আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশকে ঘিরে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক আলোচনা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠতে যাচ্ছে। উদীয়মান পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে দেশিবিদেশি কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে দুই দেশের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরুর কথা শোনা যাচ্ছে। যা ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আরও সক্রিয় হয়েছে। ইসলামাবাদ ও ঢাকার সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ এবং পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এযাবৎকাল বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চীন, ভারত, পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কথা সচরাচর শোনা গেলেও হালে আরেকটি দেশের নাম বেশ আলোচিত হচ্ছে। সে দেশ হলো তুরস্ক। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বরাবরই শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা উদ্বেগের ওপর দাঁড়িয়ে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আফগানিস্তান-পরবর্তী অনিশ্চয়তা, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা-এই বাস্তবতায় নতুন প্রতিরক্ষা জোটের উত্থান কাকতালীয় নয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ কেবল সামরিক সহযোগিতার সীমায় আবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রতিরক্ষাশিল্পের বিস্তার এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর কৌশল।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করে আসছে। ভারত, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে নতুন নিরাপত্তা অংশীদারের সন্ধান প্রতিরক্ষাসক্ষমতা বৃদ্ধির একটি পথ খুলে দিতে পারে। প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কিংবা সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে এই জোট থেকে কিছু বাস্তব সুবিধা মিলতে পারে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা। তবে এই সম্ভাবনার আড়ালে ঝুঁকিও কম নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় কোনো প্রতিরক্ষা জোটে সম্পৃক্ততা দিল্লির দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল ইস্যু। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমান্ত, পানিবণ্টন কিংবা বাণিজ্যের মতো বিষয়ে নতুন চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই যায়। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোট মানে শুধু সুবিধা গ্রহণ নয়; ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক কোনো সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবস্থান নেওয়ার নৈতিক ও কৌশলগত দায়ও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি বরাবরই ছিল স্বায়ত্তশাসন ও নমনীয়তা। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। কোনো জোটে যুক্ত হলে সেই নীতির ব্যাখ্যা সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণ কখনো কখনো সংঘাতপূর্ণ হতে পারে, যা অর্থনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির বড় প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান সময়টি স্পষ্টভাবেই জোটের রাজনীতির দিকে এগোচ্ছে। ন্যাটোর সম্প্রসারণ, কোয়াড ও অকাসের মতো উদ্যোগ, আবার ব্রিকসের নিরাপত্তা আলাপ, সবই ইঙ্গিত দেয় শক্তির পুনর্বিন্যাসের। এই পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হচ্ছে ইস্যুভিত্তিক ও সীমিত সম্পৃক্ততা, যেখানে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের বদলে নির্দিষ্ট সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো বেছে নেওয়া হয়। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আনুষ্ঠানিক জোটের কাঠামোয় আটকে না রেখে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ রাখা। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ও প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে স্বচ্ছ কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। জাতীয় স্বার্থের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংসদীয় নজরদারি ও জন-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে আরও গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এই নয় যে বাংলাদেশ কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেবে কি না? আসল প্রশ্ন হলো-কতদূর এগোনো হবে এবং কী শর্তে? পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি প্রতিরক্ষা সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি দুটোই নিয়ে হাজির হয়েছে। এই সংবেদনশীল মুহূর্তে ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই সম্ভাবনা ভবিষ্যতে শক্তি হয়ে উঠবে, নাকি নতুন জটিলতার উৎস হবে।
লেখক : সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক
অপরাধ বিশেষজ্ঞ