গ্রীষ্মে এবার বিদ্যুতের চাহিদা ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের। রমজান প্রায় শেষ, সরকার এবার গ্রীষ্ম নিয়ে দুশ্চিন্তায়। এপ্রিলের শুরু থেকেই গরম বাড়তে থাকবে। অথচ গরম আসার আগেই গত সপ্তাহে দেশব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছে যায় প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গতকাল প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্যে, গতকাল বিকাল ৫টায় মোট ১৩ হাজার ৪১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদিত হয় ১৩ হাজার ২৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে আজ সংশ্লিষ্টরা বৈঠকে বসে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেবেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একদিকে এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবার লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, লোডশেডিং পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমরা রবিবার (আজ) আলোচনায় বসব। সেখানে লোডশেডিং পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায় সেজন্য পরিকল্পনা করব। রোজার কারণে এত দিন গ্রাহকদের দুর্ভোগ না দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আজ জ্বালানি সরবরাহকারী, জ্বালানি বিভাগসহ সবাইকে নিয়ে এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করব।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। যুদ্ধের কারণে একদিকে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে আবার নতুন সরকারের ওপর আগের সরকার বিশাল বকেয়া রেখে গেছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা এখন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারের রেশনিং ব্যবস্থার কারণে এমনিতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে কম গ্যাস সরবরাহ দিচ্ছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আর যুদ্ধের কারণে এপ্রিল ও মে মাসের এলএনজি সরবরাহ বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট। গ্যাসসংকট হলে পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদ্যুতে রেশনিং করার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিদ্যুতে আগে ৮৭০ মিলয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো রেশনিংয়ের কারণে। এখন ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সরকারের কাছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিল পায়। আসছে গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশজুড়ে বড় ধরনের লোডশেডিং এড়াতে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে দ্রুত বিল পরিশোধের জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) নেতারা। আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও আছে শঙ্কা। কারণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ পরিশোধে দেরি হলে কয়লা আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে দেশের জন্য নির্ধারিত কিছু এলএনজি কার্গো সময়মতো আসতে পারছে না। আবার জ্বালানি তেলের কয়েকটি জাহাজও দেরিতে আসছে।