তরুণ সমাজের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তা, বিশ্লেষণধর্মী মনন, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং শালীন মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বসুন্ধরা শুভসংঘের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
“আধুনিক সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে” শীর্ষক প্রাণবন্ত এ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, তথ্যভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপন এবং মননশীল আলোচনা পুরো আয়োজনকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌক্তিক চিন্তার বিকাশ এবং সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়। বিতর্কে সরকারি দল আধুনিক সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে যুক্তি দেন, অতি আধুনিক পোশাক ও পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ তরুণ সমাজকে নিজস্ব ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
তারা বলেন, ইংরেজি ভাষার অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক তরুণকে নিজেদের সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর ও অপপ্রচার সামাজিক অবক্ষয় তৈরি করছে বলেও মত দেন তারা।
সরকারি দলের সদস্যরা তাদের বক্তব্যে বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানতে হবে নিজের শিকড় থেকে, ফেসবুকের চোখ দিয়ে নয়। তারা আরও বলেন, একসময় গ্রামীণ জীবনে মৃৎশিল্পের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও এখন কাচ ও প্লাস্টিকের পণ্যের আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় পোশাকের পরিবর্তে পশ্চিমা সংস্কৃতিনির্ভর পোশাকের বিস্তার তরুণদের অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত করছে বলেও দাবি করেন তারা।
অন্যদিকে বিরোধী দল যুক্তি তুলে ধরে বলেন, সংস্কৃতি একটি সমাজের মানুষের সামগ্রিক জীবনধারা। সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন স্বাভাবিক এবং প্রযুক্তি এ পরিবর্তনকে আরও গতিশীল করেছে। বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের বক্তব্যে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির কারণে মানুষ দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করতে পারছে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও সহজভাবে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তারা বলেন, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশীয় সংস্কৃতিও নতুনভাবে বিশ্বদরবারে পরিচিতি পাচ্ছে। নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, তাঁতের শাড়ি, গামছা ও বিভিন্ন কুটির শিল্পের আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
তাদের মতে, সংস্কৃতির আধুনিকায়ন ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনীন করে তোলে।
বিতর্ক শেষে বিচারকমণ্ডলীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বিতর্ক কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিকাশের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। তারা বলেন, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মত প্রকাশ এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার চর্চা একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শাহেদ আক্তারের পরিচালনা ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগীত বিভাগের প্রভাষক ও বসুন্ধরা শুভসংঘ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপদেষ্টা বাবুল হোসাইন এবং বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও উপদেষ্টা সাবেকুন খালেক সুবা।
সরকারি দলের সদস্য হিসেবে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন মাহফুজ আলম সমুদ্র, জুয়েল রানা, ফেরদৌস হোসেন ও খুশি। বিরোধী দলের সদস্যরা হলেন চৈতি গুপ্তা পায়েল, তিশা সাহা, তনুশ্রী মোহন্ত ও কাব্যশ্রী রায়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অর্থ সম্পাদক জুয়েল রানা, সাংগঠনিক সম্পাদক আকাশ রায়, প্রচার সম্পাদক মো. ফেরদৌস হোসেন, নারী বিষয়ক সম্পাদক চৈতি গুপ্তা পায়েল, ইভেন্ট সম্পাদক আরেফিন ইসলামসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্যরা।
প্রতিযোগিতা শেষে বিচারকমণ্ডলীর রায়ে বিরোধী দল বিজয়ী হয়। বিজয়ী ও পরাজিত উভয় দলকে বই উপহার দেওয়া হয়।
বসুন্ধরা শুভসংঘ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. শাহেদ আক্তার বলেন, ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের মেধা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকাশে এ ধরনের শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি অংশগ্রহণকারী সকল প্রতিযোগী, আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিয়মিত বিতর্কচর্চা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার আহ্বান জানান।
বিডি প্রতিদিন/আরকে