আজ মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা। শুরুতেই এ নিয়ে বিপত্তি দেখা দিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি বা থাকতে না পারাকে কেন্দ্র করে যে ক্ষতের জন্ম হয়েছিল তা মহিরুহে পরিণত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। জনতার এই বিজয়কে ভারতীয়করণের কারসাজি দেখে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির প্রধান কমরেড সিরাজ সিকদার বলেছিলেন, পূর্ব বাংলা ভারতের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। সে কথা আজ হয়তো বড় নয়। বড় হচ্ছে, আমরা একটি স্বাধীন পতাকা পেয়েছি। বিশ্ব দরবারে আমাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় অর্জিত হয়েছে। আর সেই যুদ্ধের শেষ দিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা সম্পাদিত হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানে মধ্যে। কথাটা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কারণ ভারতের সে সময়কার অনেক দৈনিক যেমন-আনন্দবাজার, যুগান্তর এই মহান দিবসটিকে দেখতে চেয়েছে তাদের চোখে। আনন্দবাজার লিখেছিল, ‘পাকিস্তান নত’। আরও এরকম অনেক কথা আছে। সব সত্ত্বেও এটাই সত্য যে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম আমাদের জাতীয় চেতনার কারণে। আমাদের স্বাধীনতা মূলত ছিল এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা। হাজার হাজার বছর ধরে যে স্বাধীনতার বপিত বীজ আমাদের অন্তরে মহিরুহে পরিণত হয়েছিল তার বিস্ফোরণের তারিখ ছিল ২৬ মার্চ। ৭ মার্চের ভাষণ আর মেজর জিয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ভোটের মর্যাদা রক্ষার সূত্র ধরে অর্থাৎ গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। সত্তরের নির্বাচনের বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা থেকেই শুরু। আজকের প্রেক্ষাপটে বিজয় দিবস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সে প্রসঙ্গই সর্বাগ্রে প্রণিধানযোগ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না এখন গণতন্ত্র সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। অথচ এ গণতন্ত্র রক্ষার জন্যই আমরা অস্ত্র ধরেছিলাম। ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর সেই কাক্সিক্ষত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই সন্ত্রাসীর গুলিতে গুরুতর আক্রান্ত হন জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদি। এই আক্রমণকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এই হামলা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র। এটি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ওপর সুপরিকল্পিত আঘাত।
একটি ফুলকে বাঁচাব বলে আমরা যুদ্ধ করি। মুক্তিযুদ্ধের একটি মৌলিক গান। তখনকার মতো এখনো অপেল মাহমুদের কণ্ঠের এই গান ধ্বনিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই ফুলটি যদি গণতন্ত্র হয় তাহলে নির্বাচন সেখানে একটি বড় বিষয়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন কমিশন অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। তারিখ ঘোষণা করলেও সংশ্লিষ্টদের ভাষায় নির্বাচন এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি, জামায়াতও খুব স্পষ্ট নয়। কেন নয়। সে আলোচনায় অনেক কথা রয়েছে। তার সবটা আলোচনার জায়গা এটি নয়। যেটুক বলা যায় তা হলো, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনায় সরকারের যে সক্ষমতার বিষয় রয়েছে তা নিয়েই মূলত কথা। অনেকেই বলছেন, সে কারণে তো আর নির্বাচন আটকে থাকতে পারে না। এ কথা যেমনি সঠিক তেমনি এ কথাও সংগত যে প্রত্যাশিত নির্বাচন না হলে বা হতে না পারলে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদিও এ ভাবনা নির্বাচন কমিশন ও প্রধান উপদেষ্টার নেই, সে কথা বলা যাবে না। কারণ একটি গ্রহণযাগ্য নির্বাচন হলে তার সুনাম যেমন সরকারের, তেমনি এর অন্যথা হলে তার নেতিবাচক প্রভাবও সরকারের ওপর বর্তাবে। এমন এক সময়ে বাংলাদেশে নির্বাচন ঘোষিত হলো যখন গণতন্ত্রের সম্রাজ্ঞী জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তাঁর অবস্থাও জটিল। যিনি ৫৫ বছরের বাংলাদেশে ৩৪ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করেছেন এ দেশের মানুষের অধিকার, মানবাধিকার রক্ষার লড়াই করতে। আজ যখন দেশে ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে নির্বাচনের আয়োজন চলছে তখন তিনি রয়েছেন হাসপাতালের বেডে। গত সাড়ে পনেরো বছর তাঁর ওপর যে নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন হয়েছে, একজন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসাবঞ্চিত করে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছে যে স্বৈরাচার, সে আজ নেই তবে তার নির্যাতনের চিহ্ন বহন করছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর কষ্টবেদনার সঙ্গে মিলে আছে গোটা জাতি। তিনি যে গোটা জাতির অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন তার স্বাক্ষরও তিনি রেখেছেন। আজ তিনি অসুস্থ কার্যত তাঁর অসুস্থতার মধ্য দিয়েই দেশের গণতন্ত্রের অসুস্থতার প্রমাণ মেলে। সে কারণেও এবারের বিজয় দিবসের আনন্দ অনেকখানি মøান। চারদিকে একটা শঙ্কা ছড়িয়ে আছে, না জানি কী হয়। শঙ্কার নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনেও রয়েছে। বিএনপি তো বটেই যারা বিএনপির বাইরে রয়েছে তারাও। সে আশঙ্কায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে হাদি প্রসঙ্গ। বেগম জিয়া আমাদের সমাজের এমন যে জাতীয় অভিভাবকের আসনে রয়েছেন যাঁর শূন্যতা ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে দলমতনির্বিশেষে সবাই পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন। আসলে এই দোয়া শুধু তাঁর জন্য নয়, গোটা জাতির মঙ্গল কামনায়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষার এক সুভাসিত ফুলের নাম বেগম জিয়া। যিনি কখনো আপস করেননি। ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চাননি। এবারের বিজয় দিবসের আনন্দে তিনি শরিক থাকবেন সে প্রত্যাশা সবার। এবারের বিজয় দিবসে আমরা যেসব বিষয়কে বিবেচনায় দেখছি তার মধ্যে রয়েছে-১. দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে গণ আন্দোলনে, ২. প্রত্যাশার নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে, ৩. সবচেয়ে গুরুতর লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন গণতন্ত্রের কথা বললেও তাদের ভাষা ও আচরণে তার যথাযথ বহিঃপ্রকাশ নেই। বিশ্লেষকরা যেসব বিপত্তি দেখছেন তার মধ্যে রাজনৈতিক অনৈক্য একটি বড় বিষয়। ক্ষমতায় কে বা কারা যাবেন তার সঙ্গে আর কী কী উপাদান যুক্ত হবে বা হতে পারে সেসব আলোচনার পাশাপাশি উত্তাপ-উত্তেজনার উদ্বেগ সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। মাত্র সেদিনও গণভোট, নির্বাচন, জুলাই ঘোষণা সেসব নিয়ে পাল্টাপাল্টি নানা কথা শোনা গিয়েছিল। সেসব এখন স্তিমিত কিনা বলা যায় না, তবে ইসলামি শাসন বনাম গণতান্ত্রিক শাসনের একটা বাহাস বহাল রয়েছে। এটা ঠিক কোন পর্যায়ে তা বিশ্লেষণ করা কঠিন। কারণ ভোট হচ্ছে পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। ভোটের আগে নির্বাচনি ম্যানিফেস্টো থাকে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ভোট প্রার্থীকে নিয়ে নয়, যত কথাই হোক শেষমেশ ভোটের একটা জোয়ার ওঠে। আর সেই জোয়ারে ভেসে ওঠে। সত্যি বলতে কী, এখনো দেশে নির্বাচনি জ্বর জোয়ার ওঠেনি। এ না ওঠার পেছনের মূল কারণ কী সেটি ভাববার রয়েছে। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সে ভাবনা আরও জরুরি। মেলার আনন্দ হচ্ছে সেই শিশুটির হাসি যে কিনা হাতে ঝুনঝুনি নিয়ে বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে যায়। সেটাই সার্থকতা। গণতন্ত্রের সফলতা হচ্ছে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা। ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করা। সোজা ভাষায় নির্বাচন পরিচালনাকারীদের যোগ্যতা-দক্ষতা। অন্যভাবে বললে নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কাজটি অত্যন্ত দুরূহ। শুনতে যা-ই লাগুক, এ ব্যাপারটি এখন পর্যন্ত নির্বিবাদে কেউ করতে পেরেছে তার যথেষ্ট প্রমাণ নেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচন নিয়েই কথা উঠেছে।
কথা এই কারণে যে বর্তমান সরকারের মেয়াদ কত দিনের? যদি ধরে নিই, একটি নির্বাচন সুসম্পন্ন হলে ক্ষমতা হস্তান্তর করা পর্যন্ত মেয়াদ যা সংগত বিবেচনায় বলা যায় তাহলে অন্য একটি প্রসঙ্গ ভিড় করে। গণ অভ্যুত্থানে গঠিত সরকারের হাতে জনগণের দেওয়া বিপুল ক্ষমতা রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে যদি নির্বাচন হয়ে যায় তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখই হবে সরকারের শেষ সময়। সেটি বিবেচনায় হয়তো আগামী দুই মাস সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এদিকে সরকারে থাকা ছাত্র উপদেষ্টাদের নজিরবিহীন পদত্যাগ করার ফলে গণ অভ্যুত্থানে সম্পর্কিত থাকা শক্তির সঙ্গে সরকারের কার্যত ফারাক তৈরি হলো। নির্বাচন পরিচালনাকারী শক্তির মধ্যে গণ অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট শক্তির কোনো সমন্বয় রয়েছে কি না, সেটি সরকার বলতে পারবে। তবে বিষয়টি জরুরি। কথায় বলে ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগডাশে। এবারের আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা জড়িত-যুক্ত তাঁরা ইতোমধ্যে ছিটকে পড়েছেন, গুলিতে আহত হলেন। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। আন্দোলনে নিহতদের নিয়ে করা অনেক মামলা তথ্যপ্রমাণের অভাবে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে উপজাতিদের উৎপাদিত ফসলের ওপর খাজনা প্রবর্তনে একটি নির্দিষ্ট একক খাজনা হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল। কৃষক দেখছে পরিমাপ করি কখনো সে সংখ্যা অতিক্রম করছে না। ক্ষোভে সে বলছে বাবু তুই বলিস না যে আমি ধান চাষই করিনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কেউ যেন না বলে বসে কোনো বিপ্লবই হয়নি। অনেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে গন্ডগোল বলে থাকে। সরকার তার এ মেয়াদে এসে এখনো সরকার উৎখাত মামলার তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত। এ নিয়ে ধরপাকড়ের নানা কথা চলছে। কিন্তু কেন? কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। যে গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই আমাদের বিজয় দিবসের মূল সুর তাঁর বাস্তবায়নে যদি কাক্সিক্ষত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে সেটাই হবে এবারের বিজয় দিবসের সার্থকতা। এই বিজয় অর্জনে যাঁরা শাহাদাত বরণ করেছেন তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক