মালয়েশিয়ার অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে নারীরা ভূমিকা রাখছেন। নারী একাধারে সংসার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, উদ্যোক্তা খাত এবং শিক্ষাঙ্গনে সক্রিয় ও প্রত্যয়দীপ্ত। তাঁরা আত্মপ্রত্যয়ী। তবে উন্নতির পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। মালয়েশিয়া বহু জাতিগোষ্ঠী-সংবলিত একটি দেশ। মালয়, চীনা, ভারতীয় ও বহু আদিবাসী রয়েছে এই দেশে। তাই এ দেশের সমাজও বহুজাতিক। প্রত্যেকের রয়েছে ভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও পরিবারকাঠামো। তবে সমাজকাঠামোয় বেশ কিছু মিল রয়েছে। আছে কমন বৈশিষ্ট্য। তারা নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, মাতৃত্বকে মূল্য দেয়। নারী পারিবারিক নেতা হলে তাঁকে মেনে নেয়। নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে উৎসাহ দেয়। তবে অনেক ব্যতিক্রমও আছে।
মালয় সমাজে ইসলামি আইন প্রচলিত। এই আইনে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও পারিবারিক মর্যাদার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনা ও ভারতীয় সমাজও নারীর স্বাধীনতা, উচ্চশিক্ষা ও নারীর ব্যবসা করাকে সমর্থন করে। ফলে এ দেশের নারীরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ জীবনযাপন করেন। তাঁরা অনেকেই শিক্ষিত। কাজে সক্রিয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক নারী। নারীরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়ে। অনেক নারী বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তাঁরা দেশে ফিরে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। অনেকে বিদেশে কাজ করছেন। শিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। মালয়েশিয়ায় নারী শ্রমশক্তি দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইটি, হসপিটালিটি, সরকারি প্রশাসনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী কাজ করছেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গ্লোবাল কোম্পানিগুলোর উচ্চপদে নারীরা আছেন, বিশেষ করে হিসাববিদ্যা, আইন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়। মালয়েশীয় সশস্ত্র বাহিনী আশির দশক থেকে নারীদের পূর্ণ উদ্যোগে নেওয়া শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মোহাম্মদ এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। মাহাথির মার্কিন সামরিক বাহিনীর আদলে তাঁর নিজের দেশের সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই সামরিক বাহিনীর তিন শাখাতেই নারীদের একেবারে নিম্ন থেকে কর্মকর্তা পদ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তিনি তিন বাহিনী প্রধানদের নির্দেশও দেন। তখন থেকে মালয়েশীয় নারীরা সামরিক বাহিনীতে নাবিক, বিমানসেনা এবং সৈনিক হতে পারছেন। তবে সামরিক উর্দিতে নারীদের মাথায় হিজাব পরা বাধ্যতামূলক।
সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ, প্রশিক্ষণ, অনলাইন বাজার সম্প্রসারণসহ নানা সুবিধা দিয়ে থাকে। যা তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করেছে।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি সুস্পষ্ট। সংসদ, সিটি কাউন্সিল, মন্ত্রিসভা সবখানেই নারীরা প্রতিনিধিত্ব করছেন। মন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও প্রশাসনিক প্রধান পদে নারী রয়েছেন। ফ্যাশন, মিডিয়া, চলচ্চিত্র, সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নারীর প্রভাব ব্যাপক। হিজাবপরিহিত আধুনিক নারী যেমন এ দেশে দেখা যায়, তেমনই স্টাইলিশ, পাশ্চাত্যধর্মী পোশাকেও স্বাচ্ছন্দ্য নারী। সামাজিক মাধ্যমে নারীরা সক্রিয়। বিপুলসংখ্যক ইনফ্লুয়েন্সার, লেখক, ব্লগার, শিল্পী, ডিজাইনার রয়েছেন। টিভি ও ফিল্মে নারীরা এগিয়ে চলেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। ফলে সমাজে নারীর ইমেজ শক্তিশালী হয়েছে। এখন আর তাঁরা ‘রাঁধো বাড়ো খাও খাওয়াও’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
নারীনেত্রীরা সামাজিক কাজে যেমন এগিয়ে, একইভাবে জাতীয় নীতি প্রণয়নেও। তবে এখনো সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৫০ ভাগ হয়নি। প্রবৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক।
মালয়েশিয়া নারীর অধিকারের বিষয়ে সচেতন ও অগ্রগামী। পারিবারিক আইন, কর্মস্থলের নিরাপত্তা আইন, মাতৃত্বকালীন ছুটি আইন নারীর সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে গঠিত। গার্হস্থ্য সহিংসতা, যৌন হয়রানি, মানব পাচারবিরোধী আইনও রয়েছে। নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা রয়েছে।
এতক্ষণ যা লিখলাম তা পড়ে মনে হতে পারে মালয়েশিয়ার নারী বুঝি স্বর্গে রয়েছেন। তাঁদের কোনো অতৃপ্তি, বঞ্চনা নেই, নেই বৈষম্য। ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়।
উন্নতির পাশাপাশি কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে মালয়েশিয়ান নারীর জীবনে। মালয়েশিয়ার রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। আবার সেই মালয়েশিয়া আধুনিক। এই দুই বিপরীতমুখিতার মধ্যে জীবন কাটাতে হয় মালয়েশিয়ার নারীকে। দুটির মধ্যে রয়েছে প্রবল দ্বন্দ্ব। কোনো কোনো পরিবার প্রচণ্ড রক্ষণশীল। এই রক্ষণশীলতা অতিক্রম করে ভালো কিছু করা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো রীতিমতো কঠিন। যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় তাদের। যুদ্ধ করতে হয় প্রতিনিয়ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনো বেতন বৈষম্য রয়েছে। পুরুষের তুলনায় নারীদের বেতন কম। নির্দিষ্ট কিছু পেশায় তাঁদের অংশগ্রহণও কম। করপোরেট নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা অপর্যাপ্ত। গ্রামীণ ও শহুরে নারীর চিত্র এক নয়। সুযোগসুবিধা প্রাপ্তির মধ্যে আছে ফারাক। কর্মক্ষেত্র, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। মালয়েশিয়ার ৪৭ ভাগ নারী চাকরি ক্ষেত্রে নিয়োজিত। এ দেশের নারী পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে হিমশিম খায়।
নারীর ভরণপোষণের ক্ষমতা থাকলে পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। এই অধিকার তাঁদের শরিয়া দিয়েছে। মালয়েশিয়ার মাত্র চারটি রাজ্যে নারী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করে। কেদাহ রাজ্যে নারীরা কেবল নারী দর্শকের সামনে নাচগান করতে পারেন। মালয়েশিয়ায় যৌন হয়রানি একটি সাধারণ ব্যাপার। এই হয়রানি ঠেকাতে ২০১০ সাল থেকে মালয়েশিয়ার রেলওয়ে গোলাপি কালারের বগি চালু করেছে। যেখানে শুধু মহিলারাই উঠতে পারবেন। এমনকি রাজধানী কুয়ালালামপুরে শুধু মহিলাদের জন্য বাস চালু করা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে চালু করা হয়েছে মহিলা ট্যাক্সি। এই ট্যাক্সি মহিলারাই চালান, ফোনকলের মাধ্যমে এই ট্যাক্সিতে উঠতে হয়। মালয়েশিয়ায় আর একটি ভয়াবহ নিয়ম আছে। এ দেশে নারী খতনা প্রচলিত। মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ পরিবার এই প্রথা মেনে চলে। তাদের ধর্মীয় রীতি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস এটাই যে নারী খতনা বিয়ের আগে অযাচিত যৌন সঙ্গমকে দূর করবে। তবে এই খতনা আফ্রিকার দেশগুলোর মতো ভয়াবহ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয় না। খুব সামান্য অংশই এতে কাটা হয়। ২০০৯ সালে, ফাতওয়া কমিটি মুসলিমদের জন্য নারী খতনা বাধ্যতামূলক করেছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত কাটাকে বাদ দিয়ে।
সরকার নারীকে বিভিন্ন রকম সরকারি সহায়তা দিয়ে থাকে। ন্যাশনাল ইউনিটি এবং সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রণালয় নারীর অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করে। এই মন্ত্রণালয় ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে এটি ‘হাওয়া’ নামে পরিচিত ছিল। ২০০১ সালে এটি উইমেন অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়। মালয়েশিয়ার নারীদের অত্যাচার-নিপীড়ন থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আইন আছে। এটি ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স আইন ১৯৯৪’। এ আইন অনুযায়ী, নারীর ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালালে একজন নারী স্বামী পরিবর্তন করতে পারবেন। বিয়েজনিত ধর্ষণও এই আইনে শাস্তির আওতায় পড়ে। বিয়েজনিত ধর্ষণ বলতে বোঝানো হচ্ছে, যদি কোনো নারীর স্বামী বলপ্রয়োগ করে, তাঁকে অত্যাচার করে, মানসিক চাপ দিয়ে অথবা অন্য কাউকে দিয়ে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ায়। একটি জরিপে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় ১৫ বছরের বেশি, ৩৯ ভাগ নারী বিয়েজনিত ধর্ষণের শিকার হন। উইমেন এইডস সংগঠন এই ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য একটি এসএমএস হেল্পলাইন খুলেছে। মালয়েশিয়ার নারীদের আইন মেনে বিয়ে করতে হয়। ইসলামিক আইনে বলা আছে, একজন নারী তাঁর স্বামীর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবেন। আইন ৫৯(২)-এ বলা আছে, একজন নারী তখনই দোষী সাব্যস্ত হবেন যখন ১. যখন তিনি তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেবেন; ২. যখন স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন; ৩. কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া স্বামীর সঙ্গে কোথাও যেতে, ফিরতে অনিচ্ছাবোধ করবে।
অর্থাৎ এ আইনের পুরোটাই পুরুষের পক্ষে। পারিবারিক সহিংসতা আইন থাকলেও তা সেভাবে কার্যকর না। তাই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি নারীদের মধ্যে বিদ্যমান। নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল পোশাক পরে। তাদের শর্টস বা টপস পরার ইচ্ছা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেটা করতে পারে না। ২০১০ সালের জরিপে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় পুরুষের তুলনায় নারীদের সাক্ষরতার হার কিছুটা কম। নারীর ৯০ দশমিক ৭ ভাগ এবং পুরুষের ৯৫ দশমিক ৪ ভাগ। ২০০৬ সালে, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে মারিনা মাহাথির বলেন, ‘মালয়েশিয়ার নারীদের অবস্থা অনেকটা আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া, বৈষম্যের শিকার নারীদের মতো।’ মেরিনা কথাটি বলেন, পুরুষদের যখনতখন নারীদের তালাক দেওয়া, ইচ্ছামতো বিয়ে করা এবং নারীর অধিকারের ওপর কর্তৃত্ব ফলানো নিয়ে। অবশ্য এই সমালোচনা মালয়েশিয়ার ইসলামিক সংগঠনগুলোর ভালো লাগেনি। তারা জানায়, এটি ইসলামিক শরিয়াকে খর্ব করে।
এ দেশের নারীর অভিবাসী শ্রমিকদের বিয়ে করার প্রবণতা আছে। এই প্রবণতা সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করে। কোনো কোনো পুরুষ বিয়ে করে এখানেই থেকে যায়। নিজ পরিবার ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে আসে। মালয়েশিয়ার অনেক নারী পরিশ্রমী ও সৎ বাংলাদেশি পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করেন। তাঁদের সঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবনযাপন করতে চান।
সরকার নারীশিক্ষার প্রসার ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, বিশেষ করে প্রজননস্বাস্থ্য ও চিকিৎসায়। নারী উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্যই অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ করেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি নারী পড়াশোনা করছেন। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার নারীরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান। পারিবারিক সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক হয়রানি রোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো দরকার। বেতন ও পদোন্নতিতে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধ করতে হবে ভয়াবহ খতনাপ্রথা। সরকার ও নাগরিক সমাজের যৌথ প্রচেষ্টায় এর সমাধান সম্ভব বলে আশা রাখি।
লেখক : কথাশিল্পী, গবেষক