সরকারি অর্থের জবাবদিহি এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনকল্যাণমুখী ও কর্মসংস্থানবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এখন থেকে কোনো প্রকল্প কেবল তখনই অনুমোদিত হবে যখন সেটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল এবং পরিবেশগত সুরক্ষার শর্তগুলো পূরণ করবে। গতকাল পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আয়োজিত ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড : দ্য ইনাগুরেশন অব রেইজ-২’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র কেবল রাজনীতিতে থাকলে চলবে না, অর্থনীতিতেও সাধারণ মানুষের সমান অধিকার থাকতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ কওে দেওয়া এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। অতীতে অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া অলাভজনক প্রকল্প বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পিকেএসএফের কর্মতৎপরতার প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন এবং পিকেএসএফের কার্যক্রমের মধ্যে মিল রয়েছে। আগামী দিনে পিকেএসএফের কাজের পরিধি আরও ডাইভার্সিফাই বা বৈচিত্র্যময় করার আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে সরকারের নতুন উদ্যোগ যেমন- ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতের প্রসারে পিকেএসএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ডেলিভারি পার্টনার হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আমির খসরু বলেন, সরকার সরাসরি নারীদের ক্ষমতায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিবারের বাজেট রক্ষক হিসেবে নারীদের সরাসরি ক্যাশ ট্রান্সফার করার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধি এবং সঞ্চয় প্রবণতা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য সরাসরি ইনপুট সহায়তা এবং স্বাস্থ্য খাতে সহায়তার বিষয়েও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের কামার-কুমার, তাঁতি এবং ক্ষুদ্র শিল্পীদের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ (একটি গ্রাম, একটি পণ্য) ধারণাটি বাস্তবায়ন করতে চাই। যেমন- বরিশালের শীতলপাটিকে যদি ডিজাইন সাপোর্ট, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে এটি একটি বড় জিডিপি কন্ট্রিবিউটর হবে। এ ছাড়া থিয়েটার, স্পোর্টস এবং মিউজিককে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জিডিপিতে এগুলোর অবদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতের অর্থনৈতিক বোঝা এবং বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সাফল্যের গল্প বিশ্বে তুলে ধরতে হলে দলমত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সম্মাননীয় অতিথি ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত ডিভিশন ডাইরেক্টর গেইল এইচ মার্টিন।
সরকার এখন বড় বড় মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনীতির কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে পড়েছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সময়ের দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিজ্ঞতা থেকে প্রকল্প মূল্যায়নে নতুন বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে। একটা প্রকল্পের ভ্যালু আছে কি না, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট কী, কর্মসংস্থান তৈরি হবে কি না, পরিবেশের ওপর প্রভাব কী-এসব বিবেচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। যে প্রকল্প এই মানদ পূরণ করবে না, সেটা আমরা করব না। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রজেক্টে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বিবেচনা করা হয়নি, কর্মসংস্থান বিবেচনা করা হয়নি, পরিবেশ বিবেচনা করা হয়নি। আমরা স্পষ্টভাবে সেসব প্রকল্প বাদ দিচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই পরিস্থিতি বদলে সরকার ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার এবং প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ওপর জোর দিচ্ছে, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে।