মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে খামার চালাতে গিয়ে ফেরারি জীবন কাটাচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা। দাদন ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে নিঃস্ব এখন এসব ছোট ছোট খামারি। পোলট্রি খাত নিয়ে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে তাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ৪ টাকা লোকসানে সেই মহাজনের কাছেই ডিম বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা। ফলে পুঁজি হারিয়ে নিজেদের খামার বাঁচাতে না পেরে অনেকেই পথে বসেছেন। অনেকে কাটাচ্ছেন ফেরারি জীবন। কেউ কেউ করছেন আত্মহত্যা।
খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি খাত নিয়ে সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা ও বাজার তদারকি না থাকায় প্রান্তিক খামারিরা দিনের পর দিন লোকসান দিচ্ছেন। ফলে স্বল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসা পর্যায়ক্রমে মহাজনের পেটে ঢুকে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা যোগসাজশে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে করপোরেট কোম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দিচ্ছেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘খামারিরা এখন সাড়ে ৯ টাকা পিস ডিম উৎপাদন করেন। অথচ প্রতি পিস ডিম বিক্রি করছেন ৬ টাকায়। এভাবে লোকসান দিয়ে বেশিদিন খামারিদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে না পারলে এ মার্কেট করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করবে। তখন তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করবে সে দামেই ভোক্তাকে কিনতে হবে।’
জানা যায়, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলকে দেশের পোলট্রি শিল্পের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। এসব এলাকা থেকে আসা লাখ লাখ ডিম-মুরগি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটায়। কিন্তু গেল কয়েক বছর ডিমের ন্যায্য দাম না পেয়ে উৎপাদনকারীরা পথে বসতে শুরু করেছেন। এ সুযোগে খামারি ও ডিম উৎপাদনকারী না হয়েও ডিমের মহাজন হয়েছেন দাদনখোরেরা। মহাজনদের এ দুষ্টচক্রে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক প্রান্তিক পোলট্রি খামারি। ব্যবসা ছেড়ে ফেরারি হয়েছেন অনেকে, আবার কেউ কেউ ঋণের দায়ে করেছেন আত্মহত্যা। ডিম ব্যবসায়ী ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে এ অঞ্চলের অন্তত ৫০-৬০ শতাংশ খামারি ব্যবসা ছেড়েছেন। এর মধ্যে টাঙ্গাইল অঞ্চলে ৮ লাখ ডিম উৎপাদনকারী মুরগি থাকলেও কয়েক বছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখে। এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের মিতু লেয়ার ফার্মের স্বত্বাধিকারী আবদুল মালেক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৩ লাখ টাকায় ব্যবসা শুরু করলেও পুঁজি হারিয়ে এখন ৭ লাখ টাকা সুদের উপর ঋণ রয়েছে। প্রথম দিকে ডিমের ভালো দাম পেলেও গত ৩ বছরের প্রতি পিস ডিমে ৪ টাকা লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকার বাজার তদারকি করেনা। উল্টো কর্পোরেক কোম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দিতে প্রাণপন চেষ্টা করে প্রাণী সম্পদের অসাধু কর্মকর্তারা।
উৎপাদনকারী না হয়েও ডিমের মহাজন তারা
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভোক্তা পর্যায়ে ডিম পৌঁছাতে ৩ স্তরে কাজ করে দাদান ব্যবসায়ীরা। তারা প্রত্যেকেই একই সঙ্গে ডিমের ক্রেতা ও বিক্রেতা। খামারিদের কাছ তারা মহাজন নামেও পরিচিত। তাঁদের মধ্যে এক জন মহাজন, মাঝখানের তিনজন আবার দাদনের ফড়িয়া ও অপরজন ওই চক্রেরই পাইকারি বাজারে ডিমের বিক্রেতা। এর মধ্যে যে যাকে দাদন দিয়েছেন, তিনি শুধু তার হাতেই ডিম তুলে দিতে বাধ্য। বাজার যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই কারও। আবার এরাই কাপ্তান বাজর কিংবা ঢাকার সব থেকে বড় ডিমের আড়তে ডিম বিক্রি করেন। চাইলেও কোন খামারি সরাসরি এই দুটি বাজারে ডিম বিক্রি করতে পারেননা। চক্রাকারের এই দাদন ব্যবসায় টাঙ্গাইল জেলায়া হাকিম মন্ডল, রশিদ ও রুইন মিঞা নামের তিন জনের সিমাবদ্ধ থাকলেও গাজীপুর জেলারও মাওয়া এলালাকায় অন্তত ১ ডজনের বেশি দাদন ব্যবসায়ী রয়েছে। এর মধ্যে তোফাজ্জল একাই মাওনা চৌরাস্তা এলাকার ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা যায়।
প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখার বিষয় জানতে চাইলে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. এবিএম খালেকুজ্জামান বলেন, ১৮০ দিনের কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড বরাদ্ধ করা হয়েছে। কৃষক কার্ডের নীতিমালা হলে প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হবে।