৫৫ বছর বয়সী রহিমা বেগম সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা; তিনি আক্রান্ত স্তন ক্যান্সারে। জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন রেডিওথেরাপির জন্য তাঁকে পাড়ি দিতে হয় সূত্রাপুর থেকে মহাখালী জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দীর্ঘ পথ। অসুস্থ শরীর নিয়ে দিনে গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় তাঁকে আটকে থাকতে হয় ঢাকার অসহনীয় ও স্থবির যানজটে। যাতায়াতের এই চরম ধকল আর চিকিৎসার ক্লান্তি শেষে তিনি যখন ঘরে ফেরেন, তখন তাঁর আর কোনো শারীরিক বা মানসিক শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ফলশ্রুতিতে, মাত্র দুই সপ্তাহ পর এই অমানবিক শারীরিক ও মানসিক কষ্টে তিনি চিকিৎসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। রহিমা বেগম কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি পুরান ঢাকার অনেক ক্যান্সার রোগীর প্রতিচ্ছবি। চকবাজার, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, ওয়ারী, কামরাঙ্গীরচর ও ডেমরা-এই জনবহুল এলাকাগুলোর প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসা আজও এক দুর্গম ও অনিশ্চিত গন্তব্য।
গ্লোবোকান (GLOBOCAN) ২০২২-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার যে জাতীয় সংকট বিদ্যমান, তার বিপরীতে পুরান ঢাকা এক বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার অত্যন্ত সীমিত ভৌগোলিক আয়তনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৪ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস-যা ঢাকার অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো আধুনিক নাগরিক চাহিদার তুলনায় বেশ পিছিয়ে। ফলে প্রশাসনিকভাবে এটি দক্ষিণ ঢাকার অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এই অঞ্চলকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির একটি 'ব্লাইন্ড স্পট' বা অন্ধবিন্দুতে পরিণত করেছে। যদিও সমন্বিত ক্যান্সার রেজিস্ট্রির অভাবে পর্যাপ্ত স্থানীয় ডাটাসেট নেই, তবে এখানকার উচ্চ জনঘনত্ব এবং পরিবেশগত বিপর্যয় জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক বর্জ্য, সিসা মিশ্রিত বাতাস এবং দূষিত পানি এই এলাকাকে একটি 'কার্সিনোজেনিক' পরিবেশে রূপান্তর করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী উচ্চ-চর্বিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাস এবং তামাক সেবনের উচ্চ হার, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার সংক্রমণের ঝুঁকিকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে।
পুরান ঢাকার ১ কোটি মানুষের জন্য সবচেয়ে নিকটবর্তী ভরসার কেন্দ্র হতে পারতো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষ করে রেডিওথেরাপি ইউনিটে মেশিনের সংখ্যা যেমন অপ্রতুল, তেমনি কারিগরি ত্রুটির কারণে সেগুলো প্রায়ই অচল হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-তে রেডিয়েশনের জন্য মাত্র একটি সচল মেশিন থাকায় সেখানে রোগীর দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার প্রধান ভরসা মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট (NICRH), যা ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ অতিরিক্ত রোগীর চাপে ন্যুজ। সেখানে একটি সিরিয়াল পেতে রোগীকে ৪ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। যানজটের কারণে প্রতিদিন যাতায়াতে ৫ ঘণ্টা ব্যয় করা একজন মুমূর্ষু রোগীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। জনস্বাস্থ্য গবেষণার তথ্যমতে, এই ধকলের কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগী মাঝপথেই চিকিৎসা ছেড়ে দেন (Drop-out), যা আদতে তাঁদের অবধারিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাধানের পথ : সমন্বিত 'হাব-অ্যান্ড-স্পোক' মন্ডেল : এই সীমাবদ্ধতা জয় করতে একটি ত্রি-স্তরীয় মডেল বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন:
১. প্রাথমিক স্তর (স্পোক) : নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে জরায়ুমুখ, স্তন ও ওরাল ক্যান্সার ক্যান্সার স্ক্রিনিং ও ক্যান্সার সচেতনতার
প্রাথমিক সেন্টার হিসাবে তৈরি করা।
২. মাধ্যমিক স্তর (কম্প্রেহেনসিভ স্পোক) : এই স্তরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে (DMCH) প্রধান সমন্বয়কারী কেন্দ্র
হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পাশাপাশি ডিএমসিএইচ-এর বিশাল সার্জিক্যাল উইং এবং প্যাথলজি বিভাগকে ক্যান্সার সার্জারি ও মলিকুলার ডায়াগনোসিসের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি মিটফোর্ড হাসপাতালকে ডায়াগনোসিস ও সার্জারি ও কেমো সেন্টারে উন্নীত করা এবং ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজকে 'পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ' (PPP)-এর আওতায় এনে সার্জারি, ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ও প্যালিয়েটিভ কেয়ারের দায়িত্ব দেওয়া। এই তিনটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় পুরান ঢাকার মানুষের জন্য একটি কম্প্রেহেন্সিভ ক্যান্সার কেয়ার নেটওয়ার্ক তৈরি করবে।
৩. কেন্দ্রীয় হাব : পুরান ঢাকার প্রবেশদ্বারে এবং দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশপথ কেরানীগঞ্জে একটি অত্যাধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ 'রিজিওনাল ক্যান্সার হাব' গড়ে তোলা এই মহাপরিকল্পনার মূল ভিত্তি। এই হাবটি কেবল রেডিওথেরাপির জন্য নয়, বরং এটি হবে ক্যান্সার নির্ণয় থেকে শুরু করে সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ারসহ সকল প্রকার চিকিৎসার প্রধান গন্তব্য ও প্রাণকেন্দ্র (Nerve Center)। যেহেতু মিটফোর্ড বা ন্যাশনাল মেডিকেলের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় জায়গার অভাবে বড় মাপের বিশেষায়িত ক্যান্সার ইউনিট সম্প্রসারণ করা বা আধুনিক রেডিয়েশন বাঙ্কার নির্মাণ করা বেশ দূরহ, তাই কেরানীগঞ্জের এই হাবটি হবে একটি 'ওয়ান-স্টপ ক্যান্সার সলিউশন'। এখানে লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) মেশিনের পাশাপাশি থাকবে রোবোটিক সার্জারি উইং, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিট এবং পেট-সিটি স্ক্যানের মতো উচ্চ-প্রযুক্তিগত সুবিধা। কেরানীগঞ্জের কৌশলগত অবস্থানের কারণে ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড বা ন্যাশনাল মেডিকেল থেকে রেফার করা জটিল রোগীরা যেমন এখানে সর্বোচ্চ সেবা পাবেন, তেমনি পদ্মা সেতু হয়ে আসা দক্ষিণবঙ্গের কয়েক কোটি মানুষ এবং পার্শ্ববর্তী জেলার রোগীরা ঢাকায় না প্রবেশ করেই সরাসরি বিশ্বমানের সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
শুধু মেশিন বা হাসপাতাল যথেষ্ট নয়, এই মডেল বাস্তবায়নে চাই প্রচুর দক্ষ জনবল। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, সার্জন, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্টের পাশাপাশি অনকোলজি নার্স এবং রেডিয়েশন ফিজিসিস্টদের দীর্ঘস্থায়ী সংকট দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ও বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দক্ষ জনবল আর ত্রিস্তর বিশিষ্ট এই মডেলের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে, চিকিৎসার খরচ ১০ থেকে ১৫ গুণ কমে আসবে। তদুপরি, কর্মক্ষম মানুষের জীবন বাঁচানো গেলে, তা দেশের জিডিপিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর তাই আপাতদৃষ্টিতে এই প্রকল্পকে ব্যয়বহুল মনে হলেও, স্বাস্থ্য অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আসলে একটি লাভজনক 'বিনিয়োগ'।
পরিশেষে, ইউআইসিসি (UICC)-এর 'ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ' নীতি বাস্তবায়নে পুরান ঢাকার এই মডেলটি কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়, বরং কেরানীগঞ্জ হাবের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহ এবং দক্ষিণবঙ্গের কয়েক কোটি মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করবে। আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এই বৈজ্ঞানিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রকল্পটি সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় 'পাইলট প্রজেক্ট' হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হবে বলে আশা করি।
লেখক পরিচিতি : ডা. মোহাম্মদ মাসুমুল হক একজন চিকিৎসক, ক্যান্সার প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। ১৫ বছরের অধিক সময় ধরে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত এই চিকিৎসক বর্তমানে ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অফ বাংলাদেশ (CAFB)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার সেন্টার (মুম্বাই) থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধে উচ্চতর ট্রেনিং সম্পন্ন করা এই চিকিৎসকের গবেষণাপত্র 'দ্য ল্যানসেট অনকোলজি'-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বর্তমানে বাংক্যান্সা ক্যান্সার সোসাইটি হাসপাতালে কর্মরত।