বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের একটি বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক অঙ্গনে স্বাভাবিক কৌতূহলের চেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর কাগুজে মুদ্রা ছাপাতে ব্যয় হয় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, দেশে চলমান কাগুজে মুদ্রার মোট পরিমাণ আনুমানিক ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলেই একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- দেশে যত কাগুজে টাকা ঘুরছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সমপরিমাণ অর্থ প্রতি বছর শুধু মুদ্রা ছাপানো ও ব্যবস্থাপনাতেই ব্যয় হচ্ছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- এটি কি একটি দক্ষ ও আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষণ, নাকি দীর্ঘদিনের নীতিগত গাফিলতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল?
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই ২০ হাজার কোটি টাকা মানে নতুন করে ২০ হাজার কোটি টাকার নোট বাজারে ছাড়া নয়। এটি মূলত নোট ছাপানো ও পুনঃছাপানো, নিরাপত্তা কাগজ আমদানি, বিশেষ কালি ও নিরাপত্তা সুতা, মুদ্রণ যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন, ভল্টে সংরক্ষণ এবং অচল ও ছেঁড়া নোট ধ্বংসের সম্মিলিত ব্যয়। অর্থাৎ এটি একটি চলমান প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত খরচ। বাংলাদেশে একটি কাগুজে নোটের গড় আয়ুষ্কাল মাত্র দেড় থেকে দুই বছর। ১০০ বা ৫০০ টাকার নোট তো অনেক ক্ষেত্রেই আরও কম সময় টেকে। ফলে একই মূল্যমানের টাকা বারবার নষ্ট হয়, আর রাষ্ট্রকে বারবার নতুন করে সেই টাকা ছাপাতে হয়। এ বাস্তবতা থেকেই বছরে বিপুল অঙ্কের নোট পুনঃছাপানো অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- এই দ্রুত ক্ষয়ের জন্য কি কেবল জনগণের অসচেতন ব্যবহার দায়ী? নাকি এর পেছনে রয়েছে নিম্নমানের কাগজ ও উপকরণ ব্যবহারের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা? তুলনামূলক উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের বহু দেশে ব্যবহৃত মুদ্রা পলিমার বা উন্নত মানের কাগজে তৈরি, যার গড় আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ৭ বছর, কোথাও কোথাও তারও বেশি। ফলে সেখানে একই নোট বহু বছর ব্যবহার করা যায়, ময়লা কম ধরে, ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কম থাকে। এর সরাসরি ফল-মুদ্রা ছাপানোর হার কম, ব্যয় নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সহজ। অথচ বাংলাদেশে এখনো তুলনামূলকভাবে কম টেকসই কাগজ ব্যবহৃত হওয়ায় নোট দ্রুত নোংরা হয়, ছিঁড়ে যায় এবং অচল হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র এক ধরনের ছাপাখানানির্ভর চক্রে আটকে গেছে-একই টাকা বারবার ছাপানো, বারবার ধ্বংস করা, আবার নতুন করে ছাপানো।
এ বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুতর ও সংবেদনশীল বিষয়- অবৈধ সীমান্তপারের নগদ প্রবাহ। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক মহলের মতে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে যাচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্যের আড়ালে চোরাচালান, অঘোষিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি, চিকিৎসা ও শিক্ষার নামে নগদ বহন এবং পুঁজি পাচারের মাধ্যমে এই অর্থ দেশের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের নগদ ব্যবস্থাপনায়। একদিকে দেশে কাগুজে টাকার ঘাটতি তৈরি হয়, অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও বেশি নোট ছাপাতে হয়। অর্থাৎ সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া নগদের শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র আবারও ছাপাখানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে-আর সেই ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বছরে আনুমানিক ১ থেকে ১.২ লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ নোট ছাপানো ও পুনঃছাপানো হয়। এর সিংহভাগই নতুন অর্থ সরবরাহ নয়; বরং নিম্নমানের কাগজ, দ্রুত ক্ষয় এবং অবৈধ নগদ প্রবাহের কারণে পুরোনো নোটের প্রতিস্থাপন। প্রশ্ন হলো- এই ব্যয় কি অনিবার্য? উত্তর স্পষ্টভাবে ‘না’। উন্নতমানের কাগজ বা পলিমার নোটে ধাপে ধাপে রূপান্তর, নগদ ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বিস্তৃত করা এবং সীমান্তপারের অবৈধ অর্থপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে টাকা নোংরা করা এবং লেখাজোখা করার প্রবণতা সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে। ছাপাখানা দিয়ে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ লেখা যায় না। সময় এসেছে উন্নত কাগজ, আধুনিক লেনদেন ব্যবস্থা এবং কঠোর নীতির মাধ্যমে এই কাগজনির্ভর ব্যয়বহুল চক্র থেকে বেরিয়ে আসার।
লেখক : ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান