দেশ এক কঠিন অস্থিরতার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন-সম্পদের কোনো নিরাপত্তা নেই। জীবিকার তাগিদে যে মানুষগুলো ঘর থেকে বের হচ্ছে, তারা জানে না দিন শেষে ঘরে ফেরা হবে কি না। যে স্বজনের হাসিমুখ দেখে ঘর থকে বের হয়েছে, ঘরে ফিরে আবার তাদের জীবিত দেখতে পাওয়া যাবে কি না, সে আশঙ্কায় সর্বক্ষণ তটস্থ থাকতে হচ্ছে। এমন কঠিন সময়কে নবীজি (সা.) ফেতনার সময় বলেছেন। এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হে উম্মত! আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাদের ঘরের ফাঁকগুলো দিয়ে বৃষ্টির মতো বিশৃঙ্খলা-রাহাজানি বর্ষিত হচ্ছে (বুখারি)। উম্মতের ওপর যখন ফেতনা ঘোর অন্ধকারের মতো নেমে আসে তখন আরও বেশি আল্লাহর সাহায্য ভিক্ষা ও ইবাদতে ডুবে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নবীজি (সা.)।
আজ যারা দেশের পরিস্থিতি অস্থির করে তুলেছে, তারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ। অর্থের লোভে দিশাহারা। তারা ভাবছে, মানুষ মেরে, জীবন কেড়ে তারা অনেক টাকা কামাবে। দীর্ঘস্থায়ী জীবন লাভ করবে। কিন্তু না। বড়জোর ১০০ বছর বাঁচা সম্ভব হবে। তারপর তো এই দুনিয়া ছাড়তে হবে। রঙিন পোশাক খুলতে হবে। কবর ঘরে থাকতে হবে। কেয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে হাশরের মাঠে দাঁড়াতে হবে। তারা কি ভেবে দেখেছে, সেদিন কোন মুখ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে? সেদিন তো প্রতিটি অপরাধের বিচার হবে। সেদিন কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি, ঘুষ-নজরানা কোনো কিছুই কাজে আসবে না। হে জালেম! তুমি কি জানো সেদিন বিচার প্রক্রিয়া কেমন হবে? হাদিসের পাতা থেকে চলো দেখে নিই ন্যায় ইনসাফের আদালতে কীভাবে আল্লাহ রায় শোনাবেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রসুল (সা.) বলেছেন, হাশরের মাঠে মানুষ সমবেত হবে পোশাকহীন উলঙ্গ ও খালি পায়ে, যেভাবে মায়ের পেট থেকে প্রথম সে দুনিয়ায় এসেছিল। এ কথা শুনে আম্মাজান আয়শা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর নবী! তখন কি নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গেই থাকবে? রসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ! সবাই একসঙ্গেই থাকবে। আম্মাজান বললেন, তাহলে তো খুব লজ্জার কথা হে আল্লাহর নবী। রসুল (সা.) আম্মাজানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, হে আয়শা! সেদিন পরিস্থিতি এত কঠিন হবে যে পাশে কে সেদিকে তাকানোরও সুযোগ হবে না। আজাবের ভয়ে মানুষ চল্লিশ বছর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এই সময় মানুষ কিছু খাবে না, পানও করবে না। ভয়ে কষ্টে মানুষের গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকবে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কারও ঘাম নাক পর্যন্ত উঠে আসবে। কারও ঘাম পেট পর্যন্ত থাকবে। আবার কারও ঘাম পায়ের টাখনু পর্যন্ত থাকবে।
এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বিচারকাজ শুরু হবে। ফেরেশতারা আল্লাহর আরশ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকবেন। ঘোষক ঘোষণা করবেন, ওমুক মায়ের ছেলে ওমুক কোথায়? ঘোষণা শুনে সবার ভিতর অস্থিরতা বেড়ে যাবে। যাকে ডাকা হবে সে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। এবার ঘোষক বলবেন, এই ব্যক্তি কার কার ওপর জুলুম করেছে সবাই এগিয়ে আসো। একে একে জুলুমের শিকার মানুষগুলো এসে দাঁড়াতে থাকবে। সে যে এলাকায় বসবাস করত সেখানের পান দোকানদার, রিকশাঅলা, সিএনজির ড্রাইভার, মার্কেটের ব্যবসায়ী-যাদের থেকে সে চাঁদাবাজি করেছে, তারা এসে বলবে এই লোক দুনিয়ার জীবনে আমাদের কোনো শান্তি দেয়নি। উচ্চমূল্যের বাজারে কয় টাকাই বা উপার্জন করতাম। সংসার চালাতেই কষ্ট হতো কিন্তু এই মাস্তান আমাদের আয়ের একটা অংশ চাঁদা হিসেবে নিয়ে যেত। আমরা তার বিচার চাই। এরপর এলাকার গরিব, এতিম যাদের হক সে মেরে খেয়েছে তারা এসেও বিচার দেবে। কিছু মানুষ তার বিচারের আশায় এসে কাঁদতে থাকবে। এর মধ্যে হয়তো একজন মা থাকবেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার কি বিচার বলো? ওই মা কাঁদতে কাঁদতে বলবেন, আল্লাহ গো! দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে সন্তানকে দুনিয়ার মুখ দেখালাম। রাতের ঘুম হারাম করে দিনের আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করেছি। শরীরের রক্ত পানি করে সন্তানকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করেছি। আমার নাড়িছেঁড়া ধন কলিজার টুকরা সন্তানকে এই বদবখ জালেম গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়ে হত্যা করেছে। আহারে! ৫০০ টাকার লোভে, ১ হাজার টাকার লোভে, একটা এলাকায় চাঁদাবাজি করতে পারবে এ নিশ্চয়তায় কিংবা নেতার মন খুশি করবে এ আশায় আমার সন্তানকে সে হত্যা করেছে। সে কখনো ভাবল না, যে মানুষটাকে আমি হত্যা করেছি তার মা তো বাড়িতে পথ চেয়ে আছে। তার সন্তান তার ফেরার অপেক্ষায়। তার স্ত্রী তার জন্য খাবার গরম করে বসে আছে। ওরে জালেম! একজন মানুষকে হত্যা করার সঙ্গে কত মানুষের স্বপ্ন মরে যায় তুই কি কখনো ভেবে দেখিসনি? এভাবে মা কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর দরবারে তার নালিশ জানাতে থাকবেন। এরপর কোনো বাবা, কোনো বোন, কোনো ভাই, কোনো স্ত্রী, কোনো সন্তান এসে নিজের স্বজন হারানোর বেদনার নালিশ দেবে।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট