নদীমাতৃক বাংলাদেশ। একসময় দেশের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নৌপথই। সময়ের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথের প্রভূত উন্নয়ন হলেও এবং দুঃখজনক অবহেলার শিকার হওয়ার পরও নৌপথের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আজও অক্ষুণ্ন। রাজশাহী, পদ্মা-তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী, যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর গড়ে তোলার দাবি এখন সময়ের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
রাজশাহী শহর প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত, যা নৌপরিবহনের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই উপযোগী। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চল রকমারি কৃর্ষিপণ্য, ফলমূল ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ। কিন্তু এসব পণ্য রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহনের ক্ষেত্রে খরচ ও সময় দুই-ই বেশি লাগে। নৌবন্দর স্থাপন হলে কম খরচে ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। রাজশাহী নৌবন্দর গড়ে উঠলে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্যেরও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
দুই বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে নৌবন্দর চালু হলেও এক সপ্তাহ পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হিসেবে বলা হয়, নদীর নাব্য সংকট। ফলে বন্দরটি চালু রাখতে নদীর নাব্য রক্ষায় নিয়মিত
ড্রেজিংব্যবস্থা চালু রাখা প্রয়োজন। পণ্য ওঠানামার জন্য জেটি, গুদামঘর, কোল্ডস্টোরেজ ও কনটেইনার ইয়ার্ড, কাস্টমস, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও রেল সংযোগ উন্নয়ন চাই- যাতে নৌবন্দরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হয়।
রাজশাহী নৌবন্দর চালু রাখা গেলে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। পরিবহন খরচ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। স্থানীয় ব্যবসা, শিল্প ও গুদামশিল্প বিকশিত হবে। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। রাজশাহী ও আশপাশের জেলা উন্নয়নবলয়ে যুক্ত হবে। তবে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও আছে। পদ্মা নদীর নাব্য অনেক স্থানে কমে গেছে; নিয়মিত খনন বা ড্রেজিং ব্যয়বহুল। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের বৈষম্য নৌযান চলাচলে প্রভাব ফেলে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হতে পারে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কা আছে যদি পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়। রাজশাহী নৌবন্দর শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও উদাহরণ হতে পারে, যদি সৌরবিদ্যুৎ ও সবুজ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। নদীদূষণ ও মাটি ক্ষয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেওয়া হয়। স্থানীয় জেলেপাড়া ও জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। রাজশাহী নৌবন্দর চালু রাখা গেলে এটি কেবল উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হবে না, বরং পুরো দেশের বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থায় উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ। রাজশাহীর নৌবন্দর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি হতে পারে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মুক্তির সোপান।
লেখক : সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিন