বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতার পরিচয় দেন বাংলাদেশ ও ভারতের দুইজন মেজর। এর একজন মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের (পরে লে. কর্নেল)। অন্যজন ভারতের গোর্খা রেজিমেন্টের মেজর কারদোজা। তাঁরা দুইজনই পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার কৃতিত্বের অধিকারী। যুদ্ধে মেজর আবু তাহের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে একটি পা হারান। মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান অসীম সাহসে। পরে সহযোদ্ধারা তাঁকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধবিজয়ের পর মেজর আবু তাহের লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি পান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কুমিল্লা সেনানিবাসের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। দৈহিকভাবে পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও তাহের নিজেকে কখনো পঙ্গু ভাবতেন না। কেউ তাঁকে দয়া দেখানোর চেষ্টা করলে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন। সোজাসাপ্টা বলতেন, পঙ্গু তাকেই বলে যিনি মানসিকভাবে পঙ্গু। একটা পা না থাকার অর্থ পঙ্গু হওয়া নয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গোর্খা রেজিমেন্ট অসামান্য বীরত্বের পরিচয় দেয়। গোর্খাদের পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী জাতি হিসেবে ভাবা হয়। গোর্খা যোদ্ধাদের সম্পর্কে বলা হয়, তারা সামনে এগোতে জানে। পিছু হটতে নয়। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর গোর্খা যোদ্ধারা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সাক্ষাৎ আতঙ্ক। বিবিসির একটি ভুল সংবাদ পাকিস্তানিদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। বলা যায়, সে ভুল সংবাদ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও অবদান রাখে। মেজর (অব.) কার্দোজো ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে গোর্খা রাইফেলস ব্যাটালিয়নের মেজর। সিলেটে পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান আটগ্রাম দখলের দায়িত্বে ছিল ওই ব্যাটালিয়ন।
ভারতের গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী সাড়ে সাত শ সৈন্যের ওই ব্যাটালিয়নে আর্টিলারির অভাব ছিল। এ প্রতিকূলতার পরও পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে তারা। পাকিস্তানের ৩ জন ব্রিগেডিয়ার, ১ জন কর্নেল, ১০৭ জন অফিসার, ২০৯ জন জেসিও, ৭ হাজার সৈন্যসহ তাদের সেনাবাহিনীর দুটি ব্রিগেড কার্দোজোর ব্যাটালিয়নের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।
২০১৬ সালে ভারতের এক বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) কার্দোজো বলেছিলেন, তিনি বিবিসিকে শ্রদ্ধা জানাতে চান। কারণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারাই ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম। একটা খবর প্রকাশের সময় তারা ভুল করে। তারা বলে, সিলেটে গোর্খাদের একটি ‘ব্রিগেড’ নামানো হয়েছে। খবরটি আমরা শুনি, পাকিস্তানিরাও শোনে। এ সময় আমরা ভান করি নিজেদের ভাবি আমরা আসলে ব্যাটালিয়ন না, ব্রিগেডই। যুদ্ধে তাদের বাহিনী সফল হয়। ওই সফলতাই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের কোণঠাসা করে ফেলে। শেষ পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
মেজর কার্দোজো উল্লেখ করেন, তাঁর ব্যাটালিয়ন ভেবেছিল আটগ্রামে একটিমাত্র পাকিস্তানি ব্রিগেড হয়েছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের পর তাঁরা দেখতে পান, পাকিস্তানিরা একটি ব্রিগেডের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সৈন্য ও গোলাবারুদ নিয়ে নিয়ে সেখানে যুদ্ধ করছিল।
মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা পালনকারী মেজর কার্দোজো যুদ্ধের সময় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে একটি পা হারান। ক্ষতবিক্ষত পা-টি তিনি নিজেই কেটে বাদ দেন। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় বাহিনীর প্রথম প্রতিবন্ধী অফিসার হিসেবে মেজর কার্দোজো দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন একটি পদাতিক ব্রিগেডের নেতৃত্বে।
আত্মসমর্পণ করতে চাননি জেনারেল নিয়াজি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর কোনো যুদ্ধে এত বেশি সৈন্য প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। আত্মসমর্পণের আগে নিয়াজির পরিচয় ছিল একজন দক্ষ সেনানায়ক হিসেবে। সাহসী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। এ দুই কারণে জেনারেল নিয়াজিকে বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। তিনি যে কোনো মূল্যে তাঁর ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আস্থা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি জেনারেল নিয়াজির। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের বলির পাঁঠা বানানো হয় এই জেনারেলকে।
জেনারেল নিয়াজি জীবন থাকা পর্যন্ত যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অস্ত্রশস্ত্রেরও অভাব ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর সহযোগী জেনারেলদের ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের ভরাডুবি ডেকে আনে।
একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর গণহত্যা, জ্বালাওপোড়াও, ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালিরা। গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। যারা পাকিস্তানিদের কোণঠাসা করতেও সক্ষম হয়। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ৯ মাস দূরের কথা, দুই-চার বছরের মধ্যে বিজয় অর্জিত হবে, এমনটি ভাবেননি মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের হিসাবেও তড়িঘড়ি জয়ের কোনো আশা ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মাও সে তুংয়ের চীনও ছিল বিশ্বের সবচেয়ে নিন্দিত সাম্রাজ্যবাদী দেশটির পাশে। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল দুই শক্তিশালী মিত্রের সমর্থনে ভারতের সঙ্গে যে কোনো যুদ্ধে তারা অপরাজেয় হয়ে উঠবে। আমেরিকা না হোক, চীনকে পাকিস্তানের পক্ষে নামানো গেলে, মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ভারতকেও উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে। পাকিস্তানি সেনাপতিশাসকরা কল্পবিলাসী ধারণা মাথায় রেখে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতে বিমান হামলা চালান। ভারত যেহেতু যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল, সেহেতু সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আঘাতও শুরু করে তারা। পাকিস্তানে একের পর এক হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তছনছ করে ফেলা হয়। মূল ভূখণ্ডে পাকিস্তানিদের অবস্থা দাঁড়ায় ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।’ বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানি বাহিনীর হালহকিকত নিয়ে ভাবার সময়ও তাদের ছিল না।
১৯৭১ সালের নভেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার বদলে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পরেও পাকিস্তানি বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা ছিল। বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান খানের প্রতারণার শিকার হন তিনি। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর গুল হাসান খান উদ্ভট তথ্য দিয়ে জানান, উত্তর দিক থেকে হলুদ (চীন) এবং দক্ষিণ দিক থেকে সাদা (আমেরিকা) আসছে। নিয়াজি তাঁকে বলেন, দয়া করে অসত্য কথা বলবেন না। কারও কোনো সাহায্যের দরকার নেই। গুল হাসানকে পরামর্শ দেন পারলে পশ্চিমে ভারতকে ঠেকান। সেটাই বেশি জরুরি।
১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের মাতাল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বুঝে ফেলেন তাঁদের পরাজয় নিশ্চিত। অন্য জেনারেলদের ধারণাও ছিল তাই। তাঁরা চাচ্ছিলেন নিয়াজি যাতে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হবে। তাদের পক্ষ থেকে নিয়াজিকে এ ব্যাপারে আভাস দেওয়া হয়। ওই দিন নিয়াজি সাফ সাফ জানিয়ে দেন তাঁর লাশের ওপর দিয়ে ট্যাংক যাবে। তিনি চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানান প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধানকে।
এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে নিয়াজির বদলে জেনারেল ফরমান আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে। ১৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালিক ও তাঁর মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। বেকায়দায় পড়েন নিয়াজি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল রহিম নিয়াজিকে বার্তা পাঠান পশ্চিম পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন। এ অবস্থায় জেনারেল রাও ফরমান আলীর চাপে জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল মানিক শর প্রস্তাব অনুযায়ী আত্মসমর্পণে রাজি হন।
একজন বাংলাদেশপ্রেমী পাঞ্জাবি বিচারপতির কথা : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের অনেকেই বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এজন্য অনেকে ত্যাগও স্বীকার করেছেন। যাঁদের একজন সৈয়দ আসিফ শাহকার। যাঁর জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের হরপ্পায়। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স যখন ২২ বছর, তখন তিনি পাঞ্জাব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
জনপ্রিয় ছাত্রনেতাও ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চের কালরাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এর প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের একটি অংশ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তাঁদেরই একজন সৈয়দ আসিফ। বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁকে দেশদ্রোহী অভিহিত করা হতো। এমনকি এ অভিযোগে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন। সে সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁর বাবা তাঁকে কারাগারে দেখতে আসতেন। এবং বাঙালিদের প্রতি দরদের জন্য কটু কথা বলতেন। তবু বাংলাদেশের বিপক্ষে যাননি সৈয়দ আসিফ শাহকার। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। তারপর কিছুদিন লাহোরে পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন। চারদিকের নিন্দাবাদে নিজ দেশে বেশি দিন থাকতে পারেননি সৈয়দ আসিফ। ১৯৭৭ সালে তিনি সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় চান। পাকিস্তানে যেহেতু তিনি বিপন্ন সেহেতু রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যান। পরে সুইডেনের হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগও পান। পাকিস্তান ছাড়ার পর সৈয়দ আসিফ শাহকার মাত্র দুবার তাঁর দেশে যান। বাংলাদেশের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবের প্রতি ছিল তাঁর অসীম শ্রদ্ধা। শেখ সাহেব একাত্তরে পাকিস্তানের শাহিওয়াল জেলে বন্দি ছিলেন। সেই জেলখানায় দেখতে যান সৈয়দ আসিফ।
২০১২ সালে সৈয়দ আসিফ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা গ্রহণের জন্য ঢাকায় আসেন। ৭৩ বছর বয়সি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ এই বিচারপতি মৃত্যুর পর বাংলাদেশে সমাধিস্থ হতে চেয়েছেন। ইচ্ছা তাঁর কবর যেন হয় বাংলাদেশে। আসিফ শাহকার বাংলাদেশে এসেছিলেন একবার। এ দেশে তাঁর কোনো আত্মীয় নেই-বাংলাও বলতে পারেন না। তারপরও পদ্মা মেঘনা যমুনাপারের দেশটাই যেন তাঁর স্বজন। এই বাংলাদেশের জন্য তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল তাঁর মাতৃভূমি, স্বজন, আত্মীয়, বন্ধু। প্রাণও হারাতে বসেছিলেন। ছাড়তে হয়েছিল তাঁর পরিচয়ও।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]