কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা ৯ মাসের সুরাইয়া আক্তার। জ্বর নিয়ে বৃহস্পতিবার তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। গত সোমবার দুপুরে তার শ্বাস কষ্টের সমস্যা বাড়লে চিকিৎসক জরুরি ভিত্তিতে ‘হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা’ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে হাসপাতালে মাত্র সাড়ে ১১ হাজার টাকা মূল্যের এই চিকিৎসা উপকরণটির সংকট। হন্যে হয়ে কয়েক ঘণ্টা খুঁজেও মেলেনি। পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেটি কিনলেও ৩০ মিনিট পর আসার কথা। কিন্তু ততক্ষণে হাসপাতালে চিকিৎসা উপকরণের সংকট ও অব্যবস্থাপনাকে চোখে আঙুল
দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে সুরাইয়া চলে গেল না-ফেরার দেশে। এভাবে সংকট-ঘাটতি নিয়েই চলছে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা কোমলমতি শিশুদের চিকিৎসা। দুর্বিষহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে মা-বাবাকে। স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছে শিশুরা। বাবার কাঁধে উঠছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তুটি। সুরাইয়ার বাবা কক্সবাজার সৈকতের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড়ে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ক্যামেরাটি বিক্রি করে দিয়েছি। নিজের সবকিছু দিয়েও মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না। মাত্র সাড়ে ১১ হাজার টাকা মূল্যের একটি হাই ফ্লো ন্যাজালের জন্য মেয়ের প্রাণ গেল। আমার প্রশ্ন-এত বড় একটা হাসপাতালে হাই ফ্লো ন্যাজালের কেন সংকট থাকবে? আমরা কোথায় বাস করছি!’
১৫ মার্চ দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। এরপর প্রতিনিয়তই হামের উপসর্গ নিয়ে স্রোতের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও অধিকাংশেরই হাম শনাক্ত করা হচ্ছে না। বর্তমানে হামের চিকিৎসায় চমেক হাসপাতালে ৫০ শয্যার পৃথক ব্লক তৈরি করা হয়েছে। শিশু রোগীদের জন্য ২০টি পিআইসিইউ শয্যা আছে। সেখান থেকে ১৫টিতে হামের রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালে ৪১টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা মেশিন থাকলেও দুটির ছিদ্র থাকায় ব্যবহার অনুপযোগী। অন্যদিকে জেনারেল হাসপাতালে কভিড ব্লককে আটটি শয্যা দিয়ে হাম কর্নার করা হয়েছে। বিআইটিআইডিতে ছয়টি শয্যা দিয়ে পৃথক ব্লক তৈরি করা হয়। কিন্তু হাম শনাক্তে চট্টগ্রামে ল্যাব না থাকায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। রিপোর্ট পেতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত পার হয়ে যাচ্ছে। গতকাল দুপুরে সরেজমিন চমেক হাসপাতালে দেখা যায়, এক শয্যায় তিন থেকে চারটি পর্যন্ত শিশু রাখা হয়েছে। ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম। ৫০ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি আছে প্রায় ৮০ শিশু। সঙ্গে আছেন স্বজনরা। ফলে গরম আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আলীকদম থেকে আসা শিশু তাসফিয়ার বাবা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করি। ১১ দিন আগে সন্তানকে ভর্তি করাই। এরই মধ্যে ১২ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাতেগোনা কিছু সাধারণ ওষুধ ছাড়া সবই কিনতে হয়।’
নোয়াখালী থেকে হাম আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে আসা নয়ন মিয়া বলেন, ‘এই গরমের মধ্যে এক সিটে তিন থেকে চারজন পর্যন্ত রোগী ভর্তি করা হয়েছে। ফ্যান থাকলেও ওয়ার্ডে অসহনীয় গরম। ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া গেলেও এখানে পাওয়া যায় না।’ চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, ‘এখানে পিআইসিইউ, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা মেশিন ও শয্যাসংকট আছে। বর্তমানে যা আছে তা দিয়েই আমাদের চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। কাউকে ফেরত দেওয়া হয় না। আমরা সর্বোচ্চ সেবাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’