নির্বাচনের মৌসুম এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার নানা প্রতিশ্রুতিতে ভরে ওঠে। উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, স্মার্ট বাংলাদেশ, ডিজিটাল ভবিষ্যৎ- এসব শব্দ বারবার উচ্চারিত হয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। এই উন্নয়নের ভিত্তি কোথায়? দীর্ঘদিন গ্রামে গ্রামে কৃষকের মাঠে ঘুরে যা দেখেছি, তা হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এখনো কৃষি। শহরের দৃশ্যমান উন্নয়নের নিচে যে ভিত্তি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি কৃষক, তথা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তারা উন্নত হলেই দেশ উন্নত হবে। কৃষক দুর্বল হলে উন্নয়নের সব হিসাব একসময় নড়বড়ে হয়ে যাবে।
আজকের বাংলাদেশে কৃষকের সংকট কেবল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক বীজ বোনে, ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায়। কিন্তু ন্যায্যমূল্য পায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উৎপাদন খরচের লাগামছাড়া বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে কৃষক আজ অস্তিত্ব সংকটে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কৃষি নিয়ে আবেগী বাক্য নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর অঙ্গীকার।
আমরা প্রায়ই গর্ব করে বলি, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু মাঠের কৃষকের কাছে গেলে সে ভিন্ন কথা বলে। তার সমস্যা উৎপাদনে নয়, তার সমস্যা ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ফসল সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা। ফসল কাটার মৌসুম এলেই দাম পড়ে যায়। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক বাধ্য হয় লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে।
তাই রাজনৈতিক ইশতেহারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সংস্কার। প্রতিটি উপজেলায় শস্য সংরক্ষণাগারসহ আধুনিক কৃষি বাজার গড়ে তোলা দরকার, যেখানে কৃষক সরাসরি তার পণ্য বিক্রি করতে পারবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষক থেকে ভোক্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি। ব্লকচেইনভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে বাজারে স্বচ্ছতা আসবে এবং কৃষক তার ন্যায্য হিস্সা পাবে।
আজ আমরা যে পিঁয়াজ আমদানি করি, তার মূল কারণ উৎপাদন ঘাটতি নয়, সংরক্ষণ ঘাটতি এবং প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করতে না পারা। দেশে উৎপাদিত ফল ও ফসলের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। আলুর পাশাপাশি পিঁয়াজ, টম্যাটো ও শাকসবজির জন্যও অঞ্চলভিত্তিক বিশেষায়িত হিমাগার গড়ে তুলতে হবে। নামমাত্র ভাড়ায় কৃষক যেন সেখানে পণ্য রাখতে পারে এবং সেই সংরক্ষিত শস্যের বিপরীতে স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারে। এ ব্যবস্থাই কৃষকের আয় স্থিতিশীল করতে পারে। একই সঙ্গে বাজারকেন্দ্রিক সংরক্ষণাগার স্থাপন জরুরি। বাজারে দাম না পেলে কৃষক যেন পণ্য ফিরিয়ে এনে পরবর্তী দিনের জন্য সংরক্ষণ করতে পারে। এতে লোকসানে বিক্রির চাপ কমবে।
বাংলাদেশে কৃষক সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। একবার বন্যা, একবার খরা কিংবা শিলাবৃষ্টি। এক মৌসুমে সব শেষ। তাই রাজনৈতিক ইশতেহারে থাকতে হবে সর্বজনীন শস্য বিমার সুস্পষ্ট ঘোষণা। ফসল নষ্ট হলে কৃষক ক্ষতিপূরণ পাবে এমন বাধ্যতামূলক বিমা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যার প্রিমিয়ামের বড় অংশ সরকার বহন করবে।
সহজ শর্তে কৃষি ঋণ কৃষকের আরেকটি মৌলিক চাহিদা। বাস্তবতা হলো ব্যাংকের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে কৃষক উচ্চ সুদে এনজিও ঋণ বা মহাজনী ঋণে জড়িয়ে পড়ে। কৃষক স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ, ৪ শতাংশ বা তার কম সুদে, তাৎক্ষণিক অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণ যেখান থেকেই দেওয়া হোক, কৃষকের জন্য সুদের হার সহনীয় রাখতে হবে। শস্যগুদাম ঋণ প্রকল্প পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি। ফসল কাটার মৌসুমে যখন দাম কম থাকে, তখন কৃষক যেন গুদামে ফসল রেখে তার বিপরীতে ঋণ নিতে পারে। পরে দাম বাড়লে বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবে। এতে কৃষক মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনাও স্থিতিশীল হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরপর দুই মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঋণ ও সুদ মওকুফের স্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সহানুভূতিশীল ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আজ গ্রামে কৃষি শ্রমিক পাওয়া কঠিন। পাওয়া গেলেও মজুরি অনেক বেশি। এর একমাত্র টেকসই সমাধান যান্ত্রিকীকরণ। কিন্তু কৃষিযন্ত্র এখনো বেশির ভাগ কৃষকের নাগালের বাইরে। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি অঙ্গীকারে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে, কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে। বড় যন্ত্রের পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্রেও ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। যন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ইউনিয়ন পর্যায়ে মেকানিক হাব গড়ে তুলতে হবে। ড্রোন ব্যবহার করে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ডিজিটাল ল্যাব, এসব এখন বিলাসিতা নয়।
ডিজেলনির্ভরতা কমাতে সোলার সেচ পাম্প পুরোপুরি চালু করতে হবে এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ন্যানো প্রযুক্তির দিকে জোর দিতে হবে। ন্যানো ইউরিয়া ও ন্যানো পেস্টিসাইড সারের অপচয় কমাতে এবং উৎপাদন খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণা ও স্থানীয় উৎপাদন ছাড়া এই সম্ভাবনা বাস্তব হবে না। পোলট্রি ও ডেইরি খাত আজ সিন্ডিকেটের কবলে। পশুখাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় এবং দেশে ভুট্টা ও সয়াবিন চাষে প্রণোদনা দিতে হবে। প্রতিটি গ্রামে মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক চালু করা গেলে খামারিরা সময়মতো সেবা পাবেন।
দুধ ও মাংস সংরক্ষণের জন্য সমবায়ভিত্তিক চিলিং সেন্টার এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে কর অবকাশ জরুরি। মাছ, পোলট্রি ও গবাদিপশু কৃষিপণ্য। এগুলোকে শিল্প ক্যাটাগরিতে বিদ্যুৎ বিল করা অযৌক্তিক। এই বৈষম্য দূর করতে হবে। আমরা এখনো কাঁচা পণ্য বিক্রি করি। অথচ প্রক্রিয়াজাত করলে পণ্যের মূল্য বহুগুণ বাড়ে। উত্তরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস বা গ্যাপ সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে। আম, লিচু, ইলিশ ও সবজির আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবনে গবেষণা বাজেট বাড়াতে হবে। হাওর ও নিম্নাঞ্চলে ভাসমান কৃষির বিস্তার জরুরি।
সমুদ্র আমাদের বড় সম্ভাবনা। সুনীল অর্থনীতি এখনো ইশতেহারে প্রান্তিক। গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ, মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং, ব্লু বন্ড চালু করা ছাড়া এই খাত এগোবে না।
বিশেষভাবে বলতে চাই সামুদ্রিক শৈবালের কথা। এটি ভবিষ্যতের খাদ্য ও শিল্প কাঁচামাল। উপকূলীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে শৈবাল প্রক্রিয়াজাতকরণ, গবেষণা ও রপ্তানিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ জরুরি।
রাজনৈতিক ইশতেহারে একটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। সেটি হলো কৃষিতে প্রজন্ম পরিবর্তন। আজকের তরুণ সমাজ কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নয়। কারণ তারা দেখে কৃষকের ঘাম আছে, কিন্তু সম্মান নেই। লাভ অনিশ্চিত, ঝুঁকি নিশ্চিত। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কৃষিকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক পেশা হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে তরুণরা কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ পাবে। কৃষি এখন আর কেবল কৃষিই নয়, এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা। বীজ উৎপাদন, নার্সারি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, লজিস্টিকস এবং অনলাইন বিপণন এই পুরো চেইন সম্পর্কে তরুণদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইশতেহারে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির জন্য আলাদা কর্মসূচি থাকা উচিত।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষকের সংযোগ বাড়াতে হবে। গবেষণা যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, মাঠে পৌঁছায়। অনেক সময় দেখা যায়, নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও কৃষক তা জানে না, বা ব্যবহার করতে ভয় পায়। এই ব্যবধান কমাতে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর অবদান বিপুল, কিন্তু স্বীকৃতি সামান্য। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ সবখানেই নারীরা যুক্ত। অথচ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার তালিকায় তারা অনেক সময় অদৃশ্য।
রাজনৈতিক ইশতেহারে নারী কৃষকের জন্য আলাদা অঙ্গীকার থাকা জরুরি। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কৃষি বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক কৃষিনীতি না হলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
কৃষি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য ও পুষ্টির প্রশ্নও। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে সফল হয়েছে, কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তায় পিছিয়ে আছে। ইশতেহারে তাই শাকসবজি, ডাল, তেলবীজ ও ফল উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একমুখী ফসলি চাষ আমাদের মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করছে। ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াতে কৃষককে প্রণোদনা দিতে হবে। স্কুল পর্যায়ে পুষ্টি বাগান, বসতবাড়িভিত্তিক সবজি চাষ এবং ছাদকৃষির প্রসার ঘটালে শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে।
আজকের কৃষি আর অনুমানের ওপর চলতে পারে না। কখন বৃষ্টি হবে, কখন তাপমাত্রা বাড়বে, কোন রোগ আসতে পারে, এসব তথ্য আগে থেকে জানা গেলে কৃষক অনেক ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারে। তাই আবহাওয়া পূর্বাভাস, বাজারদর ও রোগবালাইসংক্রান্ত তথ্য কৃষকের মোবাইলে পৌঁছতে হবে সহজ ভাষায়। ইশতেহারে স্মার্ট কৃষি তথ্য ব্যবস্থার স্পষ্ট রূপরেখা থাকা দরকার। কৃষক যেন শুধু উৎপাদক না থাকে, সে যেন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, লাভ বাড়বে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যদি কৃষি থাকে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে, তাহলে মাঠের বাস্তবতা বদলাবে না। আর যদি কৃষি থাকে কেন্দ্রবিন্দুতে, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শহরের কংক্রিটে নয়, গ্রামের ফসলের মাঠে লেখা আছে। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকই আমাদের শক্তি। তাই আসন্ন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, কে কৃষকের পাশে দাঁড়াবে, কে কৃষিকে সামনে রাখবে?
লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব