বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম আধার সিলেট। অথচ সেই সিলেট বিভাগের সড়কগুলো হয়ে উঠেছে ‘দানব’। সিলেটের সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। তাতে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। গড়ে প্রতিদিন একটি করে দুর্ঘটনায় অন্তত একজনের প্রাণহানি ঘটছে। নিহতদের বের্শির ভাগই মোটরসাইকেল আরোহী। গত এক বছরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সড়কে ৩৫৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬৪ জন। এর মধ্যে ১৩২ জনই মোটরসাইকেল আরোহী। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮৭২ জন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের জন্য নিসচা ৫টি স্থানীয়, ২টি জাতীয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা ও অনুমেয় অনুজ্জ বা অপ্রকাশিত ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে ২০২৫ সালে বিভাগের সিলেট জেলায় ১৫৮টি দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত ও ২৯৯ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জে ৬৮টি দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ১৭০ জন আহত, মৌলভীবাজারে ৫৭টি দুর্ঘটনায় ৬০ জন নিহত ও ৭০ জন আহত এবং হবিগঞ্জ জেলায় ৭৩টি দুর্ঘটনায় ৭৯ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন।
সিলেট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে। গেল এক বছরে ওই মহাসড়কে ৩১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ জন। এ ছাড়া সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে ২৭ দুর্ঘটনায় ২৭ জন, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কে ২৮ দুর্ঘটনায় ২৮ জন ও সিলেট-এয়ারপোর্ট সড়কে ৭ দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত হয়েছেন। উপজেলাভিত্তিক হিসেবে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জৈন্তাপুরে ২২ দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ২২ দুর্ঘটনায় ২১ জন ও জকিগঞ্জ উপজেলায় ২১ দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
সুনামগঞ্জের মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন ও ছাতক উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন, বড়লেখায় ৭টি দুর্ঘটনায় ১০ জন ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৯টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। হবিগঞ্জ জেলার মধ্যে মাধবপুর উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন, নবীগঞ্জে ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৯ জন।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গেল এক বছরে সড়কে সবচেয়ে বেশি নিহতের ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এক বছরে সিলেট বিভাগে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন মোটরসাইকেল আরোহী। হতাহতদের মধ্যে বাস ও মাইক্রোবাস চালক, যাত্রী ও পথচারীও রয়েছেন। নিহত ৩৬৪ জনের মধ্যে ২৭৩ জন পুরুষ, ৫৪ জন মহিলা ও ৩৭ জন শিশু ছিলেন। নিসচার ওই প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য যেসব কারণকে দায়ী করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ে অভাব, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ওভারটেকিং, লাইসেন্সবিহীন চালক, পথচারীদের অসচেতনতা, বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানো, চালকদের মাদকাসক্তি, মহাসড়কে নির্মাণ ত্রুটি, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, মোটরসাইকেল চালকদের মানসম্মত হেলমেট ব্যববহার না করা প্রভৃতি।
এ প্রসঙ্গে, নিসচার কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিশু জানান, সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। চালক, যাত্রী, প্রশাসন, বিআরটিএ সবার চেষ্টা ও সচেতনতা ছাড়া দুর্ঘটনারোধ সম্ভব নয়। সিলেটের যুব সমাজের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বেশি থাকলেও তাদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারে অনীহা রয়েছে। এজন্য মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে।