শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩০

রাজশাহী পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য

হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে শিশু-তরুণদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহী পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য

রাজশাহীর শিরোইল কলোনির মুজাহিদ ইসলামের জেএসসি পরীক্ষা ছিল ১৩ নভেম্বর। পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে দুপুর ২টার দিকে। তার আগেই ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। একই মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে জেএসসি পরীক্ষার্থী কামাল উদ্দিনকে। শুধু এই দুই জেএসসি পরীক্ষার্থী নয়, ঘটনার সময় রাজশাহীতে ছিলেন না এমন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণদের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পশ্চিমাঞ্চল রেলের টেন্ডার নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে, তাতে জেএসসি পরীক্ষার্থী ও নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। মামলার বাদী মনোয়ার হোসেন রনি নিজেও বলেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া শিশু ও তরুণরা জড়িত নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা মামলায় যাদের নাম দিয়েছি, তারা এরা না। আমরা পুলিশকে বলেছি, এরা তো ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। কিন্তু প্রশাসন এদের নাম দিয়ে দিল।’ মুজাহিদ ইসলামের মা হোসনে আরা বেগম জানান, ঘটনার দিন পরীক্ষা ছিল মুজাহিদের। দুপুর ১টায় পরীক্ষা শেষ হয়। এরপর নওদাপাড়া থেকে ২টার দিকে বাড়ি ফিরে খাওয়া শেষে ঘুমিয়ে ছিল। সন্ধ্যার দিকে বাড়ির মোড়ে এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা চেয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় হত্যামামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। চঞ্চলের মা চাম্পা শিরোইল কলোনির মোড়ে ভাঁপা পিঠা বিক্রি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে থানায় নিয়ে গেলে তারা পুলিশের কাছে যান। এ সময় উপ-পরিদর্শক শাহীন তার কাছে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিলে নরমাল মামলায় চালান দেওয়া হবে বলে জানান। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় সকালে হত্যামামলায় জড়ানো হয়। কামাল উদ্দিনের বাবা জামাল উদ্দিন জানান, কামাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এসে সন্ধ্যার দিকে মোড়ে গেলে একটি ক্লাব ঘরে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর তাকে হত্যামামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তারা পরীক্ষার কাগজপত্র দেখানোর পরেও পুলিশ ছাড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাহিনুর রহমান ঘটনার দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর বাড়ির মোড়ে এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। শাহিনের বাবা নূর মোহাম্মদ সরদার জানান, পুলিশ কারও কোনো কথা না শুনেই পাড়ার মোড়ে যাকে পেয়েছে তাকে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর হত্যামামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে।

রাব্বির পিতা বুলবুল হোসেন জানান, তার ছেলে দোকানেই ছিল। দুপুরের পর হঠাৎ করেই তাদের বাড়িতে পুলিশ আসে। পুলিশ রাব্বিকে বলে, ‘রাব্বি কে? রাব্বি তখন বলে, আমি। পুলিশ তখন বলে থানায় যেতে হবে।’ এরপর পুলিশ রাব্বিকে থানায় নিয়ে হত্যামামলায় জড়িয়ে দিয়েছে।

                ইউসেফ স্কুলের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন জানান, দুই জেএসসি পরীক্ষার্থী ঘটনার দিন পরীক্ষা দিয়েছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত পরীক্ষা চলেছে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি আসতে কমপক্ষে আরও ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে। তিনি পুলিশকে পরীক্ষার কাগজপত্র দেখিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে ১৪ তারিখের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশ তার কোনো কথা শোনেননি।

                রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর উম্মে সালমা জানান, দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সাতজনকে বাড়ি ও বাড়ির মোড় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাদী মামলাটি করেছেন রাত সাড়ে ১০টায়। ঘটনা ঘটেছে দুপুর পৌনে ২টায়। ফলে পুলিশ নিজেদের বাঁচাতে নির্দোষ মানুষদের ফাঁসিয়ে দিয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আরেক কাউন্সিলর তৌহিদ সুমন জানান, ঘটনাস্থলের সিসিটিভির ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে কারা ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিক কৃতিত্ব নিতে গিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে। 

                রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাে র ঘটনায় নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, এজাহারে থাকা ও অজ্ঞাতদের সম্পর্কে তথ্য নিয়ে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে। তারপরেও পুলিশের কোনো গাফিলতির কারণে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর জেএসসি পরীক্ষার্থীর পরিবার পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করলে বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করে দেখা হবে বলে তিনি জানান।

                উল্লেখ্য, ১৩ নভেম্বর পশ্চিম রেলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুপুরে রাসেলের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন রাজার ওপর হামলা হয়। তাকে বাঁচাতে গেলে ছুরির আঘাতে জখম হন রাসেল। পরে তার মৃত্যু হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর