শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:০৯

করোনাযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’

ড. আতিউর রহমান

করোনাযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’

২০০৮-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তৎকালীন শেরাটনে উপস্থাপন করেছিলেন ‘দিন বদলের সনদ’। তার কিছুদিন আগেই তিনি অন্যায্য বন্দীজীবন থেকে মুক্তি পান। অন্যায়ভাবেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী দলের নেতাকে জেলে নিয়েছিল। তাঁর দল ও সমর্থকরা তাঁর ওপর এ অন্যায় আচরণ মোটেও মেনে নেননি। গড়ে উঠেছিল প্রবল জনরোষ।  তাই একপর্যায়ে তাঁকে ছাড়তে বাধ্য হয় ওই সেনাসমর্থিত সরকার। তবে জেলে থাকার সময় তিনি অনেক হোমওয়ার্ক করেছিলেন। ঠিক তাঁর বাবার মতোই। বিশেষ করে সমাজের প্রান্তজন, উপেক্ষিতজন এবং তরুণদের কী করে সুরক্ষা এবং সম্ভাবনার সুযোগ দেওয়া যায় সেসব বিষয়ে প্রচুর ভেবেছেন এবং নোট নিয়েছিলেন। সেসব ভাবনারই প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছিলাম ‘দিন বদলের সনদে’। ওই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রাণভোমরা ছিল দুটো শব্দ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। তথ্যপ্রযুক্তিকে সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তরের কাজে কী করে লাগানো যায় সে কৌশলই ধরা পড়েছিল ওই শব্দসমষ্টিতে। ‘দিন বদলের সনদ’- এ আধুনিক ভাবনা যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা না বললেই নয়। তখনো আমরা বুঝে উঠতে পারিনি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আখেরে আমাদের জন্য কী ধরনের পরিবর্তনের বসন্ত বাতাস বয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু এ দেশের তরুণসমাজ ঠিকই এর মর্ম বুঝেছিল। তাই তারা বিপুলভাবে এ সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আর বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল দিন বদলের এক অবিস্মরণীয় উন্নয়ন অভিযাত্রা। পরিবর্তনের এ পথচলা এখনো অব্যাহত আছে। বেশ জোরেই চলছিল বদলে যাওয়া বাংলাদেশের পথচলা। হঠাৎ করোনা আক্রমণে বিশ্বজুড়েই নেমে এসেছে এক অভাবনীয় দুর্যোগ। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কিন্তু খুবই সাহসের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের সুফল আমরা এ সংকটকালে খুবই ভালোভাবে অনুভব করতে পেরেছি। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, দেশি-বিদেশি সংযোগ অব্যাহত রাখার যে সুযোগ আমরা পেয়েছি তাতেই বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। এ কথা ঠিক, এ সংকট আমাদের সমাজের নিচের দিকের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। কিন্তু ‘হার না মানা’ বাংলাদেশ ঠিকই ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে এ দুঃখী ও প্রান্তজনদের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। সারা দেশের দুঃখীজনের পাশেই সামাজিক সেবার ডালি নিয়ে পৌঁছে গেছে বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকার। তাই তিনি যথার্থই বলতে পেরেছেন ‘আমার সরকার মানে মানুষের সেবক’। ১৪ জানুয়ারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্কভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উপবৃত্তির টাকা দুটো মোবাইল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠানোর কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় এ কথা বলেন। তিনি সেদিন আরও বলেন, ‘আমরা যে ভাতা দিচ্ছি এটা যেন যথাযথ, সঠিকভাবে যে মানুষটাকে আমরা দেব তার হাতে পৌঁছায়। মাঝে যেন আর কেউ না থাকে।’ এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে তাঁর সরকার দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন ওইদিন। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রান্তজনের জন্য ডিজিটাল আর্থিক সেবার এ সুযোগ বাস্তবে কার্যকর করায় তিনি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছেন। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ মানে শুধুই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন নয়, এ প্রযুক্তিকে গণমানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় তাকেও বোঝায়। কদিন আগে ২৭ বিলিয়ন টাকার নতুন দুটো স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে। এগুলোর লক্ষ্য কুটিরশিল্প ও খুদে উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা, গ্রামের প্রান্তিক মানুষের আয়-রোজগার বৃদ্ধি, অতিদরিদ্রদের নিরাপত্তা দেওয়া ও বিধবাদের ভাতা। আশা করি এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল পদ্ধতির সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটানো হবে। রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, ভেরেন্ডার তেল দিয়ে কুপি জ্বালানোর দিন শেষ হয়েছে বিজলি বাতি আসায়। নিশ্চয় এটি অগ্রগতির লক্ষণ। কিন্তু এই বিজলি বাতি যেন সবার ঘরে পৌঁছায় সেটিই ছিল তাঁর মূল আকাক্সক্ষা। আর তা করা গেলেই প্রযুক্তির সুফল অর্থবহ হবে বলে তিনি মনে করতেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রযুক্তির ওই সর্বজনীন সুযোগ সৃষ্টির কথাই যেন বলে। তাই অবাক হইনি যখন তিনি বলেছেন যে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন যে এমন সুবর্ণ সময়ে দেশে কোনো গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। একটি ঘর যে মানুষের শুধু আবাসন নয়, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক এবং আয়-রোজগারের কেন্দ্র সে বিষয়টি নিশ্চয় তাঁর মনে রয়েছে। তাই তিনি সেদিন বয়স্কভাতাকে শুধু টাকার অঙ্কে না দেখে মানুষের আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। আর সমাজের পিরামিডের নিচের মানুষগুলোর এ সুযোগ সৃষ্টির কাজ শুধু একা সরকারের নয়, সে কথাটিও তিনি সমাজের বিত্তবানদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে সচেষ্ট সমাজই একটি মানবিক জাতি গঠনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এ সমাজের চাহিদা থেকেই যেসব উদ্যোক্তা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য দিন দিন বড় করছেন সেই সমাজের প্রতি তাদেরও যে দায়বদ্ধতা আছে সে কথাটিই তিনি শুধু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

এসব কথা যখন বলছিলেন তখন আমাদের দেশের দুটো মোবাইল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। সরকারের এসব সামাজিক ভাতা প্রান্তজনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ রাখতে হবে। উল্লেখ্য, যারা এ প্রক্রিয়ায় এসব ভাতা পাবেন তাদের কোনো চার্জ বহন করতে হবে না। এ চার্জ ভাগাভাগি করে নেবে সরকার এবং মোবাইল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সমাজকল্যাণ অধিদফতর পাইলট শেষ করেই এ কাজে নেমেছে। তাদের খেয়াল রাখতে হবে যে এ মোবাইল আর্থিক লেনদেন করতে হিসাব খোলার জন্য বিএফআইইউর দেওয়া শর্ত যেন সবাই মেনে চলেন। সশরীরে উপস্থিত থেকে হিসাব খোলার যে নিয়মটি অধিদফতর করেছে তাও প্রশংসনীয়। এখন ৬০ হাজারের বেশি ডিজিটাল সেন্টার আছে। ই-কেওয়াইসি করা এখন বেশ সহজ। আমার বিশ্বাস এ কাজটি যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গেই ‘বিকাশ’ ও ‘নগদ’ করবে। গরিবের টাকা কোনো অবস্থাতেই যেন বেহাত না হয়ে যায় সে দিকটায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিশ্চয় মনিটর করবেন। গত বছর করোনা মোকাবিলায় নগদ সহায়তা দেওয়ার সময় যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছিল সেসব থেকে নিশ্চয় অংশীজনেরা সবাই শিখেছেন। আর সে অভিজ্ঞতা থেকে শিখে আমরা যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে যথার্থভাবে সম্পন্ন করতে পারি তাহলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আরেকটি মাইলফলক অর্জন করবে। আমরা যে পারি তা আগেও বহুবার দেখিয়েছি। এ করোনা সংকটকালে ফের আমাদের তা দেখানোর নতুন সুযোগ এসেছে। ইতিমধ্যে প্রায় এক দশকে মোবাইল আর্থিক সেবা অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষ করে করোনা সংকটকালে এর ব্যবহার এতটাই কার্যকর হয়েছে যে মানুষ এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ঘরে বসেই অনেকে লেনদেন করতে পারছে। একইভাবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও সামাজিক সেবার কিছু কার্যক্রম চালু হয়েছে। সে অভিজ্ঞতাও বেশ ভালো। এর আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে যে প্রচুর তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এর ফলে। তারা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার তো হচ্ছেই। সঞ্চয়ও বাড়ছে। বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা। তৃণমূলে যাওয়ার অভাবনীয় সব তৎপরতা।

এসবই সম্ভব হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের আওতায় ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল বলে। কোর ব্যাংকিং সলিউশন, বিএফটিএন, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ, অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউস, অটোমেটেড সিআইবি, আরটিজিএস- এমন অসংখ্য ডিজিটাল লেনদেন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যার সুফল এখন আমরা পাচ্ছি। এর পাশাপাশি সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, বিশেষ করে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন কর্মসূচি আমাদের প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সার্বিক নিরাপত্তা ডিজিটাইজ করতে অসাধারণ সব উদ্যোগ নিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার পরামর্শে এবং আমাদের তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দিন দিনই তার চেহারা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে চলেছে। আমরা যে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের চেয়ে এ দুঃসময়েও ভালো করছি তার পেছনে নিঃসন্দেহে তথ্যপ্রযুক্তির এ প্রসারের ভূমিকা অসামান্য।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও তার কর্মীবাহিনী এমন দুঃসময়েও কাক্সিক্ষত ভূমিকাই পালন করে চলেছে। নিশ্চয় বেড়েছে তথ্যপ্রযুক্তি সেবার চাহিদা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে আমাদের দেশে ই-কমার্সের বাজারের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২০ সালের বছর শেষে তা বেড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মীবাহিনী। অনেকেই ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে অফিস খুলেছেন। সারা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ রেখে তারা সেখান থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করে চলেছে। গ্রামের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ডিজিটাল কর্মী হিসেবে গড়ে তুলছে। তাই অবাক হইনি যখন জেনেছি যে ২০২০ সালে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে আড়াই গুণ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গ্রাহক বেড়েছে ১ কোটির বেশি। ব্যান্ডউইডথের ব্যবহার বেড়েছে ২.৪৪ গুণ। তরুণ-তরুণীরা এখন ওয়েব সার্ভিস, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ নানামুখী প্রযুক্তি সেবা দিতে এগিয়ে আসছে। তরুণদের মধ্যেই কর্মসংস্থানের অভাব সবচেয়ে বেশি। তাই তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এসব ডিজিটাল সেবাভিত্তিক কর্মসংস্থান প্রসার নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য শুভ বার্তা বহন করছে। কোন দিকে আমাদের অর্থনীতিকে হাঁটতে হবে তা বুঝতে সুবিধা হচ্ছে এসব সেবার প্রসারিত রূপ দেখে। প্রচলিত চাকরি-বাকরির সুযোগ যখন সংকুচিত হচ্ছে তখন প্রযুক্তিনির্ভর এসব সেবা খাতে নতুন উদ্যোক্তাকে কী করে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজারজাতকরণে আমরা সহযোগিতা করতে পারি সেদিকেই বেশি নজর দিতে হবে।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ অনেক ধরনের বৈষম্য দূর করতে সাহায্য করছে। গ্রামে-গঞ্জেও পৌঁছে গেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এর সুফল পাচ্ছে অনেক খুদে উদ্যোক্তা। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে এখন বিদ্যুৎ বিল, জমির ই-পর্চা, মিউটেশন, পাসপোর্ট ফরম পূরণ, ভিসার আবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, ই-চালান, পেনশনসহ নানামাত্রিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে। পাশেই এজেন্ট ব্যাংক। ধারেকাছে মোবাইল আর্থিক সেবার এজেন্ট। ব্যাংকের শাখা-উপশাখা। তাই সারা দেশেই ঘরে বসে কেনাকাটা, মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল, ব্যাংক-বীমার কিস্তি পরিশোধ এবং সামাজিক কর্মসূচির ভাতা তোলা সম্ভব হচ্ছে। তা ছাড়া নিমিষেই বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসী আয় পৌঁছে যাচ্ছে উপকারভোগীর কাছে। গার্মেন্টসহ রপ্তানিমুখী কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই। সরকারের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সমর্থনের ফলে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটছে বেশ দ্রুত। পড়ালেখা, আড্ডা, বিনোদন, কেনাকাটা সবই হচ্ছে ডিজিটালি। দেশে এখন ১৬ কোটির বেশি মোবাইল গ্রাহক। এর বড় অংশই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের দোরগোড়ায় সরকারি ও বেসরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জোরদারের জন্য সব সেবাকেই ডিজিটাইজ করার ওপর গুরুত্ব অব্যাহত রাখা চাই। আশার কথা, এরই মধ্যে ৩৮৯টি সেবাকে ই-সেবায় রূপান্তর করা হয়েছে। এ বছর আরও ১ হাজার ৮৮৭ সেবার এমন ই-রূপান্তর ঘটবে বলে জানা গেছে। এটুআই জানিয়েছে, এ যাবৎ ৩৮ কোটি ই-সেবা নিয়েছে এ দেশের মানুষ। বর্তমান বছরে এর পরিমাণ ৯২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। শুনে আরও ভালো লাগছে যে এখন ৬৭টি দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নানা পণ্য ও সেবা রপ্তানি করছি আমরা। এ খাতের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে এর পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এ লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ২৮টি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করছে। দেশের ভিতরেও সফটওয়্যার সেবার বাজার ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আরও ১০০ নতুন নাগরিক সেবা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। তাদের এ কর্মস্পৃহা অব্যাহত থাকুক। এভাবে চললে গ্রামের প্রায় সব মানুষের কাছেই ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে পাঁচ বছরের বেশি লাগবে বলে মনে হয় না। তদ্দিনে ২০ লাখের মতো কর্মসংস্থান ঘটবে এ খাতে। এ খাত ২০২৫ সাল নাগাদ তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশ যোগ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। সবচেয়ে খুশির কথা যে ভোলার নিভৃতদ্বীপ চরকুকরিমুকরি এবং উপকূলীয় দ্বীপ মহেশখালীও ডিজিটাল অবকাঠামোর বাইরে থাকবে না বলে প্রত্যাশা করছে সরকার। এভাবেই পুরো দেশটি একটি সমন্বিত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর আওতায় চলে আসবে। তখন গণমানুষের সব সেবাই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জোগান দিতে পারবে সরকার।

করোনাকালে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও বাণিজ্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে হাঁটছে ডিজিটাল বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো হাতে নিয়ে। তবে অনেকের পক্ষেই এখনো এ সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর সে জন্যই বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারকে দিনরাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এখনো অনেকটা পথ হাঁটা বাকি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের সরকারপ্রধান এ কথাটি জানেন। বোঝেন। তাই তো তিনি বলতে পারেন, ‘মাইলের পর মাইল আমাকে যেতে হবে। আমাকে ক্লান্ত হলে চলবে না, ঘুমালে চলবে না।’ তাঁর চলার এ পথ নিরাপদ থাকুক। নির্বিঘ্ন হোক। তাঁর এ ‘ক্যারাভান’ সফল হোক।

 

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইমেইল : [email protected]


আপনার মন্তব্য