেশ ও রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে উদ্যোগী হতে হবে। নাগরিক সমাজের অভিজ্ঞ লোক, বিশেষ করে যাদের বিভিন্নভাবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সরকার কাজে লাগাতে পারে। বিশ্বে এ রেওয়াজ আছে। তারা বিপদের সময় সবাইকে কাজে লাগায়। বলে রাখা ভালো, আমলাতন্ত্র এ সম্পৃক্তির বিষয়ে বাগড়া দেবে, এটি অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি। অত্যন্ত সাধারণ জীবনাচার ও সাধারণ পোশাক পরিচ্ছদে রাষ্ট্রীয় আচার পালনকারী বর্তমান সরকারপ্রধানকে বলিষ্ঠভাবে দীর্ঘদিনের এ অচলায়তন ভাঙতে হবে। যা দেশবিদেশে নাগরিক সমাজ ও জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হবে এবং ভবিষ্যতেও এ-জাতীয় সংকট মোকাবিলায় দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে উৎসাহিত করবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার রক্ষায় দেশগুলোর বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জনবল বৃদ্ধি ও দক্ষ প্রবাসীবান্ধব কর্মী নিয়োগ অত্যাবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও রীতিনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল দূতাবাস কর্মকর্তা, বিশেষ করে প্রধান ব্যক্তিদের আপৎকালীন সময়ে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োজিত করা প্রয়োজন। এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মিশনগুলোতে কর্মীদের মধ্যে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। ‘আছি কী নেই’ এ অনিশ্চয়তার কারণে কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগের মনোবল পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে অতি দ্রুত অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধমগ্ন দেশগুলোর প্রবাসীরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দিনযাপন করছেন। একদিকে কাজের বিপত্তি, মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও কাজ হারানোর ভয়, অন্যদিকে বোমার আঘাতে প্রাণ হারানোর আশঙ্কা তাদের তাড়া করছে। বর্তমান সরকার ও প্রবাসী মন্ত্রী সবাই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু সমস্যা এত ব্যাপক যে, জাতীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি একটি নিবিড় পরিকল্পনা ছাড়া এ ব্যাপারে সফলতা পাওয়া কঠিন। ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইতোমধ্যে চার বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৪ জন। যুদ্ধ চলতে থাকলে এ সংখ্যা দিনদিন বাড়তে পারে। যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরানোর কাজ মাথায় রেখে এগোতে হবে মিশনগুলোকে। ২৪ ঘণ্টা হটলাইনে যোগাযোগের সুযোগ রাখতে হবে। তা ছাড়া খাদ্যসংকট আসতে পারে সামনের দিনগুলোতে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে পারে হরমুজ প্রণালি বন্ধ অথবা আক্রমণের কেন্দ্র বানানোর ফলে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসহ সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে সব ধরনের পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর বিমান পরিবহনে চরম অচলাবস্থা বিরাজ করছে। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-উত্তর সময়ে বাংলাদেশকে একসঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে এবং এতে বাংলাদেশের সক্রিয় ও সার্বিক অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে মাথায় রাখতে হবে, যুদ্ধ-উত্তর পুনর্গঠন, নির্মাণ ও বিনিয়োগের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ যেন যুক্ত থাকতে পারে। সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের ছয়টি দেশ ও লেবাননে ১ কোটি ৪২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর কর্মসংস্থান হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে এই প্রবাসী কর্মীরাই তাদের শ্রম ও ঘাম দিয়ে দেশগুলোকে গড়েছেন। এত ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কর্ম ও জীবনের সঙ্গে ওই দেশগুলো এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জাতি লক্ষ্য করছে, বর্তমান সরকারপ্রধান অত্যন্ত সাবলীলভাবে দ্রুতগতিতে কাজ করছেন। আশা করি সরকারের পুরো কাঠামোই প্রধানমন্ত্রীর গতিতে এগিয়ে যাবে। ১৮ কোটি মানুষের অর্থনীতি ও জীবনজীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসীরা অপরিহার্য। এরা বাংলাদেশের প্রাণ। সুতরাং দেশের স্বার্থে প্রবাসীদের চোখের মণির মতো রক্ষা করে এগোতে হবে বাংলাদেশকে।