চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের ছয় দিনের ধর্মঘটে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্দোলনের কারণে বন্দরসংশ্লিষ্ট ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে আটকা পড়ে রপ্তানি পণ্যবোঝাই প্রায় ১৩ হাজার টিইইউএস কনটেইনার, যার ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্পের। জাহাজে লোডিং-আনলোডিং বন্ধ থাকায় এসব কনটেইনার যথাসময়ে জাহাজীকরণ সম্ভব হয়নি।
ধর্মঘট স্থগিতের পর বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বন্দরের অপারেশনাল কাজ শুরু হলেও রপ্তানিকারকরা বলছেন, এই ধকল কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তারা জানান, সময়মতো বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠাতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বে ইমেজ সংকটে পড়বে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। এর ফলে হারাতে হতে পারে রপ্তানি আদেশ (অর্ডার)। এ অবস্থায় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানান, এখন ডিপোতে আটকে পড়া কনটেইনার দ্রুত জাহাজে তোলার চেষ্টা চলছে। এদিকে ডিপোগুলোতে নতুন পণ্যও আসছে। আটকে থাকা পণ্য জাহাজে তোলার পর নতুন কনটেইনার রপ্তানি করতে হবে। বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে আরও কিছুদিন নির্দিষ্ট সময় মেনে পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব হবে না। এই বিলম্ব তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বন্দরের কয়েক দিনের অচলাবস্থায় তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষতি হয়েছে সীমাহীন। আর্থিকভাবে এ ক্ষতি এখনই নিরূপণ সম্ভব নয়। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে ইমেজের। বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তারা অর্ডার দিতে চাচ্ছেন না। এটি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। এমনিতেই দেশের তৈরি পোশাক শিল্প নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর বন্দর সমস্যা এ শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রপ্তানির ধারা নিম্নমুখী উল্লেখ করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানি পণ্য জাহাজে তুলতে না পারলে সেটি ক্রেতার কাছে সময়মতো পৌঁছে না। এই লিড টাইম একবার মিস হলে ক্রেতা পণ্যের চালান নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এতে গার্মেন্ট মালিককে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এই ধর্মঘটে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যা নজিরবিহীন। এতে বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
স্বাভাবিক হচ্ছে বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক জানান, ধর্মঘট স্থগিতের পর বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বন্দরের কাজকর্ম শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে জাহাজ চলাচল, লোডিং-আনলোডিং ও পণ্য ডেলিভারি। তিনি জানান, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৫টি মাদার ভেসেল চলাচল করেছে। এর মধ্যে জেটিতে এসেছে ১৫টি এবং বন্দর ত্যাগ করেছে ১০টি। ডেলিভারি হয়েছে ২ হাজার ২৪৭ টিইইউএস কনটেইনার, আরও ২ হাজার ৮২৬ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হওয়ার কথা। ৫৯ হাজার ধারণক্ষমতার বিপরীতে ইয়ার্ডে কনটেইনার ছিল ৩৬ হাজার ৭০৮ টিইইউএস।
১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে বন্দর
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন করা এবং পরবর্তীতে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি হওয়া ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাকে (এনএসআই) অবহিত করা হয়েছে।
এই ১৫ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবির এবং সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন রয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বন্দরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এসব কর্মচারীকে গত ২ ফেব্রুয়ারি মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্তাধীন অবস্থায় তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সম্পদের উৎস ও পরিমাণ যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুদকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বন্দরের পরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, বন্দর সচিবের স্বাক্ষর করা চিঠিটি তিনি দেখেছেন, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারেননি।
উল্লেখ্য, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী তিন দিন লাগাতার কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে দেশের সমুদ্রবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
বিডিপ্রতিদিন/কবিরুল