উত্তরাঞ্চলে চলতি শীত মৌসুমে লালমনিরহাটসহ রংপুর অঞ্চলে টানা ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে খেজুর গাছ থেকে রস প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হচ্ছে। ফলে খেজুর গুড়ও বেশি হচ্ছে। এতে জমে উঠেছে রাসায়নিকমুক্ত খেজুর গুড় ব্যবসা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। বর্তমানে উৎপাদিত রসের প্রায় ২০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় বিক্রি হলেও বাকি ৮০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে গুড় তৈরিতে। স্থানীয়রা জানায়, বাজারে সাধারণ খেজুর গুড় প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে গাছিদের কাছ থেকে রাসায়নিকমুক্ত গুড় কিনতে গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০০ টাকা। গেল বছর এর দাম ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এলাকায় গাছিরা ভোরে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। সেই রস ঘটনাস্থলেই বড় কড়াইয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাসায়নিকমুক্ত খেজুর গুড়। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের ভিড়ে গাছিদের উঠোন ও গুড় তৈরির স্থানগুলো এখন বেশ সরগরম।
খেজুর গুড়ের ক্রেতারা জানান, বাজারে বিক্রি হওয়া গুড়ে তেমন সুগন্ধ পাওয়া যায় না। সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণও করা যায় না। অথচ গাছির কাছ থেকে কেনা গুড়ের ঘ্রাণ অসাধারণ, যা এক বছরের বেশি সময় সংরক্ষণ করলেও নষ্ট হয় না। গাছিদের গুড় সম্পূর্ণ নির্ভেজাল ও রাসায়নিকমুক্ত। দাম বেশি হলেও এটি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভাটিবাড়ী গ্রামের গাছি বদিয়ার রহমান জানান, তিনি চুক্তিতে ৪০০টি খেজুর গাছ নিয়েছেন। পাঁচজন মিলে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি ও বিক্রি করছেন। কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহ থাকলে প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন ৩-৪ কেজি রস পাওয়া যায়। কুয়াশা কম হলে রস উৎপাদন অর্ধেকেরও কমে যায়। এক কেজি গুড় বানাতে ১১-১২ কেজি রস লাগে। বড় কড়াইয়ে রস ঢেলে ৬-৭ ঘণ্টা আগুনে জ্বাল দিতে হয়।
বদিয়ার রহমান জানান, কাঁচা খেজুর রস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৫-৫০ টাকা দরে। গত বছর দাম ছিল কম। চলতি মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি খেজুর গুড় ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অনেক ক্রেতা আগেভাগেই রাসায়নিকমুক্ত গুড়ের জন্য অগ্রিম টাকা দিচ্ছেন। ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা গ্রামের গাছি সুলতান হোসেন জানান, সাতজন মিলে তাঁরা ৫০০টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গুড় বানাতে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করি না। লোকজনের সামনেই গুড় তৈরি করি।’ প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি গুড় তৈরি করছি। সব গুড় ঘটনাস্থলেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে আপাতত পাইকারের কাছে গুড় দিচ্ছি না। লালমনিরহাট শহরের থানাপাড়া এলাকার কলেজ শিক্ষক শামসুল হক জানান, রাসায়নিকমুক্ত গুড় পেতে আমি গাছিকে অগ্রিম টাকা দিয়েছি। ২০ কেজি গুড় কিনেছি। পরিবারের জন্য কিছু রেখে বাকিটা আত্মীয়দের পাঠিয়েছি। আরও গুড় কেনার ইচ্ছা আছে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী অঞ্চল থেকে আসা গাছিরা কৃষকদের কাছ থেকে চুক্তিতে গাছ নিয়ে গুড় তৈরি করছেন। এতে স্থানীয় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং ভোক্তারা পাচ্ছেন ভেজালমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত গুড়। আমিও গাছির কাছ থেকে গুড় কিনে থাকি।