বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী লাচ্ছা ও চিকন সেমাইয়ের কদর ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। গুণগতমান আর স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় দিনদিন চাহিদা বেড়েই চলেছে। শুধু দেশেই নয়, বগুড়ার সেমাই এখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে কয়েক শ কোটি টাকার লাচ্ছা সেমাই ও সাদা চিকন সেমাইয়ের ব্যবসার আশা করছেন কারখানার মালিকরা।
তারা বলছেন, রোজার এক থেকে দেড় মাস আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে সেমাইয়ের অর্ডার আসতে শুরু করে। এর মধ্যে ফুড ভিলেজের লাচ্ছা সেমাই, শ্যামলী, আকবরিয়া, এশিয়া, কোয়ালিটি ও চিনিপাতার লাচ্ছা সেমাইয়ের কদর সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি আর গুণগতমান ভালো হওয়ায় ঈদে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব ব্যান্ডের সেমাই কিনে থাকেন। এ বছর বিভিন্ন ন্ডের লাচ্ছা সেমাই মানভেদে ১৬০ টাকা থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি কেজি চিকন সেমাই পাইকারি ৮০-৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বগুড়ার এস আর গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ জানান, বগুড়ার দইয়ের যেমন দেশ-বিদেশে কদর রয়েছে। তেমনই বগুড়ার লাচ্ছা সেমাইয়ের সুমান রয়েছে। বিশেষ করে ফুড ভিলেজের সেমাই ও দই মন কাড়ছে ক্রেতাদের। বিশ্বের দরবারে বগুড়ার সেমাই ও দই বাজারজাত করতে সংসদে কথা বলব। তিনি বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত ও আধুনিক প্রক্রিয়ায় সেমাই উৎপাদন করে থাকি। কাঁচামাল নির্বাচন থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ প্রতিটি ধাপেই গুণগতমান নিশ্চিত করা হয়। বগুড়া জেলার চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি বর্তমানে আমাদের সেমাই সারা দেশে যাচ্ছে। শুধু দেশেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।’
জানা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতর আসতে আর সপ্তাহ দুয়েক বাকি। মুসলিম সম্প্রদায়ের এ বৃহত্তম উৎসব উপলক্ষে বগুড়ার বিভিন্ন কারখানায় লাচ্ছা সেমাই তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। রমজানের শুরু থেকে তাদের তৈরি এসব প্রসিদ্ধ পণ্য কে কার আগে বাজার ধরতে পারে সে প্রতিযোগিতার কমতি নেই। আটার সঙ্গে ডালডা অথবা ঘিয়ের সংমিশ্রনে বিশেষভাবে মোলাম করে তৈরি হয় এক মিষ্টিজাতীয় খাদ্য। এটির নামই লাচ্ছা সেমাই। এ খাদ্যদ্রব্য ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন অপূর্ণতার শামিল। এর উৎপত্তি বগুড়ায় না হলেও প্রায় ৫ দশক ধরে এ জেলায় তৈরি লাচ্ছা সেমাইয়ের সুখ্যাতি ছড়িয়েছে সারা দেশে। মানুষের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ কারিগরের সহজলভ্যতা এ সুনামকে আরও বিস্তৃত করেছে।
বগুড়া জেলার সদর, শাজাহানপুর, গাবতলী, কাহালু উপজেলায় গড়ে উঠেছে সেমাই পল্লি। শাজাহানপুর উপজেলার সেমাইপল্লীখ্যাত মাদলা, বেজোড়া, ঢাকন্তা, শ্যাওলাকাথিপাড়া, কালসিমাটি, রবিবাড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ৮ থেকে ১০টি গ্রামের নারীদের হাতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিকন সেমাই। রমজানের আগে থেকেই তারা চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেছেন। বগুড়ার ব্যবসায়ীরা জানান, বগুড়ায় প্রকারভেদে তিন ধরনের লাচ্ছা সেমাই তৈরি হয়। সয়াবিন, ডালডা এবং ঘিয়ে ভাজা। প্রতি বছর রমজান মাসে জেলা ও উপজেলা মিলে অন্তত চার শতাধিক কারখানায় লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ব্র্যান্ডের কারখানা ১০ থেকে ১৫টি। যারা গুনগতমান বজায় রেখে মোড়কজাত করে এবং বাজারে বিক্রি করে। তারা বলেন, প্রকারভেদে ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই ৭০০ থেকে ১৩০০ টাকা, ডালডায় ভাজা ৩০০ থেকে ৬০০ আর ভাজা চিকন সেমাই ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বগুড়ার তৈরি এসব সেমাই ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, পাবনা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, খুলনাসহ অন্য জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান জানান, বাণিজ্যিকভাবে পরিচিতি পেয়েছে এ জেলার সেমাই। যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে।