হাঁড়িতে ভাত রান্না ঠিকঠাক হয়েছে কি না, বুঝতে একে একে সব চাল টিপে দেখার দরকার নেই। ফুটন্ত চালের একটি দেখলেই হয়। সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম পালন করা সংগত? কোনো বাড়ির ছেলে বা মেয়েরা কতটা ভালো বা মন্দ, নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে সেই বাড়ির একটি ছেলে বা একটি মেয়েকে যাচাই করলে কি চলবে? না, চলবে না।অংশ দিয়ে সমগ্রের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের রীতি সব সময় অনুসরণ করলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবেই। জুলমত আলী পাইকার ওই রীতি অবলম্বন করতে গিয়ে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, খাদের কিনারায় গেলেও শেষতক বিপন্ন হননি। দুই বিড়াল তাকে উদ্ধার করেছে। সেটা আবার কী?
পাইকারের পাশের বাড়িতে সদ্য ওঠা ভাড়াটের সাত ছেলে। এক ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়। ছেলেটি অতিভদ্র। পাইকার ধরে নেন, এই ছেলের ছয় ভাইও তারই মতো অতিভদ্র। সাত ছেলের পিতা ধবল পাটোয়ারিও হবেন অতিভদ্র। নতুন পড়শিকে বেয়াই বানানোর প্ল্যান করেন তিনি। তাঁর কলেজপড়ুয়া সুন্দরী সুশীলা মেয়েটির জন্য অতি অবশ্যই যথার্থ পাত্র হওয়ার যোগ্যতা ধরে ওই ছেলে।
পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দিন সাতেক পরে এক দুপুরে নাদুসনুুদুস দুই বিড়াল এসে এ বাড়ির কিচেনে ঢুকে মাছ-মাংস ভাত-তরকারি খেয়ে তাদের স্বগৃহে গমন করে। স্বগৃহ
মানে নতুন ভাড়াটে ধবল পাটোয়ারির বাসভবন। বিনা বাধায় সুস্বাদু খাদ্য উদরসাৎ করার সুযোগ পেলে মানুষ বারবার ওই সুযোগ নিতে চায়। বিড়াল তো চাইবেই। দ্বিতীয় দিনও তারা এ বাড়ির জানালা হয়ে কিচেনে তসরিফ আনে; মজাসে পেটভরে খায় এবং জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়। তৃতীয় দিন গৃহস্বামীর বডিবিল্ডার পুত্রের নজরে পড়ল তারা। বডিবিল্ডাররা দেখেছি সাধারণত বিনয়ী ও নরম মেজাজি হয়ে থাকেন। নরম মেজাজি মানুষ রেগে আগুন হলে দমকল বাহিনীর নিক্ষেপ করা পানিকেও নাকি পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। বডিবিল্ডার তার সবল দুই হাতে পাটোয়ারির দুই বিড়ালকে ধরে মারলেন জোরসে আছাড়। তাতে দুই বিড়ালই হয়ে গেল ল্যাংড়া।
আছাড় ঘটনার পরদিন সকাল ৮টা। বডিবিল্ডারদের বাড়িতে ঘণ্টি বাজলে গৃহকর্তা জুলমত আলী পাইকার দরজা খুলে দেখেন হ্যাট মাথায় লম্বু মোটকা প্যান্টশার্টশোভিত ও ভুঁড়িখানা ফাটোফাটো এক মানব দণ্ডায়মান। পাইকারের প্রশ্ন : কী চাই? উত্তর পেলেন : আমার রন্টি-পন্টিরে লুলা করেছে যে বেজন্মা তারে চাই। আছাড় মেরে ওর মাজা যদি না ভাঙি আমার নাম ধবল পাটোয়ারি না। কই, কে সে, তুমি?
ওরে আল্লাহ হবু বেয়াইর কী ব্যবহার! মনে মনে নিজেকে চপেটাঘাত করেন জুলমত পাইকার। এই খাটাসের ছেলেকে যোগ্য পাত্র ভাবলাম? গাব গাছে গাবই ধরে। যারে পছন্দ করেছিলাম সেও গাব। আমের মুখোশ ধারণ করে গাবটি মিঠা মিঠা কথা বলেছে। মাথা ঠান্ডা রেখে পাইকার বলেন, বিড়াল দুটির নাম রন্টি আর পন্টি? বাহ্ সুন্দর নাম রেখেছেন। ধবল বলেন, স্টপ ইয়োর খাজুরা আলাপ টেল মি হুজ দ্য কালপ্রিট? ইউ? অর সামবডি এল্স?
পিতার কাছে কে এলো? এসেছে আবার উঁচা আওয়াজও দিচ্ছে। যাই দেখে আসি। ভাবতে ভাবতে প্রবেশ দরজায় এসে পড়ে জুনিয়র পাইকার। তার পরনে শ্যান্ডো গেঞ্জি, সুস্পষ্ট বাহুর পেশি প্রকাশ্য। সে বলে, হু ইজ বার্কিং য়্যাট আওয়ার ডোর? পাটোয়ারি বলেন, সালামু আলাইকুম। আমি আপনাদের নেইবার। পরিচিত হতে এলাম। বডিবিল্ডার বলে, এসেছেন ভালো কথা। বার্কিং লাইক (কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ) সাউন্ড দিচ্ছেন কেন?
জুলমত পাইকার বলেন, ধূর্তজন কত রঙ্গই না জানে! বাপরে করে তুই তোকারি, ছেলেরে দেয় সালাম। আস্ফালন করতে এসে দাবড়ানি খাওয়ার ভয়ে দেয় ডিগবাজি। বলে সখা হে বুকে ধর মোরে, বাঁধি বাহুডোরে। আমরা বাপ-বেটা পড়শিকে স্বাগত জানিয়ে ভিতরে নিয়ে বসাই। চা-নাশতা খাওয়াচ্ছি। এমন সময় একটা আওয়াজ পাই- ‘আব্বারে আটকে রেখেছে। কুত্তার বাচ্চাদের এত সাহস?’ ধবলের সাত পুত্র পিতা উদ্ধার অভিযানে নেমেছে। কে বা কারা রটিয়েছে যে পাশের বাড়ির লোকরা ধবল পাটোয়ারিকে বন্দি করে রেখেছে।
গাব গাছে যে আম ধরে না, ফের প্রমাণ পাওয়া গেল। এটাও প্রমাণিত হলো ‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’ প্রবচনটি নিরর্থক নয়। পাটোয়ারির সাত পুত্রের আস্ফালন শুনে ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় জুনিয়র পাইকার। জানতে চায়, কুত্তার বাচ্চা বলেছে কোন শুয়োরের বাচ্চা? প্রশ্নের জবাবে পাটোয়ারির বাচ্চারা দেয় লম্বা দৌড়।
২.
‘জোনাকি’ নামে সাময়িক পত্রিকায় একবার ‘অল্পবিদ্যায় বিস্তর সমস্যা’ নামে এক নিবন্ধ পড়েছিলাম। সম্পাদক আসিরউদ্দিন আহমেদ পুরোনো ফাইল থেকে বের করে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত নিবন্ধটি দিয়ে বলেন, ‘পড়। জ্ঞান বাড়বে।’ পড়ে থ হয়ে গেলাম। ইতালীয় এক পর্যটক মাসাধিককাল ধরে পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমাংশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। দেশে ফিরে তিনি সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় তাঁর ভ্রমণ বিবরণী ছাপিয়েছেন। লিখেছেন, ‘ঢাকা’ নামে এক শহরে চার দিন থেকেছি। শহরের লোকরা বিদেশিদের খুব আদর-যত্ন করে। এটা-সেটা স্বাদু খাওয়ানোর জন্য উতলা হয়ে যায়। তারা বেঙ্গলি ও উর্দুতে কথা বলে। বাটার অয়েল মাটন আর রাইস দিয়ে ‘বিরিয়ানি’ নামক মজাদার এক খাবার বিক্রি হয় ঢাকা শহরে।
‘পয়সা বাঁচানোর জন্য আমি হোটেলে না উঠে ফিরুজ শাহ নামক যুবকের বাড়িতে উঠি। ফিরুজ আমাকে শহরে লায়ন সিনেমায় “সারকারোজ” নামের উর্দু ফিল্ম দেখিয়েছে। ফিরুজ উর্দুভাষী। আমার সঙ্গে ইংরেজিতে ভাব-বিনিময় করতে চায়। ওর ইংরেজি দুর্বোধ্য। সেজন্য তাকে বলি, কলকাতা ভ্রমণকালে আমি মোটামুটি কাজ চালানোর মতো বেঙ্গলি শিখেছি। বেঙ্গলি পড়তেও পারি।’
‘ঢাকায় যে কদিন থেকেছি শহরবাসীর আতিথেয়তা, আপন করে নেওয়ার একাগ্রতা, ভালোবেসে উপহার দেওয়া আমায় মুগ্ধ করেছে। যত দিন নিঃশ্বাস ফেলব-নেব ঢাকার স্মৃতি আমার অন্তরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। শুধু একটি বিষয়ে দুঃখ পাই। শহরটিতে নারীরা যত্রতত্র সন্তান প্রসব করে। সুখের বিষয়, সরকার এটা বন্ধ করতে সচেষ্ট। নানা জায়গায় ফলক টানিয়ে দিয়ে সাবধান করা হয়েছে উন্মুক্ত স্থানে প্রসব করলে শাস্তি পেতে হবে।’
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে অল্পবিদ্যা ভয়ংকর। লায়ন সিনেমার কাছাকাছি একটি দেয়ালে লাগানো ফলকে ‘প্রস্রাব’ লেখার কথা ভুলে লেখা হয়েছে- ‘এখানে প্রসব করিবেন না, করিলে দণ্ডনীয় হইবেন।’ বানানে ভুল করা নাগরিক জীবনের অংশ। ইতালীয় পর্যটক ওই ভুলের জন্য শহরের সমগ্র নারীর ওপর ঢালাও কালি ছিটিয়ে দিলেন।
৩.
সমাজতন্ত্রপন্থি জোহরান মামদানি (ডেমোক্রেটিক পার্টি) নিউইয়র্ক নগরীর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর কয়েকজন পণ্ডিত (যাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়ার সুযোগ প্রাপ্তির জন্য মুখিয়ে থাকেন) বললেন, ‘নিউইয়র্ক শুরু করেছে। এখন হাওয়া বদলের হাওয়া বয়ে যাবে আমেরিকার উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তে। দশ কি পনেরো বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব শহরেই মামদানির মতো নওজোয়ানরা মেয়র পদে বসে ছড়ি ঘোরাতে থাকবেন।’
এমন ধারণা পোষণকারীরা অংশকে নাড়াচাড়া করে মোটাতাজা দেখতে পেয়ে রায় দেন- ‘গোটা দেহ অবশ্যই মোটাতাজা।’ এটাও দেখলাম যে কয়েক গবেষক বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব শহর-নগরে মুসলমান মেয়র ক্ষমতাসীন হতে চলেছেন দশ বছরের মধ্যে। এই প্রকার গবেষকদের আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিকতা প্রায় অভিন্ন। ট্রাম্প অবশ্য মনের সব কথা ফটাফট বলে দেন না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেন, মামদানি একটা গোঁড়া কমিউনিস্ট। এরে জিতিয়ে মেয়র করলে আমেরিকার সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই মামদানি জিতলে কেন্দ্র থেকে যে তহবিল ফি বছর নিউইয়র্কে আসে তা আমি বন্ধ করে দেব।
ট্রাম্পের এই হুমকি ভয়ার্ত প্রেসিডেন্টের হুমকি। ভয়টা কিসের? মেয়র নির্বাচনে মামদানির বিজয়ে নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি সংকোচন সংকটে পড়বে। ‘ইহুদি’র প্রতিশব্দ ‘জিউ’। বিশ্বে ইহুদিরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বাস করে ইসরায়েলে। দ্বিতীয় স্থানে নিউইয়র্ক নগরী। এখানে ব্যবসাবাণিজ্য রাজনীতি-সংস্কৃতিতে তাদের এতই চোটপাট যে কোনো কোনো রসিকজন নিউইয়র্ককে ‘জিউইয়র্ক’ বলে থাকেন।
‘মামদানিকে ভোট দিও না। সে ইহুদিবিদ্বেষী।’ আবেদন জানিয়েছিলেন নিউইয়র্কের পোলা (পূর্বপুরুষরা জার্মানি থেকে আসা অভিবাসী) ডোনাল্ড ট্রাম্প। জোহরান মামদানি (জন্ম উগান্ডায়, সাত বছর বয়সে ভারতীয় বাবার সঙ্গে আমেরিকায় অভিবাসী) বলেন, সর্বজনীন মানবাধিকারে বিশ্বাসী আমি ইসরায়েলের টিকে থাকবার অধিকার সমর্থন করি। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মর্যাদার স্তর পর্যায়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর ইহুদিদের স্থান দেওয়াটা আমার বিশ্বাসের সঙ্গে খাপ খায় না।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নিউইয়র্কের যত ইহুদি তার এক-তৃতীয়াংশ মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। তারা ট্রাম্পের নিবেদনে কর্ণপাত করেননি। কারণ তারা নগরীর বঞ্চিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অংশ, ট্রাম্পকে তোষণ-পোষণ করে রাজনীতিতে জিইয়ে রাখায় ব্যস্ত ধনপতি ইহুদি তারা নন। ইহুদি ধনপতিরা তো তাদের সঙ্গে অন্য সব ধনপতিরাও ছিলেন। তারা ২৬ ধনপতি ভয়কে জয় করার জন্য জোটবদ্ধ হয়ে মামদানির প্রতিপক্ষ দুই প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুয়োমা (স্বতন্ত্র) ও কার্টিস স্লিউয়ার (রিপাবলিকান) প্রচারণার পেছনে ঢেলেছেন ২ কোটি ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা)।
ধনপতিরা মনে করে মামদানির উত্থান তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করবে। ১ জানুয়ারি ২০২৬ মামদানির অভিষেক। তারপরই তিনি সস্তায় বসবাস, সহনীয় মূল্যে নিত্যপণ্য কেনার জন্য দোকান খোলা, শিশু পরিচর্যা পাওয়া সহজকরণ, সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দেবেন। প্রকল্পগুলোর সাফল্য মানে ধনকুবেরদের ভয়ানক স্বার্থহানি। তাই আমার শঙ্কা তারা মামদানিকে ব্যর্থ করার চক্রান্ত চালিয়ে যাবেই।
‘আমার বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে ওরা।’ মামদানি বলেন, ‘হারানোর জন্য তারা কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে। তারা বলে আমি ও আমার সমর্থকরা ওদের অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছি। হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি, ওরা ঠিকই বলছে।’
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন