মাঝখানে আর আছে কুড়ি দিন। তারপরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে হতে যাচ্ছে জুলাই সনদ প্রশ্নে হ্যাঁ-না ভোট। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ হয়ে গেছে। মার্কা পাওয়ার পর প্রচার-প্রচারণায় মাঠ সরগরম। গণভোট নিয়ে ইলেকশনের মাঠে কোনো উত্তাপ নেই। সাধারণ মানুষের এ বিষয়ে বিশেষ কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। জুলাই সনদ কী, এর ভিতরে কী আছে-না আছে, তা বেশির ভাগ মানুষ জানেও না। জুলাই সনদ কমবেশি ৫০ পৃষ্ঠার একটা দলিল। ঐতিহাসিক এই দলিলের বিষয়বস্তু শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত। খুবই কঠিন বিষয়। সাধারণ শিক্ষিত মানুষেরও অনেকের পক্ষে বুঝতে পারা দুরূহ। সনদটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বেশ লম্বা সময় পাওয়া গেলেও সরকার, প্রশাসনযন্ত্র কিংবা গণভোটকে যারা অনুপেক্ষণীয় বিবেচনা করছেন, তাদের কেউই জনগণের কাছে এই সনদের কপি পৌঁছাননি। উঠান বৈঠক করে পড়েও শোনাননি। অথচ জনগণকে বলা হচ্ছে জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দিতে। সত্য বটে, বিপক্ষে না ভোট দেওয়ারও একটা অপশন আছে। সেটা থাকবে কাগজে। অন্তর্বর্তী সরকার কোমর বেঁধে নেমেছে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। প্রধান উপদেষ্টা, তাঁর অফিসের সব কর্মকর্তা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য- সবাই নেমে পড়েছেন গণভোটের নয়, হ্যাঁ ভোটের ক্যাম্পেইনে। জনপ্রশাসন তো বটেই, সরকারের অন্যান্য সার্ভিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য হ্যাঁ ভোটের ক্যাম্পেইন অলিখিতভাবে হলেও ম্যান্ডেটরি করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরাও।
ইন্টেরিমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হ্যাঁ ভোটের ক্যাম্পেইন করতে পারেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, আইনগত কোনো বাধা নেই। অতঃপর রীয়াজ সাহেবকে যদি উল্টো প্রশ্ন করা হয়, জনাব আইনের কোথাও লেখা নেই, সরকারি কর্মচারীরা গণভোটে হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। বেশ! তো বলুন কোন আইনে কী লেখা আছে, তারা হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন? তখন তিনি কী জবাব দেবেন! সব কথা আইনে লেখা থাকে না। রীতি, কনভেনশনও এক ধরনের আইন। সরকারি কর্মচারীর পদপদবি ব্যবহার করে ভোটের মাঠে পক্ষপাতমূলক প্রচারণা রীতিবিরুদ্ধ। এটা নৈতিকতার পরিপন্থি। তার চেয়েও বড় কথা, সরকারি-আধাসরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই ভোট গ্রহণ, গণনা, ফলাফল ঘোষণার কাজে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ ইলেকশনে প্রতিটি বুথে প্রত্যেক প্রার্থীর এজেন্ট থাকবেন। কিন্তু গণভোটে হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে কোনো এজেন্ট থাকার কথা নয়। এ অবস্থায় হ্যাঁ বা না ভোটের ফলাফল কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। তা সত্ত্বেও ভোটার সাধারণ সজাগ থাকলে অনুমান ভুলও প্রমাণিত হতে পারে। গণভোট নিয়ে সরকার যে অবস্থান গ্রহণ করেছে তা কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়। অতীতে বাংলাদেশে আরও তিনটি গণভোট হয়েছে। সেই তিন পর্যায়ে সরকার-প্রশাসন গণভোটে অংশগ্রহণ করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু হ্যাঁ বা না ভোটের ক্যাম্পেইন করেনি। এবার যা হচ্ছে তা নতুন। গণভোটে পক্ষপাতমূলক প্রচারণায় অংশগ্রহণ করায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতার জায়গাটি নিদারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যা সংসদ নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে পারে। যা হোক এ বিষয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না।
দেশের মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনটির জন্য। নির্বাচনের আগের এবং ভোটের দিন আইনশৃক্সক্ষলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে তা নিয়ে জনমনে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় মারামারি-কাটাকাটির ঘটনা ঘটেছে। ঢাকায় ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখে ও তার আগে-পরে থানা লুট হয়েছে। বহু আগ্নেয়াস্ত্র বেরিয়ে গেছে। সেসব অস্ত্রের প্রায় ৪০ ভাগ এখনো উদ্ধার হয়নি। গত বুধবার সেনাপ্রধান সরকারের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ অভ্যুত্থানের সময় ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার হয়েছে, যা লুট হওয়া অস্ত্রের ৬২ শতাংশেরও বেশি। যে ৪০ শতাংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি তাও নির্বাচনের দিন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাস পর সেসব আগেয়াস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে। দেড় বছর সরকার সমস্যাটিকে অতটা আমলে নেয়নি বলেই মনে হয়। কিন্তু কেন, এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অপারেশন ডেভিল হান্ট চলেছে। তখন অনেক গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেলেও অস্ত্র উদ্ধারের সংবাদ সেই তুলনায় কম এসেছে। ডেভিল হান্টের নামে আসলে আওয়ামী লীগ ধরা হয়েছে। যে দলের নেতা-কর্মীরা এমনিতেই রয়েছেন দৌড়ের ওপর, তাদের পেছনে অতটা এনার্জি খরচ না করলেও চলত। আওয়ামী লীগ ধরার চেয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। এদিকে গত রবিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনকালে ব্যবহার হবে না, আমি নিশ্চিত করছি।’- এরকম নিশ্চয়তা তিনি কী করে দেন তা ভেবে বিস্মিতবোধ না করে পারা যায় না। যে কেউ এই প্রশ্নটাও তো করতেই পারেন, তাহলে কি যারা অস্ত্র লুট করেছে বা যাদের হাতে অস্ত্রগুলো রয়েছে, তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার যোগাযোগ রয়েছে! এই প্রশ্নটি ছাড়া আমাদের আর কী বলার থাকতে পারে!
তবে আইনশৃঙ্খলার বিরাজমান পরিস্থিতিকে ভালো বলার কোনো সুযোগ নেই। গত সোমবার চট্টগ্রাম শহরের পাশে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় একজন র্যাব সদস্য নিহত হয়েছেন। প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের সন্ত্রাসের আখড়া হয়তো আরও রয়েছে। ক্রিমিনালদের হাতে অস্ত্র থাকবে, ভোটে তা ব্যবহার হবে না, সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। চিরুনি অভিযান চালিয়ে সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আগে থেকে তৎপর হলে এত দিনে বেশির ভাগ অস্ত্র হয়তো উদ্ধার করা সম্ভব হতো। বিলম্বে হলেও প্রধান উপদেষ্টা অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশনা দিয়েছেন। হাতে সময় খুব কম। এই কম সময়ের মধ্যে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান কতটা সফল হবে তা বলা মুশকিল। ক্রিমিনালদের হাতে অবৈধ অস্ত্র থাকলেও প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনি প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের যেমন দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ জরুরি, তেমনই প্রয়োজন প্রার্থীদের দায়িত্বশীলতা।
মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, এবারের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন ব্যতিক্রমধর্মী তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক দুর্বলতা বা পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক দলগুলোর ভ্রান্তির কারণে এই ইলেকশন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিপতিত হবে এক জটিল আবর্তে। আধিপত্যবাদবিরোধী যে স্লোগান আমরা অহরহ উচ্চারিত হতে শুনি, তা ব্যর্থ পরিহাসে পরিণত হবে। বিরাজমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি ফেরানো উচিত। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এই মুহূর্তে মোটেও আশাপ্রদ নয়। বেকার সমস্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাজারে এলপি গ্যাসের সংকট তীব্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালো চলছে না। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যায়নি। ব্যবসাবাণিজ্যে স্বেচ্ছাচারিতা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে গোপনে ও প্রকাশ্যে চলছে দেশবিরোধী চক্রান্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের গণ আন্দোলনকে প্রতিস্থাপিত করার একটি প্রচেষ্টা রয়েছে। নানাভাবে প্রক্সি পলিটিকস উসকে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত। অন্যদিকে ভৌগোলিক দিক দিয়ে কিছুটা দূরের হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কাছের ও দূরের- এই দুটো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তা হলে দেশ দুটোর নিজেদের ভিন্ন হিসাব থাকা বিচিত্র নয়। পাকিস্তান বা পাকিস্তান রাষ্ট্রের মহলবিশেষ ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইতে পারে। ভারতের মাথায় রয়েছে তার স্বার্থের হিসাব। আর আমাদের দেশের ভিতরেও একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা পেছনে হাঁটতে পছন্দ করে।
আজকের ইউনিপোলার বিশ্বে বৃহৎ শক্তি ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যেখানে সম্পদ আছে, সেখানে আধিপত্য কায়েম করাকে তারা তাদের অধিকার বলে ভাবতে শুরু করেছে। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’- পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এরকম এক জটিল আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশ বাঁচাতে প্রয়োজন দক্ষ ও শক্তিশালী সরকার। প্রয়োজন সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য। শুনতে তিক্ত হলেও বাস্তবতা হলো ইন্টেরিম আমলে জাতীয় ঐক্যের জায়গাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিকনসিলিয়েশনের ধারণা পরিত্যাজ্য প্রায়। এমতাবস্থায় শতভাগ নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। একটি নির্বাচিত সরকার বোধগম্য কারণেই নৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে। নৈতিক দৃঢ়তা সেই সরকারকে দক্ষ বানায়। কাজেই নির্বাচন যাতে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে না পারে, সে ব্যাপারে সব মহলের সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক