বাঙালি ভীরু ও কাপুরুষ জাতি নয়, বারবার সে সত্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সেই দূর অতীতে প্রাক বৈদিক যুগে যাযাবর আর্যদের আগমন ঘটে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে। এ উপমহাদেশে তখনই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা বিশ্ববাসীকে চমকে দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। বৈদিক সাহিত্যে যে সোনার লঙ্কার কথা বলা হয়েছে, তা গড়ে উঠেছিল সে ভূখণ্ডের মানুষদের নেতৃত্বে। কল্পকথার রাক্ষসদের নেতৃত্বে নয়। আর্যরা ছিল গ্রামীণ সভ্যতার মানুষ। নগরসভ্যতাকে তারা ভালো চোখে দেখেনি। প্রতিপক্ষের শক্তিকে পর্যুদস্ত করতে তারা একের পর এক নগর ধ্বংস করেছে পেশিশক্তি বলে। ভারতবর্ষের সিংহভাগ স্থানে তারা তাদের আধিপত্য বিস্তারে পারঙ্গমতা দেখালেও মার খেয়েছে গাঙ্গেয় বদ্বীপ ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের কাছে। পাল রাজাদের পতনের পর থেকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, তিস্তাপারের মানুষ তাদের স্বাধীনতা হারায়। এ দেশে আর্যদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তরবারির জোরে। তারপর একের পর এক ভিনদেশি শাসকদের আগমন ঘটেছে এ দেশে। স্বীকার করতেই হবে, বিদেশি শাসকরা ধন ধান্য পুষ্প ভরা এ দেশকে তাদের স্বদেশ হিসেবে আত্মীকরণ করেছে। তারপর এসেছে সাত সমুদ্দর তেরো নদীপারের ইংরেজরা। অন্য সব বিদেশির চেয়ে তুলনামূলক বিচারে সভ্য হলেও তারা নিজেদের ঔপনিবেশিক প্রভু হিসেবেই দেখতে চেয়েছে। সে সীমা যাতে অতিক্রান্ত না হয়, সে ব্যাপারে তারা ছিল অতিসতর্ক। ভিনদেশি ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনা করে বাঙালিরাই। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দুই দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সৃষ্টি বাঙালিদের হাত দিয়েই। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার কৃতিত্ব গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষের প্রাপ্য হলেও পাকিস্তানের ২৩ বছর ধরে তারা ছিল বঞ্চনার শিকার। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা বাঙালি জাতিকে প্রায় ১৪০০ বছরের পরাধীনতা থেকে মুক্তি দেয়। একইভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ এ ভূখণ্ডের মানুষের সর্বকালের সেরা অর্জন। সে অর্জনকে যারা খাটো করতে চান, তাদের আত্মঘাতী প্রবণতা সম্পর্কে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের কবিতার পঙ্ক্তিই যথেষ্ট-‘সে সবেত কাহার জনম নির্ণয় ন জানি’।