একসময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল নতুন খাতা খোলা, পুরোনো হিসাব মিটিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরুর আনন্দঘন আয়োজন—হালখাতা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে রংপুর অঞ্চলে সেই ঐতিহ্যবাহী হালখাতা এখন প্রায় বিলুপ্ত।
অতীতে ব্যবসায়ীরা লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতায় বছরের শুরুতে নতুন করে লেনদেনের হিসাব লিখতেন। বিশেষ করে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে হালখাতা ঘিরে থাকত উৎসবের আমেজ। পুরোনো দেনা-পাওনা পরিশোধ করে মহাজন ও ক্রেতারা একত্রিত হতেন। আয়োজন করা হতো মিষ্টান্ন ও ভোজের, কোথাও কোথাও চলত মিষ্টি খাওয়ার প্রতিযোগিতাও।
রংপুর নগরীর বিশিষ্ট বস্ত্র ব্যবসায়ী শামসুল হুদা ডিএম বলেন, আগে মহাজন ও পাইকাররা হালখাতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তারা নিয়ম মেনে বকেয়া পরিশোধ করে নতুন বছরে ব্যবসা শুরু করতেন। কিন্তু এখন অনেকেই বাকি টাকা পরিশোধে আগ্রহী নন। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের আন্তরিকতা কমে যাওয়ায় হালখাতার আয়োজনও কমে গেছে।
শুধু হালখাতা নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বৈশাখী ও চৈত্রসংক্রান্তির গ্রামীণ মেলাও। একসময় রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জাঁকজমকপূর্ণ মেলা বসত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতেন এসব মেলায়। মৃৎশিল্প, লোকজ পণ্য, নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা ও পুতুলনাচ ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ।
রংপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান কাজী মো. জুননুন বলেন, আগের মেলাগুলো ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। শিশু-কিশোরদের আবদার পূরণে অভিভাবকেরা তাদের নিয়ে মেলায় যেতেন। কিন্তু এখন সেই প্রাণচাঞ্চল্য আর চোখে পড়ে না। সরকারি উদ্যোগে নববর্ষ উদযাপন হলেও আগের মতো মেলার আবেগ ও আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
প্রবীণদের মতে, আধুনিকতার ছোঁয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে হালখাতা এখন কেবলই গল্প কিংবা স্মৃতির অংশ হয়ে থাকছে।
বিডি প্রতিদিন/হিমেল