চট্টগ্রাম ওয়াসার সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ, পানি উৎপাদন, সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, সামগ্রিক প্রশাসনিক কাজ, আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সংস্থাটির শীর্ষপদ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি)। তিনিই ওয়াসার প্রধান। ওয়াসা থেকে নগরের ৭০ শতাংশ মানুষের পানির সংস্থান হয়।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের চেয়ারটির ১৭ মাস নিয়মিত এমডি নেই। ফলে সংস্থাটির সামগ্রিক উন্নয়নকাজ চলছে ঢিমাতেতালায়। চলছে রুটিন ওয়ার্ক। অতীতে এমডি পদে একজন প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেওয়া হতো। বর্তমানে সিভিল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৪ মার্চ সকালে একজনকে এমডি পদে নিয়োগ দিয়ে চিঠি ইস্যু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কিন্তু গ্রেডসংক্রান্ত জটিলতায় তা বিকালে আবার বাতিল করা হয়। তবে নতুন করে আবারও তিনজন প্রকৌশলীর নাম প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেখান থেকে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, এমডি না থাকার কারণে জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানটি এখন অনেকটা অভিভাবকশূন্য। ফলে ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। প্রকাশ্যে চলছে নানান অনিয়ম। সময়মতো আসছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পানি সরবরাহেও চলছে অনিয়ম। কমছে রাজস্ব আদায়।
জানা যায়, নির্বাহী পদের চেয়ারে কর্তাব্যক্তি থাকলে সংস্থার জন্য তার পরিকল্পনা, সংস্থা পরিচালনায় সুনিবিড় তত্ত্বাবধান, কারিগরি বিষয়ে তদারকি, উন্নয়ন প্রকল্পসহ সামগ্রিক বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান, জরুরি বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয়। কিন্তু এখন নিয়মিত এমডি না থাকায় এসব কাজে বেগ পেতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, জরুরি ও প্রয়োজনীয় সব কাজ বর্তমানে স্বাভাবিক গতিতে চলছে। কোনো কাজে সমস্যা হচ্ছে না। সব প্রকল্প আগের ধারাবাহিকতায় চলছে। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়মিত কর্মকর্তা থাকলে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা দ্রুত হয়। তিনি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিবিড়ভাবে চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে পারতেন।
জানা যায়, ২০০৯ সালের ৬ জুলাই চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। ২০১১ সালে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ সৃষ্টি হলে ওই পদে বসেন তিনি। এরপর টানা আটবার প্রায় ১৫ বছর তিনি এমডি পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। এরপর নানান অভিযোগে এমডি ফজলুল্লাহর পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি পালন করা হয়। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর তাঁকে অপসারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তখন ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের পরিচালক (স্থানীয় সরকার) আনোয়ার পাশাকে। তিনি বদলি হলে দায়িত্ব পান একই পদের মনোয়ারা বেগম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমডি নিয়োগের জন্য ওয়াসা গত বছরের ২৪ ও ২৫ মার্চ প্রথমবারের মতো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ৭ এপ্রিল আবার সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওয়াসা প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো সংবাদপত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এমডি খোঁজা শুরু হয়। ফলে তৈরি হয় ব্যাপক আলোচনা-কৌতূহল। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রায় অর্ধশত প্রার্থী আবেদন করেন। আবেদনগুলো ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৬৩ সালে মাত্র তিনটি গভীর নলকূপ নিয়ে যাত্রা করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। বর্তমানে ওয়াসা চারটি শোধনাগারের মাধ্যমে পানি উৎপাদন করে। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়া শোধনাগার-১ ও ২ প্রকল্প থেকে দৈনিক ১৪ কোটি করে ২৮ কোটি লিটার; মোহরা পানি শোধনাগার ও মদুনাঘাট শোধনাগারে উৎপাদন হয় ৯ কোটি করে ১৮ কোটি লিটার। বর্তমানে ওয়াসার আবাসিক গ্রাহক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি ও বাণিজ্যিক সংযোগ ৭ হাজার ৭৬৭টি। নগরের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়।