সারা দেশে নারীর ওপর সহিংসতা বেড়ে চলেছে মারাত্মকভাবে। শেখ হাসিনার আওয়ামী শাসনামলে নারী নিপীড়ন বেড়েছে বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় নজিরবিহীন মাত্রায়। পতিত সরকারের লোকদেখানো ‘নারীর ক্ষমতায়ন প্রদর্শনী’র সময়ে নারীর ওপর নির্যাতন, সহিংসতা, অসম্মানজনক আচরণ, অর্থনৈতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক শোষণ বৃদ্ধি পেয়েছে লাগামহীনভাবে। সেই নৈরাজ্যের ধারাবাহিকতার যে তাণ্ডব সেসব ঠেকাতে এখন রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নাস্তানাবুদ দশায়। নারীকে ঘিরে এসব নেতিবাচক তৎপরতায় সমগ্র সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, দেশব্যাপী নারীসমাজের ভয়াল আর্তচিৎকার সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু নারীসমাজের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের স্লোগানের মাঝেও তাদের ওপর সহিংসতা অবিরাম চলমান। সার্বিক প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনায় রাষ্ট্র সরকার আর সমাজ সবাই ব্যর্থ, নিদারুণ অসহায়। নিপীড়িত নারী বা তাদের স্বজনরা যথার্থ বিচার পাচ্ছেন না। উল্টো দিকে নোংরা পুরুষতান্ত্রিকতার জয়জয়কার, সমাজ-সরকার রাষ্ট্র ধর্ম ব্যবসার নিয়ন্ত্রকদের, সবারই পোয়াবারো, তাদের ঠেকানোর শক্তি যেন কারও নেই। নারীকে শোষণ, তার ওপর অবিরাম পীড়ন যেন নিত্যকার স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যেন নারীর জন্মই হয়েছে পুরুষের নানামুখী অত্যাচার-অনাচার সহ্য করেও তাদের দাসীবৃত্তির উদ্দেশ্য। বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোতে নারী প্রায়-ক্রীতদাসতুল্য জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রায় দুই দশকের ফ্যাসিস্ট এবং জনপ্রতিনিধিত্ববিহীন শাসনের পরে। নির্বাচনি প্রচারকালেই নারীর জীবন, সম্মান-ইজ্জত সুরক্ষা এবং সহিংসতা রোধ-কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র নারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের তৎপরতা অতীব জরুরি। আমাদের লড়াকু নারীনেত্রীদের প্রত্যেক সংসদ সদস্য প্রার্থীকে অঙ্গীকার করাতে হবে-তাঁরা নারী নির্যাতন বন্ধে, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নে এবং নারীকে রাষ্ট্র-সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে দায়বদ্ধ থাকার এবং তা না হলে তাঁরা নারীর ভোট চাইতেই পারবেন না। কঠিন-কঠোর ভাষায় নারী জাগরণের নেতাদের এভাবে দাবি আদায় করতে হবে।
ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নারীকে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সব জায়গায় নিরাপত্তা ও সম্মান-শ্রদ্ধার নিশ্চয়তা বিধানের অপরিসীম প্রচেষ্টা চালিয়ে নজির সৃষ্টি করেছেন। সব ধর্মাবলম্বীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের ধর্মভিত্তিক দল ও ব্যক্তি এবং ধর্মীয় নেতাদের একাংশ নারীকে নানাভাবে পীড়নের শিকার বানাতে চায়। তারা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাধা দেয়, নানা রকম গ্রামীণ কুসংস্কার প্রথা দ্বারা নারীসমাজের দুর্বল অংশগুলোকে, বিশেষভাবে শ্রমজীবী-কর্মজীবী দরিদ্র নারীকে অবিরাম শোষণ-নির্যাতন করে চলেছে। তারাই ধর্মের অনুশাসনের নানা রকম অপব্যাখ্যা দিয়ে, নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে, নানাভাবে নারীশিক্ষার পথে নানামুখী কর্মসংস্থানের পথে বাধা দিয়ে চলেছে। ফলে নারীর সত্যিকার ক্ষমতায়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই পরিস্থিতির সুযোগে নারীর প্রতি পুরুষ সমাজের এক অংশের অবজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক শোষণ ও নানা নিপীড়নের সুযোগ বাড়ছে। বস্তুত পুরুষতন্ত্রনির্ভর একশ্রেণির পুরুষ অশিক্ষা, কুশিক্ষা, নানা কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যাখ্যা আর ভণ্ডামির মাধ্যমে নিজ স্বার্থে নারীকে বিশেষভাবে অর্থনৈতিক শোষণ এবং নিজেদের বিকার মেটানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে অবিরাম। নারী নিপীড়নের সুযোগ বাড়ছে একশ্রেণির টাকাওয়ালা সমাজ-মাতব্বরদের লাম্পট্য-প্রবণতা, মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত অপরাধীদের অপকর্মের ধারাবাহিকতায়। আর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তো যুগ যুগ ধরে নারী প্রগতির বিরুদ্ধে সক্রিয়। এরই সঙ্গে যোগ হয়েছে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট প্রযুক্তির সুযোগে পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে, সম্প্রসারণে এই প্রর্নোগ্রাফি বিস্তার নারীর ওপর যৌন সহিংসতা এবং নানা রকম পুরুষতান্ত্রিক বিকারগ্রস্ততা বাড়িয়ে চলেছে অপরিসীম মাত্রায়। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এবং তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো (ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, ইউটিউব ইত্যাদি) নারী নির্যাতনের বিচিত্র কায়দাকানুন তুলে দিয়েছে বিকারগ্রস্ত কোটি কোটি তরুণ-যুবক এমনকি বয়স্ক পুরুষের হাতে।

এটা স্বীকার করতেই হবে, তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত পুরুষসহ সমগ্র পুরুষ সমাজের ২০ শতাংশ মানুষও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রকৃত সক্রিয় ভূমিকা পালনে আগ্রহী নন। তাদের ভিতরে সৎ-বুদ্ধি বিবেচনা কাজই করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের অন্য সব সহযোগী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় সঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংখ্যার হিসাবে এই ভুক্তভোগী নারী প্রায় ৮৪ কোটি। একই পরিসংখ্যানের চিত্র-গত ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ নারী তাদের সঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছেন। এই প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে-সহিংসতা অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই মেয়েদের জীবনে কালোছায়া বিস্তার করে নারীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরীর মধ্যে ১৬ শতাংশই তাদের ২০তম জন্মদিনের আগে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। তার মানে-প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ কিশোরীর জীবনের প্রারম্ভেই তাদের নিরাপত্তা ও বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। গবেষণা রিপোর্টের তথ্য-বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ নারী ও কিশোরী প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ নিজ পরিবারের বাইরের লোকের দ্বারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে।
২০২৪ সালে পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ জরিপে বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত বছরের চেয়ে চলতি বছরে পারিবারিক সহিংসতা অনেকটাই বেড়েছে। যদিও অনেক সহিংস ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মিডিয়া রিপোর্টারের কারও কারও ব্যর্থতা ও মতলববাজির কারণে। আসক-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়কালে ৭৬টি অতিরিক্ত পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। গত বছর মোট নথিভুক্ত সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪২৭টি, চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। এর মধ্যে স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৫৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে পৌঁছেছে। একইভাবে স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে হত্যার সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে-২৮ থেকে ৫৭। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে নারীর আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে ১৪৪-এ পৌঁছেছে। যা সহিংসতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং ভুক্তভোগীর অসহায়ত্বকে তুলে ধরে। বিশ্বজুড়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে চলমান ১৬ দিনের ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকায় ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত সংলাপ অনুষ্ঠানে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম তাঁর মূল প্রবন্ধে জানান, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত নারী মৃত্যুর (সহিংসতার কারণে) ঘটনা ৫০৩টি, শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা ৯০৫টি; বাংলাদেশে ৭৮ শতাংশ নারী ডিজিটাল সহিংসতার শিকার, বিশেষভাবে ‘ফেসবুক’-এ।
ওই সংলাপ অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নারীরা এখন কোথাও আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক নিরাপত্তা অনুভব করছেন না। পরিবারের ভিতরও অনেক সময় তারা মনে করেন, কথা বলে লাভ নেই। এই হতাশা ও নীরবতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। একই অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা শারমিন সারওয়ার মুরশিদ বলেন, ‘নারীরা মূলধারার রাজনীতিতেই সমানভাবে কাজ করতে পারে, এটা স্বীকার করার মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি। নির্বাচনের আগে জানতে হবে নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও সমতা বিষয়ে তাদের অবস্থান কী। কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া বড় কোনো রূপান্তর সম্ভব নয়। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা ঘটলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম; কিন্তু দেখতে পেলাম মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়। এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক তৃণমূলে বিস্তৃত। এদের সঙ্গে সমন্বয় করলে সহায়তা আরও দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব।’
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, আইন বাস্তবায়নের (নারী নির্যাতন প্রতিরোধে) দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন-পুলিশ, আইন ও বিচার বিভাগ) পারিবারিক সহিংসতাকে একটি ‘তুচ্ছ সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনা করে; তাদের মধ্যে এমন মনোভাব প্রবল-এর সমাধানে বিচার বিভাগ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সময় ব্যয় করার চেয়ে পারিবারিকভাবে সমাধান করা উচিত। এই প্রাতিষ্ঠানিক ‘ব্যাকল্যাশ’ আইন প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া তাতে বিলম্বিত হয়।
সামগ্রিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সব পুলিশি ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ প্রভৃতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা জরুরি। আর শিক্ষালয়কেন্দ্রিক প্রতিরোধ উদ্যোগ সুফল এনে দিতে পারে।
লেখক : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাবেক জিএস