Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৭

বিচারপতিদের গাইডলাইনকে স্বাগত

মইনুল হোসেন

বিচারপতিদের গাইডলাইনকে স্বাগত

আগাম জামিন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক এক রায়ে প্রদত্ত নতুন গাইডলাইনগুলো আগের অনমনীয় অবস্থানের সঙ্গে তুলনায় অনেক নমনীয়। গ্রেফতারজনিত হয়রানি এবং জামিন প্রত্যাখ্যানজাত পারিবারিক দুর্ভোগ লাঘবে এ গাইডলাইনগুলো অনেক মানবিক বিবেচনাপ্রসূত। এ ধরনের গাইডলাইনকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয়। কিন্তু মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব বিবেচনায় রাখলে নিছক এফআইআরে আনীত অভিযোগ বাস্তবতার নিরিখে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা আরও নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। এফআইআরে আসামি করা হলেই ব্যক্তিকে আইনত অপরাধী কিংবা ফেরারি বলে বিবেচনা করা অন্যায়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণকারীকে আইনের প্রতি অনুগত গণ্য করাই বাঞ্ছনীয়। চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিলের আগে কোনো লোককে অপরাধী বলা যায় না বরং তাকে আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ বলে ধরে নিতে হবে। জামিনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগে দুর্নীতি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মামলার রাজনীতি সহজ হয়েছে। সংবিধান ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে নিঃশেষ করে দেয় সেসব বিষয় মাননীয় বিচারপতিদের জানা।

জামিন না পেলে পরিবারের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায় বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি হয়। চাকরি হারানো ছাড়া পারিবারিকভাবে অন্যদের জন্য কত ধরনের সমস্যা ও দুর্ভোগ  সৃষ্টি হতে পারে তা আমাদের দেশে অবশ্যই বিবেচনায় রাখার কথা। এসব মানবিক ও সামাজিক বিষয় বিবেচনায় না থাকা আমাদের বিচারব্যবস্থায় স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে চলে আসছে।

গ্রেফতার ব্যক্তি অপরাধী এবং তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে, এরূপ চিন্তাধারা বিচারকদের মধ্যে কাজ করে বলে মনে হয়। বিষয়টির গভীরে যাওয়ার কথা ভাবা হয় না। তা না হলে তাকে আদালতে হাজির করার সঙ্গে সঙ্গেই জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানো হতো না। তারপর পুলিশ রিমান্ডে দেওয়াও এত সহজ ব্যাপার হতো না। আমাদের দেশে মিথ্যা এফআইআর দেওয়া যে কত সহজ তা ভুলে যাওয়া হয়।

পুলিশকে সহায়তার নামে গ্রেফতার ব্যক্তির সংবিধান-প্রদত্ত স্বাধীনতাকে খর্ব করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটছে। আমাদের বিচারব্যবস্থায় নির্দোষ ব্যক্তিরা অধিকতর অসহায়। তারা সাধারণ ও সহজ প্রকৃতির এবং যারা সহজ পথকে সঠিক মনে করে তাদের মধ্যে নীতিবোধ একটু বেশি থাকে। আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার কোনো ভয় নেই বলা, বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোটেও সত্য নয়। আমাদের বিচারব্যবস্থায় পুলিশকে অধিক পরিমাণে বিশ্বাস করা হয়। একবার পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করলেই তাকে তার সব আত্মবিশ্বাস হারাতে হয়। তিনি সম্পূর্ণ অসহায়।

পুলিশনির্ভর রাজনীতির কারণে বর্তমানে পুলিশ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী। আর পুলিশের শক্তিবলেই সরকারও সর্বময় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে। জনসমর্থনের শক্তির প্রয়োজন হয় না।

চার্জশিট বা অভিযোগপত্রের আগে কারাগারে রেখে শাস্তি দেওয়া পুলিশি বিচার। কারণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কারাজীবন শুরু হয় বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে।

এর আগে আপিল বিভাগের এক রায়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আগাম জামিন সম্পর্কে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি উপলব্ধি করতে চাননি যে, এফআইআরের ভিত্তিতে আগাম জামিনপ্রত্যাশীকে কোনোভাবেই অপরাধী হিসেবে দেখা যাবে না। তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষকে তার অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ বিচারের জন্য তাকে নিরপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

অন্য একটি রায়ে স্বীয় ভাবমূর্তি নষ্ট করা প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, কারও বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলেই তিনি একজন পলাতক আসামি। যদিও তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তার মতে, কথিত ব্যক্তি একজন ফিউজিটিভ। তিনি আরও বলেন, একজন পলাতক আসামি যদি হাই কোর্ট বিভাগে আত্মসমর্পণ করে তবে তাকে হয় জামিন দিতে হবে অথবা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সংক্ষেপে বলা যায়, মাননীয় বিচারপতি এভাবে আগাম জামিনের ধারণাকেই নাকচ করে দিলেন।

মাননীয় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক তার প্রদত্ত রায়ে বলেন, হাই কোর্টের বিচারপতিদের সতর্কতার সঙ্গে এফআইআরের গভীরে না গিয়ে অযৌক্তিকভাবে স্বীয় বিবেচনা প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। তাদের তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, পুলিশের তদন্তকাজে যেন বাধা সৃষ্টি না হয়।

অন্য কথায় এফআইআরে একজন লোক সম্পর্কে আনীত অভিযোগ পুলিশি তদন্তে কোনো প্রমাণযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে কি যাবে না, জামিন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অন্য কোনো ব্যক্তিবিশেষ অভিযোগ আনলেই তাকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখতে হবে কেন? উভয়েই তো এ দেশের নাগরিক। যিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন তাকে বিশ্বাস করা হবে না কেন? মামলা দিয়ে কাউকে অপমান করা আমাদের দেশে খুবই সহজ।

সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বিচারে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামি যে নির্দোষ, এই সর্বজনীন ধারণা পূর্বেকার দুটি রায়ে মাননীয় বিচারপতিগণ মোটেই আমলে নেননি। পুলিশ রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে নয়, তার পরও পুলিশি শক্তিকে সর্বাধিক গুরুত্ব ও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তি একেবারেই অমানুষ ও অসহায়! অভিযোগ করা হয়েছে, তাই জেলে বন্দীজীবন তার ভোগ করতেই হবে!

পুলিশের তদন্তকাজে সহায়তার নামে নির্দোষ আসামির কারাবরণ কোনোভাবেই সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিচারকদের এ ধরনের চিন্তা অবশ্যই বিচারকসুলভ নয়। তারা এও চিন্তা করা প্রয়োজনবোধ করেন না যে, একবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়ে গেলে হাই কোর্ট তখন আগাম জামিনের বিষয় বিবেচনা করতে চায় না। সুতরাং আগাম জামিন না দিলেও আসামিকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা জরুরি নয়।

আদালতগুলো ভুয়া ও রাজনৈতিক মামলায় ভরপুর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এফআইআরে অভিযোগ করলেই জামিন প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা।

আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী প্রদত্ত রায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ একত্রে আগাম জামিন তথা জামিনের ব্যাপারে অনেক মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের প্রদত্ত এক গাইডলাইনে তারা বলেন,

গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আবেদনকারীকে হয়রানি ও অপমান করার জন্য অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কিনা দেখতে হবে। কারণ, গ্রেফতারের সঙ্গে জড়িত থাকে পারিবারিক দুঃখ-বেদনা ও অপমান। গ্রেফতারের পরিণতি শুধু আসামিই ভোগ করে না, পরিবার এমনকি একইভাবে সম্প্রদায়কেও ভোগ করতে হয়।

আরেক গাইডলাইনে মাননীয় বিচারপতিগণ বলেন,‘আগাম জামিনের মেয়াদ আট সপ্তাহের বেশি হওয়া উচিত নয় এবং চার্জশিট পেশ করার পর আগাম জামিন অব্যাহত থাকা উচিত নয়।’

চার্জশিট পেশ করার আগে তিনি অভিযুক্তই (ধপপঁংবফ) নন, অভিযোগপত্র পেশের আগে জামিন পাওয়ার প্রশ্নটিকে তার মৌলিক ও আইনগত অধিকারের অংশ হিসেবে দেখাই সুবিচার। গাইডলাইনগুলোয় এ ধরনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। স্বাধীন দেশে শাসনতন্ত্র আমাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কোর্টের বিচারে শাস্তি হলে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিন্তু বিচার ছাড়াই জেল খাটা তো আইন হতে পারে না। যদি না দেখা যায় যে ব্যক্তিটির অতীত কর্মকান্ড ভয়াবহ এবং সমাজের নিরাপত্তার জন্য তাকে জেলে রাখা জরুরি।

রাজনীতি যে পুলিশি মামলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তা তো আমাদের সবারই জানা। পুলিশকে কীভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাও তো অজানা কিছু নয়। পুলিশকে জনগণের আস্থা হারাতে হচ্ছে। বিচার বিভাগ ব্যক্তির মৌলিক এবং মানবিক অধিকার রক্ষায় কঠোর হলে পুলিশ রক্ষা পাবে, পুলিশি মামলার রাজনীতি থেকে কোর্ট-আদালত চাপমুক্ত হবে।

এফআইআরকে গভীরে গিয়ে দেখা এমন কোনো বড় বিষয় নয়। এফআইআরের মাধ্যমে একজনকে মিথ্যাভাবে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করে হয়রানি, অপমান এমনকি জেলে আটক রাখা খুবই সহজ। শুধু একটি এফআইআরের তথ্যানুযায়ী একজনের সাংবিধানিক অধিকার এত সহজে ক্ষুণœ করা যেতে পারে না। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও তার মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই আদালতের দায়িত্ব।

অত্যন্ত জোরের সঙ্গে আমরা বার বার মত প্রকাশ করেছি যে, বিচার বিভাগকে রাজনীতিকদের বলয় থেকে অবশ্যই বাঁচানো দরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত রাজনৈতিক মামলা এবং তাদের জেলে পুরে রাখার বাস্তবতা অস্বীকার করলে বিচারব্যবস্থাই একসময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। দেশে চলবে বিচারবিহীন হিংসা-বিদ্বেষের ক্ষমতা দখলের নৈরাজ্য।

এফআইআরের ভিকটিমদের জামিন আদেশ দিয়ে বিচারের জন্য পুলিশকে সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করার নির্দেশ প্রদান করলে আদালতে হয়রানিমূলক ও মিথ্যা রাজনৈতিক মামলার বোঝা হ্রাস পাবে। জামিন আদেশ না দেওয়ার জন্য আদালতের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে খোলাখুলিভাবেই চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমার নিজেরও সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে। জামিনযোগ্য মানহানির মামলায় নিম্ন আদালাতের অসহায় অবস্থা দেখে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে। ভুয়া মামলা দায়ের করার জন্য পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ প্রশস্ত করা যাবে না। তখন সরকার আদালতের বাহানা দিয়ে বলে, আদালত জামিন না দিলে সরকারের কী করার আছে! এটাই তো আইনের শাসন।

অন্যদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ দিয়ে বিচার বিভাগ এভাবেই নিজের ধ্বংস নিজে অনিবার্য করতে পারে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহার করার গণবিরোধী প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। একমাত্র সুপ্রিম কোর্টই সংবিধানের অভিভাবক ও রক্ষক হিসেবে মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে। রাজনীতি যে পুলিশি ব্যবস্থা নয়, তা প্রতিষ্ঠা করতে সুপ্রিম কোর্টকে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। বিচারব্যবস্থার শক্তি যে জনগণ ও জনগণ-প্রদত্ত শাসনতন্ত্র তা স্মরণে না রাখলে বিচারব্যবস্থা টিকে থাকবে না। 

সরকার যখন কাউকে আইনের আওতায় আনার কথা বলে তার অর্থ হলো তাকে পুুলিশের হাতে তুলে দেওয়া।

সংবিধানের রূপ-চরিত্র যতটুকুই থাকুক না কেন সংবিধান নামে গণতান্ত্রিক একটি দলিলের অস্তিত্ব যত দিন আছে তত দিন আমাদের অর্থাৎ বিচারক ও আইনজীবীদের বিচারব্যবস্থা রক্ষায় নিবেদিত থাকতে হবে। আইন ও আদালতকে ব্যবহার করে রাজনীতি করতে দেওয়া যাবে না। রাজনীতি রাজনীতির পথে চলবে। বিচারক ও আইনজীবীদের নেতৃত্ব থাকবে বিচারব্যবস্থায়। মৌলিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য সবাইকে সক্রিয় থাকতে হবে, যাতে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও রক্তাক্ত সংঘাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনা যায়।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।


আপনার মন্তব্য