নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি যেমন অপার সৌন্দর্যের উৎস, তেমনি কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে জনজীবনের কঠিন পরীক্ষাও। দেশের উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো গরম মৌসুমে অনেক সময় শুকিয়ে পরিণত হয় বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে।
সেই জমিতে কৃষকরা বুনে দেন স্বপ্নের বীজ। কিন্তু বর্ষা কিংবা আকস্মিক ভারি বৃষ্টিতে সেই শান্ত জমিই মুহূর্তে রূপ নেয় উত্তাল জলরাশিতে। তখন ফসল রক্ষার লড়াই হয়ে ওঠে কৃষকের জীবনসংগ্রামের আরেক নাম।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর ও বড়বাড়ী ইউনিয়নের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া মহেন্দ্রনগরের মরাসতি নদীতেও সম্প্রতি দেখা দিয়েছে এমনই এক পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন প্রায় শুকিয়ে থাকা নদীর বুকে স্থানীয় কৃষকরা চাষ করেছিলেন ধান। অনেকেই ধারদেনা করে, কেউবা এনজিও কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন স্বপ্নের ফসল। কিন্তু হঠাৎ কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে মরা নদীতে পানি বাড়তে শুরু করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কৃষকদের মাঝে। পানির তোড়ে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় পাকা ধানের ক্ষেত।
ঠিক এমন সংকটময় সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেয় বসুন্ধরা শুভসংঘ লালমনিরহাট জেলা শাখার সদস্যরা। সংবাদ পেয়ে সংগঠনের তরুণরা দ্রুত উদ্যোগ নেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় এগিয়ে যাওয়ার।
শুক্রবার (১৫ মে) সকাল ৯টায় সংগঠনের নেতারা মরাসতি নদী এলাকায় উপস্থিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়া দুই কৃষকের পাকা ধান কেটে নিরাপদে ঘরে তুলে দেন। কৃষকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধান কাটায় অংশ নেন সংগঠনের সদস্যরা। নদীর তীরে তখন দেখা যায় এক অন্যরকম মানবিক দৃশ্য—যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা আর সহমর্মিতা মিশে গেছে কৃষকের হাসিতে।
স্থানীয়রা জানান, সময়মতো ধান কাটতে না পারলে পুরো ফসল পানিতে নষ্ট হয়ে যেত। এমন অবস্থায় তরুণদের এই উদ্যোগ কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
মহতী এ উদ্যোগে অংশ নেন বসুন্ধরা শুভসংঘ লালমনিরহাট জেলা শাখার উপদেষ্টা তন্ময় আহমেদ নয়ন, সাধারণ সম্পাদক মো. নাঈম রহমান, প্রচার সম্পাদক মাহাবুব, সদর উপজেলার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় চন্দ্র বর্মন, কার্যকরী সদস্য পবিত্র চন্দ্র রায়, আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক নোবেল সরকার নিরব এবং সদস্য ভূপতি রায়, মো. নাহিদ আলম, রাব্বি, হৃদয়, হাবিল, মিজু, আরাফাতসহ আরও অনেকে।
ধান কাটা কার্যক্রম শেষে জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. নাঈম রহমান বলেন, “বসুন্ধরা শুভসংঘ লালমনিরহাট জেলা শাখা সবসময় মানবিক ও শুভ কাজের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের অঙ্গীকার। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।”
স্থানীয় কৃষকরাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, সমাজের তরুণরা যদি এভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে দুর্যোগ মোকাবিলা অনেক সহজ হয়ে যায়। তাদের এই সহযোগিতা শুধু ধান রক্ষা করেনি, কৃষকদের মনেও নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
বিডি প্রতিদিন/আরক