শ্রীমঙ্গলে গারো ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা সেমিনার উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষকবৃন্দ।
বিশ্বব্যাংক ও ইউজিসি অর্থায়নে পরিচালিত হিট উপ-প্রকল্পের অধীনে শাবিপ্রবির শিক্ষকদের পরিচালিত এই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য রবিবার শ্রীমঙ্গলের বিদ্যাবিল চা বাগানের একটি স্কুলে উপস্থাপন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গবেষক দলের তত্বাবধায়ক, সহকারী গবেষক দল এবং গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা।
সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের তিনটি করে গারো গ্রাম এবং তিনটি খাসিয়া পুঞ্জিতে পরিচালিত এই মাঠপর্যায়ের গবেষণায় মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ৩৫৬ জন। তিনটি গ্রাম এবং তিনটি পুঞ্জির নারী ও কিশোরী অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্যের পাশাপাশি তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনমান সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন গবেষক দল। সেমিনারে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সহজলভ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনমান, বাসস্থান, পানি ও টয়লেট সুবিধা সম্পর্কে তুলনামূলক তথ্য আলোচনা করেন গবেষক দল।
গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার এই যুগেও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার চরম অভাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রসবকালীন রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন সুবিধা পাওয়া যায় না। গবেষণায় আরো দেখা যায়, এই এলাকার অনেক গ্রামে এখনো ভেষজ ও কবিরাজ-নির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থা বিরাজমান রয়েছে। এমনকি গ্রামে ফার্মেসি না থাকায় ঔষধ প্রাপ্তি এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরকেন্দ্রিক নির্ভরশীল এসব জনোগোষ্ঠির সদস্যরা।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এসব জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে মাসিক বিষয়ক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে নানান প্রচলিত ধারণা। এই জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীদের মাঝে মাসিক বা পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। লোকলজ্জার ভয়ে তারা পিরিয়ড সংক্রান্ত অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। এমনকি মাসিকের সময় প্যাডের পরিবর্তে কাপড় ব্যবহার করলেও তা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করেন। এতে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি চরমভাবে বাড়ছে। এছাড়া মাসিকের সময় সৃষ্ট শারীরিক বিভিন্ন জটিলতাকে তারা সাধারণ সমস্যা হিসেবে গণ্য করেন, ফলে বড় ধরনের অসুস্থতাতেও তারা চিকিৎসার প্রয়োজন বোধ করেন না। এমনকি তরুণ প্রজন্ম প্যাড কিনতে চাইলেও আর্থিক সংকট, দুর্গম অবস্থান এবং ফার্মেসি সংকটের কারণে পুরনো সুতি কাপড়ের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদেরকে।
পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রেও নারীদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের অভাব এই গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অল্প বয়সে বিয়ের ক্ষেত্রে কিশোরীদের স্বেচ্ছায় বিয়ের প্রবণতা লক্ষণীয় বলে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে হাসপাতালের দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যবস্থা বড় বাধা বলে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য উপস্থাপনের সময়, অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে বাস্তবচিত্রও তুলে ধরা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আমরা বসবাস করি। ফলে নানান ধরনের সমস্যা আমাদেরকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবা প্রায় নেই। দুর্গমতার কারণে সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মীও নেই। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং পরিবহণ সুবিধা না থাকার কারণে বাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রসব করাতে হয়। এতে অনেকের জীবন বিপন্ন হয়।’
গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী গারো ও খাসিয়া উভয় সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ নারী ও কিশোরীরা তাদের বাগানের ও পুঞ্জির ভেতর ডাক্তারের ব্যবস্থা, বিশেষ করে মহিলা ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়াও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিডওয়াইফ, ডিসপেনসারিতে পর্যাপ্ত ঔষধ ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সেশন আয়োজনের আশা ব্যক্ত করেন তারা।
জানা যায়, সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণাটি “সিলেটের খাসিয়া, গারো ও চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ক প্রকল্পটি হিট প্রজেক্টের অধীনে চলমান।
গবেষণাটি বিশ্বব্যাংক ও ইউজিসি অর্থায়নে পরিচালিত হিট উপ-প্রকল্প। এই উপ-প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হিসেবে রয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. ফয়সাল আহমেদ, সহকারী উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক একই বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন ও সদস্য সচিব লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। এ ছাড়াও গবেষণা সহকারী দলে রয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মার্জিয়া সুলতানা পিংকি, আতিয়া শারমিন, রুবেল মিয়া, মরিয়ম আঞ্জুম জেরিন ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ময়ূরী দেবনাথ এবং ঝুমা খানম স্মৃতি।
বিডি-প্রতিদিন/এমএল