মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধু রাজনীতি বা নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি ধাক্কা লেগেছে বৈশ্বিক বিলাসবহুল পণ্যের বাজারেও। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি কমছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বিমানবন্দরগুলোর ডিউটি ফ্রি বাজার গভীর সংকটে পড়েছে।
ফ্রান্সভিত্তিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড হারমেস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের কারণে সেখানে ভোক্তা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সেও পর্যটকের সংখ্যা কম থাকায় প্যারিসে দামি পণ্যের বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হারমেস জানিয়েছে, বার্কিন ও কেলি ব্যাগ, সিল্ক স্কার্ফ ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি মুদ্রা সমন্বয়ের পর ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, তবে বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। মুদ্রার ওঠানামার কারণে প্রতিষ্ঠানটির আয় থেকে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ইউরো কমে গেছে, ফলে মোট বিক্রি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ইউরোতে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ইউরো।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ অতি ধনী পর্যটক—যাদের জন্য হ্যান্ডব্যাগের দাম শুরু হয় প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলার থেকে। এই পর্যটকরা না আসায় মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করা বিমানবন্দর ও কনসেশন স্টোরগুলোর বিক্রি কমেছে। এসব দেশে উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্রেতারাই সাধারণত দামি পণ্যের চাহিদা ধরে রাখে।
হারমেসের পাশাপাশি ইতালীয় বিলাসবহুল ব্র্যান্ড গুচিও সংকটে পড়েছে। গুচির মালিকানা প্রতিষ্ঠান কেরিং জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গুচির বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। এটি টানা ১১তম প্রান্তিক, যখন ব্র্যান্ডটির বিক্রি হ্রাস পেল। এই সময় গুচির মোট বিক্রি ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ইউরো, যা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে কম।
কেরিং বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এই পতন আরও তীব্র হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চলতি মাসে যুদ্ধের প্রভাবে কেরিং গ্রুপের মোট বিক্রি প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে, যা পুরো প্রান্তিকে গড়ে ১ শতাংশ ক্ষতির সমান। গুচির ক্ষেত্রেও প্রভাব প্রায় একই রকম।
এদিকে, শুধু বিলাসবহুল ব্র্যান্ড নয়—বিমানবন্দরনির্ভর ডিউটি ফ্রি দোকানগুলোও সংকটে পড়েছে। ডিএফএস, অ্যাভোল্টাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিউটি ফ্রি চেইন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় বা আংশিক চালু থাকায় যাত্রী কমেছে, ফলে প্রিমিয়াম সুগন্ধি ও মদ বিক্রি মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দরভিত্তিক কেনাকাটা ছিল বিলাসবহুল ও সৌন্দর্যপণ্য খাতের অন্যতম লাভজনক মাধ্যম। চীন ও ইউরোপে চাহিদা কমে যাওয়ার ক্ষতি পোষাতে এই খাত অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে সাময়িক বিমানবন্দর বন্ধ থাকলেও এর প্রভাব সরাসরি ত্রৈমাসিক মুনাফায় পড়ছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্তমানে সীমিতসংখ্যক টার্মিনাল চালু রেখেছে। সেখানে ল’ওরিয়াল মালিকানাধীন এইসপ, গুচি ও এস্তে লডারের জো মালোনের মতো ব্র্যান্ডের দোকান রয়েছে। অন্যদিকে, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বারবার হামলার কারণে পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সেখানে অবস্থিত অ্যাভোল্টা ও বুটসের দোকানগুলোর ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এভিয়েশন ডেটা প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বাতিলের হার একসময় ৬৫ শতাংশে পৌঁছায়। পরে তা কমে এলেও নির্ধারিত ফ্লাইটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কোভিড পরবর্তী সময়ে পুনরুদ্ধারকৃত ট্রাভেল রিটেইল শিল্প আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। বিলাসবহুল পণ্যের বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে এবং ততদিন পর্যন্ত বৈশ্বিক চাহিদা চাপে থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিডিপ্রতিদিন/কেকে