বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতির সর্বোচ্চ প্রতীক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। অথচ এই ম্যানগ্রোভ বনে হরিণ শিকারিদের পাতা মৃত্যুফাঁদ বাঘের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার ফাঁদ পুরো সুন্দরবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এতে বানর, শূকরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়মিত আটকে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্ধার করা গেলেও অনেক সময় বন্যপ্রাণী ফাঁদেই প্রাণ হারাচ্ছে। সম্প্রতি হরিণ শিকারিদের ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে আহত হয় একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জের বৌদ্ধমারীর সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকায় এটি আটকে পড়ে। এ ঘটনা নতুন করে সুন্দরবনে প্রাণিকুলের নিরাপত্তা, বন বিভাগের নজরদারি ও অবৈধ শিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শঙ্কা তৈরি হয়েছে বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা নিয়ে। হরিণ চলাচলের পথে এসব ফাঁদ বসানো হয়। খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বাঘ এসব ফাঁদে আটকে যায়। সচেতন মহল বলছে, বাঘ উদ্ধার হলেও রয়ে গেছে মৃত্যুফাঁদের ভয়। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, ফাঁদে আটকে বাঘটির সামনের বাঁ পায়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি নিয়ে গরেষণা করা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনসংলগ্ন চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, জয়মণি, বৌদ্ধমারী, কচুবনিয়া, ধানসাগর, কবরখালী, মানিকখালী, কচিখালী, বগি ও চরখালী এলাকায় শিকারিদের তৎপরতা বেশি। সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অধিকাংশই বনসংলগ্ন লোকালয়ের বাসিন্দা।’ তিনি বলেন, ‘বন বিভাগের নজরে এসেছে বলেই শিকারের ফাঁদ থেকে একটি বাঘ রক্ষা পেয়েছে। বাঘ উদ্ধার হলেও মৃত্যুফাঁদের ভয় তো রয়ে গেছে। কারণ এমন হাজার হাজার ফাঁদ পুরো সুন্দরবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাই সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে। শুধু উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট নয়, অবৈধ শিকার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত টহল, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষা সম্ভব নয়। শিকারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষা করা অনেক সহজ হবে।’
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘জনবলসংকট সত্ত্বেও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগ নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাচ্ছে। বন বিভাগ শিকার প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদ পেলে তা উদ্ধার করে বন বিভাগে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে জেলে ও মৌয়ালদের প্রতি। জমা দেওয়া ফাঁদের প্রতি কেজির জন্য ২ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন চরদুয়ানী ও জ্ঞানপাড়ার বাসিন্দাদের নিয়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট দুটি কমিটি গঠন করা হবে। তারা বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অবৈধ শিকার ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপতৎপরতা রোধে কাজ করবেন।’