নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে গিয়েছিলাম মেঘনা নদীর এক চরে। নাম চরকিশোরগঞ্জ। প্রশাসনিকভাবে এটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও ভৌগোলিকভাবে একেবারে মুন্সিগঞ্জ জেলার সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই অবস্থানই যেন চরকিশোরগঞ্জের আশীর্বাদ আবার অভিশাপ। মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চর আজ আর শুধু বালুর ঢিবি বা অনিশ্চয়তার প্রতীক নয়। এখানে এখন ফসলের সবুজ, কৃষকের ব্যস্ততা আর সম্ভাবনার ভাষা স্পষ্ট। শুকনো মৌসুমে মেঘনার রূপ অনেকটাই শান্ত। সেই শান্ত নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চরকিশোরগঞ্জের মাঠের দিকে তাকালে চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। যতদূর চোখ যায়, শাকসবজি আর রবিশস্যের বিস্তৃতি। মুলা, লাউ, কুমড়া, করলা, আলু, টম্যাটো, বেগুন। একসময় যে চরকে অনাবাদি আর দুর্গম ভাবা হতো, সেখানে আজ বারো মাসই কোনো না কোনো ফসল।
এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। কৃষকের পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা, উন্নত জাতের বীজ আর এনজিওগুলোর মাধ্যমে আসা কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা মিলেই এই ফসল বৈচিত্র্যের জন্ম দিয়েছে। ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ কিংবা ‘কৃষি দিবানিশি’ অনুষ্ঠানে বহুবার দেশের বিভিন্ন জেলার চরাঞ্চল তুলে ধরেছি। সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ নানা জায়গার চরে কাজ করেছি। সেসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে চরকিশোরগঞ্জের বর্তমান চিত্র মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, চর মানেই আর পিছিয়ে পড়া নয়। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও এখানে প্রবল।
চরকিশোরগঞ্জে শতাধিক কৃষক নিয়মিত চাষাবাদ করেন। তাঁদের একজন বোরহানউদ্দিন। বয়স ৬০ পেরিয়েছে। জন্ম আর বেড়ে ওঠা এই চরে। জীবনও কাটছে এই চরের মাটিতেই। তিনি বললেন, নদীর পাড়ে পলিমাটি জমে বলে জমিন ভালো। ফলনও তুলনামূলক ভালো হয়। আল্লাহর রহমতে মোটামুটি ভালোই আছেন। কিন্তু এই ভালো থাকার কথার ভিতরেই লুকিয়ে আছে বহু অনিশ্চয়তা।
চরের কৃষির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের কৃষির পার্থক্য আছে। জমির মালিকানা, চাষের ঝুঁকি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা সবই আলাদা। বোরহানউদ্দিন জানালেন, একসময় তাঁর ৬০ বিঘার মতো জমিতে চাষ ছিল। এবার কিছুটা কমাতে হয়েছে। জমির একটি অংশ পৈতৃক হলেও অনেক জমিই সরকারিভাবে খাস, যা লিজ নিয়ে চাষ করতে হয়। কেউ নিজের জমিতে চাষ করেন, আবার অনেকেই লিজ নিয়ে কৃষিকাজ চালান। খাসজমির লিজ বহু বছর আগে দেওয়া, অনেক ক্ষেত্রে তা ৯০ বা ৯৯ বছরের জন্য। নিয়মমাফিক খাজনা দেওয়া হয়। কিন্তু মালিকানার অনিশ্চয়তা সব সময় কৃষকের মাথার ওপর ঝুলে থাকে।

চরকিশোরগঞ্জের সবচেয়ে বড় সমস্যা তার ভৌগোলিক অবস্থান। সোনারগাঁ উপজেলা, নারায়ণগঞ্জ জেলা হলেও চারপাশে মুন্সিগঞ্জ। এই মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে সরকারি অনেক সুবিধা ঠিকভাবে পৌঁছায় না। কৃষকের ভাষায়, তাঁরা যেন দুই জেলার মাঝখানে পড়ে গেছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সার ও কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিতে।
এখানে সারের সংকট প্রকট। সরকারি ডিলারশিপের মাধ্যমে যে দামে সার পাওয়ার কথা, তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। কৃষকদের বাধ্য হয়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়। পরিবহন খরচ যোগ হয়। একই অবস্থা কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রেও। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বাজারে সেই খরচের প্রতিফলন সব সময় হয় না।
কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে আসেন। বড় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু নিয়মিত তদারকি বা পরিকল্পিত পরামর্শের অভাব রয়েছে। অনেক সময় কৃষকদের বলা হয়, সমস্যার সমাধান জানতে অফিসে যেতে। চরের কৃষকের পক্ষে সব সময় অফিসে গিয়ে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। কোথাও সমস্যা হলে আবার নতুন চারা লাগিয়ে দেন। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে।
বীজ নিয়ে অভিযোগ এখানে সবচেয়ে বেশি। মাঠে দাঁড়িয়ে এক কৃষকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে থমকে গেলাম। তিনি বললেন, চার প্যাকেট টম্যাটোর বীজ কিনে ৪ হাজার ৪০০ টাকা খরচ করেছেন। অথচ পেয়েছেন মাত্র ৪০০ চারা। একই সময়ে পাশের জমিতে অন্য কৃষকের বীজ ভালোভাবে উঠেছে। দোকানদারের কাছে অভিযোগ জানালে তিনি দায় নেননি। বলেন, লাগানোর পদ্ধতিতে সমস্যা হয়েছে। কৃষক বোঝেন, সমস্যা বীজের। পুরোনো বা নিম্নমানের বীজ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রমাণ করা কঠিন। অভিযোগ জানানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। দোকানদার বলেন, তাঁরা নিজেরা বীজ তৈরি করেন না। কোম্পানির দিকে দায় ঠেলে দেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কৃষকেরই থেকে যায়।
বিশেষ করে বীজের গুণগত মান নিয়ে অভিযোগ সারা দেশের অসংখ্য কৃষকের। এ নিয়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম গাজীপুরের কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার ও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিতে। সেখানে দেখেছি বীজের প্যাকেটে নানা তথ্য-উপাত্ত, শর্ত লেখা থাকে, থাকে না বীজ না গজালে কৃষকের কী করণীয়, কোথায় যাবে। এ বিষয়টি একাধিকবার নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরেছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। চরের এক কৃষক জানালেন, গত বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এ বছর সেই ১৫ লাখ টাকাই প্রায় লোকসান। বিশেষ করে আলুতে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে আলু লাগানোর মতো সামর্থ্য তাঁর নেই। এই বাস্তবতা শুধু একজনের নয়, অনেক কৃষকের।
আলু উৎপাদনের চিত্রটি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টিভি বা পত্রিকায় প্রায়ই শুনি, দেশে আলুর উৎপাদন বেড়েছে। দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই কি কৃষক বাঁচে। যদি বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকে, রপ্তানির উদ্যোগ না থাকে, তবে সেই অধিক উৎপাদনই কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। চরকিশোরগঞ্জের কৃষকের ভাষায়, সরকার যদি সময়মতো পরিকল্পনা করত, তাহলে এই আলুর ফলনই তাঁদের বাঁচাতে পারত। কিন্তু তা হয়নি।
এই সংকটের ভিতর কৃষিবিমার প্রসঙ্গ আসে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিমা আছে, গাড়ির বিমা আছে, বাড়ির বিমা আছে। কিন্তু কৃষকের ফসলের বিমা নেই। বন্যা এলে সব ভেসে যায়, খরা এলে ফসল পুড়ে যায়, রোগবালাইয়ে খেত নষ্ট হয়। এসব ক্ষতির দায় কৃষক একাই বহন করেন। কেউ কেউ বিদেশে কাজ করে পুঁজি এনে কৃষিতে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু এক মৌসুমের ক্ষতিতে সেই পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। শস্যবিমা চালু হলে অন্তত ক্ষতির সময় কৃষক কিছুটা সুরক্ষা পেতেন।
চরের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মাটির স্বাস্থ্য। কৃষকরা বলছেন, আগে জোয়ারের পানিতে জমিন নতুন শক্তি পেত। পলিমাটি আসত। মাটি উর্বর থাকত। এখন অনেক জায়গায় সেই জোয়ার আসে না। একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ করা হচ্ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে মাটির শক্তি কমে যাচ্ছে। গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো ফলন হচ্ছে না। কৃষকেরা নিজেরাও বিষয়টি বুঝতে পারছেন, কিন্তু বিকল্প পথ জানেন না।
তবু চর থেমে নেই। বেগুন তোলার পর আবার অন্য ফসল। লাউয়ের মাচা, কুমড়ার খেত, মরিচ, ভুট্টা, গম, সরিষা। এক জমিতে একাধিক ফসল ঘুরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। লাউয়ের ডগা বিক্রি করেও কৃষক আয় করেন। পাইকাররা সরাসরি চর থেকেই ফসল কিনে নিয়ে যান। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে। কিন্তু কৃষকের লাভের পরিমাণ এখনো সীমিত।
বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১০ শতাংশ চরাঞ্চল। প্রায় ১ কোটি মানুষের বসবাস চর এলাকায়। দেশের ৩২টি জেলার শতাধিক উপজেলার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে চর যুক্ত। নদীভাঙন, বন্যা, খরা এসব দুর্যোগ প্রতিনিয়ত এই মানুষগুলোর জীবনকে নাড়িয়ে দেয়। প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজার মানুষ নদীভাঙনে গৃহহীন হয়। তবু এই মানুষগুলোর হাত ধরেই দেশের খাদ্যভান্ডার ভরে ওঠে।
চরকিশোরগঞ্জে দাঁড়িয়ে বারবার ভাবছিলাম, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এই চর কত বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে। মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা গেলে, কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে যুক্ত করা গেলে, প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ালে, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করলে চরের কৃষক আরও এগিয়ে যেতে পারতেন। শস্যবিমা চালু হলে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমত। রাসায়নিকের অপব্যবহার কমিয়ে উত্তম কৃষিচর্চার দিকে গেলে মাটির স্বাস্থ্য ফিরত। চরের মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে শিখেছে। নদী ভাঙে, আবার চর জাগে। সেই জাগা চরে কৃষক আবার ফসল ফলান। এই লড়াইয়ের নামই চরজীবন। যদি রাষ্ট্র, সমাজ আর নীতিনির্ধারকরা এই লড়াইকে গুরুত্ব দেন, তবে চর শুধু দুর্যোগের গল্প বলবে না। বলবে সম্ভাবনার গল্প, আত্মনির্ভরতার গল্প, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের গল্প।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব