মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া, সহানুভূতি ও সহযোগিতার ধর্ম ইসলাম। আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। অসহায়, দরিদ্র এবং পরস্পরকে সাহায্য করা বিশেষ একটি ইবাদত। কোরআন ও সুন্নায় এই দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। দরিদ্র, এতিম, অসহায়, নিঃস্ব-এই শ্রেণির মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা শুধু বড় একটি ইবাদতই নয়; বরং এটি সমাজ ব্যবস্থার একটি ভিত্তি। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য দৃঢ় করার সহয়ক।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাাদের সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতদের জন্য নির্ধারিত অধিকার।’ (সুরা আয-যারিয়াত-১৯) আল্লাহতায়ালা বলেন ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ দান করে তাদের দানের দৃষ্টান্ত সেই শস্যবীজের মতো যা একটি শিষ থেকে সাতটি শিষ জন্মায়, আর প্রতিটি শিষে থাকে এক শ দানা, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন।’ (সুরা আল-বাকারা : ২৬১)। একজন মুমিন দরিদ্রকে যতটুকু দান করেন, আল্লাহ তা বহু গুণ বৃদ্ধি করে দেন। এতে দানের বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে বারাকাহ, বৃদ্ধি এবং রিজিকে প্রশস্ততা দেওয়া প্রমাণ হয়।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে ধর্মকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? সে ওই ব্যক্তি, যে এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে আহার করাতে উৎসাহ দেয় না।’ (সুরা আল-মাউন : ১-৩)
এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, দরিদ্রকে সাহায্য না করা শুধু পাপ কর্মই নয়; বরং এটি ইমানের ঘাটতির পরিচয় বহন করে। ইঙ্গিত করে পরকালে কঠিন শাস্তির প্রতি। রসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে দরিদ্রদের সহযোগিতার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দয়ালু ব্যক্তিদের প্রতি রহমান দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর লোকদের প্রতি দয়া কর। আকাশের অধিবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন’ (তিরমিজি)।
এই হাদিস স্পষ্ট জানাচ্ছে, যারা অসহায়দের প্রতি আন্তরিকভাবে সহানুভূতি দেখায়, আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার বিনিময় দেবেন। তিনি শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা (সুরা সাবা- ৩৯)। দানের বিনিময় অফুরন্ত, অসীম। দানের মাধ্যমে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন, বিপদ দূর করেন, রিজিকের দরজা খুলে দেন। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করার ফলে সম্পদ কখনো কমে না’ (মুসলিম)।
দান করার ফলে দৃশ্যত সম্পদ কমলেও বাস্তবে আল্লাহ তার সম্পদে বরকত প্রসারিত করে দেন।
রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ তিনি, যিনি মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী’ (মু’জাম আল-আওসাত)। এই হাদিসের মর্মানুসারে ভালো মানুষ সে-ই যার আচার-আচরণ, কথাবার্তা, জ্ঞান-বুদ্ধি, সময়, শ্রম এবং সম্পদ ও সামর্থ্য মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়। সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রবর্তন এবং আদর্শভাবে দেশকে বিনির্মাণের জন্য পারস্পরিক কল্যাণে নিবেদিত হওয়া, সাহায্য করা, কষ্ট লাঘব করা ইসলামের সত্যিকার মানবিক শিক্ষা। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণ করা, মানুষের প্রতি উপকার করা, মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলামে এই উপকারিতা সর্বোত্তম মানবিক আদর্শ হিসেবে গৃহীত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার দানের ছায়াতলে থাকবে’ (ইবনে হিব্বান)। ইসলামে দান ও সহযোগিতা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং এটি সমাজের ভারসাম্য রক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম। ধনী-গরিব বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসলাম জাকাত, সদকা, ফিতরা, ফিদইয়া, দান ও ওয়াকফের মতো বিধান দিয়েছে। এর মাধ্যমে ধনীরা সমাজের প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা নাও, তা তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে’ (সুরা আত-তাওবা: ১০৩)। এই আয়াতের আলোকে প্রমাণ হয়, দরিদ্রকে দান করা দাতার আত্মাকে পবিত্র করে, হৃদয়কে নরম করে এবং লোভলালসা দূর করে। ইসলাম দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে ইমানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দান, সেবা, সহযোগিতা, সহানুভূতি-এসব কাজ কেবল মানবতা নয়; আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিশ্চিত পথ। কোরআন ও হাদিসে দানের বিনিময়ে জান্নাত, ক্ষমা, রিজিক বৃদ্ধি, দয়া ও কিয়ামতের দিনে ছায়া পাওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অতএব প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আশপাশের অসহায়, গরিব ও বঞ্চিত মানুষের সহায়তা করা। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ হবে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক। বর্তমানে সারা দেশে শীত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় শীতবস্ত্র বিতরণ মানবিক সেবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শীতের তীব্রতায় অসহায় মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে। তাদের পাশে দাঁড়ানো সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিতেই অপরিহার্য।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা