জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর অংশগ্রহণ ক্ষমতায়নের অন্যতম একটি সোপান। বলা হয় নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আর্থসামাজিক পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ। তাঁদের জাতিগত অধিকার আছে। স্বাধীনতা-উত্তর নির্বাচনে সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন পশ্চাদপদ সমাজে নারীদের জন্য লিঙ্গ অধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও সুসংহত করা হয়েছে। অধিকার সুরক্ষা হচ্ছে কোনো রাজনৈতিক পার্থক্য এবং প্রতিবন্ধকতা তুলে দেওয়া। এটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার। জাতিসংঘ সনদে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব করার সহজাত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম সদস্য দেশ। পক্ষান্তরে প্রকৃত অধিকার হচ্ছে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর অংশগ্রহণ অবস্থা ও অবস্থান তথা সংখ্যাগত ও গুণগতমান বজায় রাখা। দেশের জনসংখ্যায় সমতা ও সাম্যতার ভিত্তিতে ৩০০ আসনেই নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার আছে। বাস্তবে রাজনৈতিক দলে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণের অনুপাত নেই, আছে নারীর ক্ষমতায়নের বাঁকে কাঠামোগত বঞ্চনা। ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বিগত নির্বাচনের তুলনায় খুবই হতাশাজনক। বিএনপির ১০ জন, এনসিপির ৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সঙ্গে কয়েকজন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী আছেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রী দলের মনোনায়ন দৌড়ে হোঁচট খেয়েছেন। ইতোমধ্যে একজন নির্ভীক সাহসী নারী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কারণে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। এটি নারীর ক্ষমতায়নের সাংবিধানিক অধিকার হরণ। প্রত্যক্ষভাবে সংগঠিত নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের বিশ্বজনীন অধিকার আছে। তবে আসন্ন নির্বাচনে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন, মৌলিক অধিকার হরণ হয়েছে ফলে তাঁরা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন।
তবে ভোট প্রদানে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে লক্ষণীয় অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। গাঁয়ের মা-বোনরা সামান্য লেখাপড়া জানেন কিন্তু ভোট প্রদানে তাঁদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। এমকি বৃদ্ধ মা ভোট দিতে আসেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে। যুুক্তরাজ্য ও সুইস পার্লামেন্টে বাংলাদেশর নারীরা নির্বাচিত হয়েছেন। জানা যায়, যুক্তরাজ্যের আগামী সংসদ নির্বাচনে লেবার পার্টি থেকে বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত ছয় নারী প্রার্থী হচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ খুবই হতাশাব্যঞ্জক। দেখা যায়, ভোটারের সংখ্যা এবং ভোট প্রদানে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও সংসদ নির্বাচনে তা পুরুষতন্ত্র দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে নারী প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন তথাপিও নারীর ক্ষমতায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তাত্ত্বিক বিশ্লেষকরা বলেন, নারী প্রধানমন্ত্রী হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই তন্ত্র দ¦ারা তাঁরা বেষ্টিত ছিলেন। যদিও তাঁরা নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রশ্নাতীতভাবে কাজ করেছেন। অনেক সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং নারীর সক্ষমতা মানদণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের স্বাক্ষর রেখেছেন। তদুপরি নানান আর্থসামাজিক কারণে সমাজরাষ্ট্রে পুরুষতন্ত্রের প্রভাব কাটানো সম্ভব হয়নি। তাঁরা ক্ষমতায়নের কথা বললেও বাস্তবে পুরুষতন্ত্র তাঁদের ঘিরে রেখেছে। নারীর প্রতি অবহেলা, কটূক্তি, বৈষম্য এবং পশ্চাদপদতা এর প্রমাণ। তবে আশার কথা, পললভূমির এ দেশে নারী নেতৃত্ব জাতি মেনে নিয়েছে এবং তাঁরা বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে সংরক্ষিত আসনে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও প্রত্যক্ষ ভোটে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশে ৬ কোটি নারী ভোটার। গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নারী প্রার্থী নির্বাচনের অধিকার তাদের আছে, সেখানে যদি নারী প্রার্থী না থাকে তাহলে নারী-পুরুষ ভোট দেবে কাকে? বলা যায়, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বন্দি করা হয়েছে। ঐক্য কমিশনসহ সব রাজনৈতিক দল নারীর ক্ষমতায়নে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
২০২৫ সালে জুলাই সংস্কারের একটি পদক্ষেপ ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেখানে নারীর সমতা-সাম্যতার এবং জেন্ডার কোটাসমেত নানা দাবি সরকারদলীয় আকারে প্রকাশিত হয়েছে। জুলাই সনদেও গেজেট আকারে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নারীরা উপেক্ষিত। এজন্য নারীর ক্ষমতায়ন এবং বৈষম্য হ্রাসে ব্যাপক নারী উন্নয়ন কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক দলে কাঠামোগত পরিবর্তন অতিআবশ্যক। নারীর জন্য বিশ্ববিখ্যাত একটি উক্তি যোগ করা যায়, ‘তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত নারী দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’
লেখক : কলামিস্ট