মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুঁজি করে পকেট কাটার উৎসব চলছে দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো সংকটের আঁচ পেলেই দেশের বৃহৎ এই ভোগ্যপণ্যের বাজারে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এবার অতিমুনাফালোভীদের নতুন হাতিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি সংকট। অথচ বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ব্রাজিল থেকে যেসব পণ্য ভিন্ন সমুদ্রপথ হয়ে দেশে প্রবেশ করে, হরমুজ প্রণালির জুজুতে রাতারাতি সেগুলোরও দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বরং জাহাজে নয়, পণ্যের দাম বাড়ছে কেবল সিন্ডিকেটের খোঁড়া অজুহাতে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসম্পাদক রেজাউল কবির আজাদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের কারণে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হওয়ায় এটা হয়েছে। এখন বাজার পরিস্থিতি নিম্নমুখী।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতি পুঁজি করে আগে কেনা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সরকারি সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক ও কার্যকর বাজার তদারকির অভাবেই এ চক্র বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে আমদানিকারকদের এলসি খোলার তারিখ, বুকিং রেট এবং বর্তমান মজুতের তথ্য মিলিয়ে খাতুনগঞ্জে কঠোর অভিযান না চালালে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছাবে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সমুদ্রপথে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। তবে আন্তর্জাতিক শিপিং সূচক (ড্রুরি ওয়ার্ল্ড কনটেইনার ইনডেক্স) অনুযায়ী বর্তমানে এশিয়া থেকে অন্যান্য রুটে ৪০ ফুটের কনটেইনারের ভাড়া ২ হাজার ২৮৭ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। গত দুই মাসে ভাড়া সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ হরমুজ সংকটের কারণে শিপিং চার্জ এখনো ব্যবসায়ীদের দাবির মতো আকাশচুম্বী হয়নি।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে বাজার কারসাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য। খাতুনগঞ্জে দাম বাড়ানো হয়েছে এমন অনেক পণ্যই হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে আসে না। তা ছাড়া বর্তমানে বাজারে যেসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো তিন থেকে চার মাসে বুকিং কিংবা আমদানি করা। ফলে পুরোনো মজুত থেকেই নতুন অজুহাতে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে কারসাজি সিন্ডিকেট। খাতুনগঞ্জে গত কয়েক সপ্তাহে ভোজ্য তেল (সয়াবিন ও পাম অয়েল), চিনি, গম, মসুর ডাল ও ছোলার দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বৃদ্ধির কথা বললেও দেশে এখনো অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন খরচে বড় ধরনের কোনো উল্লম্ফন ঘটেনি। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ডাল ও ছোলা, মালয়েশিয়া থেকে আসা পাম অয়েল, কানাডা থেকে আসা গম কিংবা ব্রাজিল বা ভারত থেকে আসা চিনির জাহাজের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু নির্দিষ্ট মসলা আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। তবু আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে পাইকারি পর্যায়ে প্রায় প্রতিটি আমদানীকৃত পণ্যের দামে কারসাজি করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে খাতুনগঞ্জে পাম অয়েল প্রতি মণ বিক্রি হতো ৫ হাজার ৯০০ টাকায়। বর্তমানে তা ৬ হাজার ২৫০ টাকা। সুপার অয়েলের দাম ৬ হাজার ২০০ টাকা হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৫৫০ টাকা মণ। সয়াবিন তেলের মণ ৭ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছিল ৭ হাজার ৪৭০ টাকা পর্যন্ত। তবে বর্তমানে ৭ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে চিনি মণপ্রতি ৩ হাজার ৩৯০ বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে ৩ হাজার ৪৮০ টাকা। ১ হাজার ১৫০ টাকার গম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ। ৭৪ টাকার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮২ টাকা। একই ভাবে দাম বেড়েছে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের।