সমগ্র বিশ্বে না হলেও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে মৌলিক চাহিদা হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা -এই পাঁচটি উপাদানকে মজবুতভাবে মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। উন্নত বিশ্বে বিনোদন তথা যৌন অভিলাষ, বিবাহ, প্রমোদ ইত্যাদি আবশ্যকীয় ইস্যুগুলোকে ফান্ডামেন্টাল রাইট হিসেবেও বিবেচিত। পৃথিবীর জন্ম থেকেই অদ্যতক নিরাপত্তার সংকট আছে। তবে এই সংকট তেমন সাংঘাতিক ছিল না। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তার সংকট জটিল রূপ নেওয়ায় শান্তি স্থাপনের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সৈন্যের আবশ্যক হয়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে বিশ্ব শান্তি স্থাপনের নিমিত্তে সৈন্য সরবরাহ করা হয়। এই তো কদিন আগে বাংলাদেশের ছয়জন সৈন্যের কফিন গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতি কেঁদেছিল। জাতিসংঘের এক অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে কিছু সংখ্যক বিশ্ব সুশীল আমাকে বলেছিলেন, আমরা জাতিসংঘকে কোনো সৈন্য দিই না। এটাকে জাতির জন্য সম্মানজনক মনে করি না। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, জাতিসংঘ কর্তৃক সৈন্য নামক লাঠিয়াল বাহিনী যে দেশ থেকে হায়ার করা হয় এর মধ্যেও অন্যায়, অন্যায্যতা আছে।
প্রিয় পাঠক, কথায় বলে আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খোঁজ মানানসই নয়। তাই নিজেদের কথায় আসি। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের বাংলাদেশ- এর জন্ম, পরিচালন, যন্ত্রণা সবকিছুরই মূলে আছে অন্যায্যতা, অন্যায়, ইনসাফহীনতা। বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক চাহিদার পাঁচটির সঙ্গে বিনোদন বিবেচনায় না নিলেও নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক চাহিদা পাঁচটির স্থলে নিরাপত্তাসহ ছয়টিকে আমলে নিয়ে অনুশীলন করলে ৩৬ জুলাই হতো না, পুলিশ দ্বারা মানুষ মরত না, পুলিশকেও মরতে হতো না। এ ক্ষেত্রে আইনি দায়মুক্তির বা ইনডেমনিটি দাবি আসত না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা দেশে ফেরার শঙ্কা করতেন না। শরিফ ওসমান হাদির মতো ব্যক্তিকে আততায়ীর হাতে মরতে হতো না। দেশের মানুষের বুকের রক্ত, চোখের জল ঝরত না। বিচিত্রভাবে দীপু দাস নামক সনাতন ধর্মাবলম্বী এক ব্যক্তিকে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করে আগুনে পোড়ার চিত্রে ভারতবর্ষের ক্ষোভ জমত না।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, সংস্থা জাতিতে যদি ন্যায্যতা থাকে, ইনসাফ কায়েম হয় সেভাবে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হয়, তখনই প্রত্যেকটি মানুষ নিরাপদ বোধ করে। মানুষকে নিরাপদ বোধ করানোর জন্য নিরাপত্তাবলয়ের জন্য বিশাল ব্যয় বহন করতে হতো না। খোলাফায়ে রাশেদাদের যুগে নিরাপত্তা ব্যয় বলে কিছু ছিল না। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিবেচনায় পরিকল্পনা প্রণয়ন হয় না। পরিকল্পনার জন্য বেশির ভাগ প্রয়োগ এবং প্রয়োগযোগ্য ইস্যুকে আমলে নিতে হয়। তাই বলছি চার খলিফার তিন খলিফাই আততায়ীর হাতে আত্মাহুতি দিয়েছেন তা যেমন ঠিক তার থেকে বেশি ঠিক তাঁদের আমলের মানুষ ছিল নিরাপদ, তাঁদের নিরাপত্তা বলয় ছিল ন্যায্যতা এবং ইনসাফ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক শহীদ জিয়াউর রহমান, যাঁর ন্যায্যতার ইস্যু ছিল গণভোটে অধিকাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ ভোট’। তিনি জনগণের কাছে থাকতে চাইতেন, তাইতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সরাসরি মানুষের অবস্থা জানতে চাইতেন, মানুষের কথা শুনতেন। তাঁর সরকারের পরিকল্পনা ১৯ দফা মানুষকে বলতেন। পথে-ঘাটে, স্কুল মাঠে, লোকারণ্যে তাঁকে কেউ হত্যা করে নাই, হত্যা করতে পারে নাই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজধানী নামে খ্যাত চট্টগ্রামের সুরম্য, সুরক্ষিত সার্কিট হাউস, যে জেলা থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন সেখানেই তাঁকে হত্যা করা হলো, তারা কারা। তারা কি সাধারণ জনগণ নাকি সশস্ত্র সুশিক্ষিত সুপ্রশিক্ষিত বাহিনীর সদস্য? তাদের পেছনে কে ছিল? এই প্রশ্নের জবাব প্রশ্নকারীকেও দিতে পারি না, যাকে প্রশ্ন করব তিনিও জানেন না। বিচারহীনতা ন্যায্যতার পরিপন্থি, ইনসাফের প্রতি অন্যায়। তাই বিচারের সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে হবে। আইন প্রণয়নের আভিধানিক নির্যাস অপেক্ষা রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা যা যুগের পরিবর্তনে জাতির চেতনায় পরিবর্তনশীল। যেমন- এ দেশে গণতন্ত্রের অন্যতম গাঠনিক উপাদান হিসেবে ভোট ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতাসীন সরকারই ভোট পরিচালনা করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে মন্দ নির্বাচন, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেউই বলে নাই, বলতেও পারবে না। পরবর্তীতে অধিকার নিরাপত্তাহীনতায় দেশের জনগণ কর্তৃক রাষ্ট্রের প্রতি পরিবর্তিত চাহিদায় ক্ষমতাসীন সরকার নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন চাওয়া, ন্যায্যতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সেভাবে আইনের জন্ম হচ্ছে। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই আইন রচিত হয়, পরিবর্তিত হয়। সর্বক্ষেত্রেই ন্যায় ন্যায্যতা এবং ইনসাফের আবশ্যকতা অপরিসীম। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মঞ্চের চাওয়াপাওয়া ছিল ইনসাফ। তাই তাঁর এত কম বয়সে কম সময়ে এত জনপ্রিয়তা, সরকারপ্রধানসহ রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন ও লাখো জনতার উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাহিতকরণ, রাষ্ট্রীয় শোক পালন অভাবনীয় ব্যাপার, ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ভালো ভোট, বিশ্বাসযোগ্য ভোট হওয়ার পরও যদি দেশে, জাতিতে ন্যায্যতা না থাকে সে ক্ষেত্রে সুফল আসে না। তার প্রমাণ ১৯৫৪ এবং ১৯৭০ সালের ন্যায় ও ন্যায্য ভোট হওয়া সত্ত্বেও জাতি দুর্গতিতে পড়েছিল। তাই ভালো ভোট করার জন্য যত ব্যয় বিধান, ব্যবস্থাপনা করা হবে তার থেকে বেশি ব্যয় বিধান ব্যবস্থাপনা ন্যায়, ন্যায্যতা ও ইনসাফ স্থাপনের জন্য করা হলেই ভালো ভোটের ভালো ফল পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের জনগণ ন্যায়, ন্যায্যতা এবং ইনসাফের প্রতি যথেষ্ট আকাক্সক্ষী, যাতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
বগুড়ার কৃতী সন্তান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ৬ হাজার ৩১৪ দিন প্রবাসকাল অতিক্রম করে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে দেশের মাটিকে স্পর্শ করে দেশপ্রেমের আবেগ দেখালেও তাঁর ওপর নির্যাতন, তাঁর রেখে যাওয়া সুস্থ ছোট ভাইকে না দেখা, না পাওয়া, মায়াময়ী নানিকে না দেখা, সুস্থ মাকে সুস্থ না দেখা ইত্যাদি কষ্টের কাহিনির আবেগকে তিনি ক্যাশ না করে, হিংসা বিদ্বেষের বার্তা না বলে তাঁর বক্তব্যে সবাইকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে দেশ গড়ার আহ্বান তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে যা দিলেন জাতি তাতে বড়ই আশাবাদী। জাতি যন্ত্রণা নয়, শান্তি চায়। বিশেষ করে এ দেশের কোটি কোটি জেন জি-গণ যন্ত্রণা নয়, সান্ত্বনা চায়। তাঁর প্রত্যাবর্তনকালের প্রথম ভাষণে এই আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে বিএনপির সবার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনই কাম্য, হতেই হবে।
টিএমএসএসের মতো তৃণমূল পর্যায়ের সংস্থা যা বগুড়ায় সৃষ্টি হয়ে সমগ্র দেশ এবং বিদেশে কাজ করছে। এ সংস্থার দাতা সীমাবদ্ধতা এবং চাহিদার তুলনায় সম্পদ সংকটজনিত কারণে সংস্থাকে স্বনির্ভর করার জন্য বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনায় সংস্থার বিভিন্ন সেগমেন্টকে স্বাধীন সত্তা দিয়ে ব্যবস্থাপনা চলছে। স্বাধীন সত্তাগুলো-১. সেক্টর, ২. গ্রুপ অব কোম্পানি, ৩. প্রতিষ্ঠান/ডোমেইন, ৪. বিভাগ/ভেঞ্চার, ৫. সেকশন/উদ্যোগ প্রত্যেকেরই ব্যবস্থাপনা বলয়ের প্রধান ব্যক্তি কর্তৃত্ব এবং কৃতি সৃষ্টিতে স্বীয় স্বাধীন সত্তা আছে। এ পাঁচটি বলয়ের মধ্যে ন্যায়, ন্যায্যতা, ইনসাফ বলবৎ আছে কি না তা দেখার জন্য আমার নেতৃত্বে নির্বাহী সচিবালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ নয়, রেগুলেশন করা হয় মাত্র। আমি একজন বেতন এবং ভাতাভোগী বিধিবিধানাধীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপক মাত্র। সংস্থার সব স্টেকহোল্ডার অর্থাৎ সারা দেশের প্রায় কোটি খানেক পরিবারের একজন হিসেবে আমিও স্টেকহোল্ডার, মালিক; যা ভ্রমাত্মকভাবে অনেকে আমাকেই মুখ্য মালিক গণ্য করেন। ৪৫ বছর ধরে এই গণ্য করাকে প্রত্যাশিতভাবে গৌণ করতে পারছি না। আরও যা বেশি পারছি না, তা হচ্ছে সমগ্র টিএমএসএস এবং সর্ব বলয়ে ন্যায়, ন্যায্যতা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা, কায়েম করা। বলয় প্রধানরা অধীনস্থ জনবল এবং উপকারভোগীদের থোড়াই কেয়ার করে। তারা মনে করে না যে, নিজে নিজেকে ভালো বললেই চলবে না, সংশ্লিষ্ট সবাই তাকে ন্যায়বাদী, ন্যায্যতাপূর্ণ মনে করতে হবে, প্রদর্শিত হতে হবে, পারসেপশন থাকতে হবে। যেখানে ইনসাফ নাই, ন্যায্যতা নাই সেখানে সত্যিকারের উন্নয়ন, মানবিক উন্নয়ন নাই। রাষ্ট্রের সংঘাত থামাতে সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ বাহিনী আছে। সমাজ এবং সংস্থার সংঘাত থামাতে সামাজিক নেতৃত্ব এবং সংস্থার বলয় প্রধানরা আছেন। এই নেতৃত্ব এবং প্রধানরা যদি ইনসাফ, ন্যায়, ন্যায্যতা বিবর্জিত হয় তখনই বলয়বহির্ভূত (কেন্দ্রীয় প্রশাসন বা অন্য বলয়ের সহায়তা গ্রহণ) হস্তক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়, তা দিয়েও না হলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ডাকতে হয়, মামলা-মোকদ্দমায় যেতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি চাপ বেড়ে যায়, রাষ্ট্র বেসামাল হয়, মবোক্রেসি জন্ম নেয়। এই মবোক্রেসি থামানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্রেসি অপেক্ষা ন্যায়-ন্যায্যতা এবং ইনসাফ দ্বারা নিরাপত্তাবলয় শক্তিশালী না করলে সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হবে। সাধু সাবধান!
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস
ইমেইল : [email protected]