জগতের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ও প্রতিপালক মহান প্রভু করুণাময় আল্লাহতায়ালা। সবার উদ্দেশ্য তাঁকে পাওয়া। তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা কীর্তন, সবার গতি ও প্রত্যাবর্তন তাঁরই প্রতি। প্রিয়তম মানব তাঁরই নুরে সৃজিত। তাঁর প্রেম-সংশ্রব থেকে বহুদূরে পর্দার আড়ালে পতিত হওয়ায় মানব তাঁর পুনঃসঙ্গ লাভের জন্য ব্যাকুল। সুতরাং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির তথা প্রভুর সঙ্গে মানুষের সুমধুর শান্তিময় মিলন অর্জনের জন্য এবং উভয়ের মধ্যকার পর্দা সরানোর জন্য তাঁর (স্রষ্টার) মনোনীত নবী-ওলি-হাদির একান্ত প্রয়োজন। কালের দূরত্বে মহান প্রভুর আদর্শকে মানব যখন তাঁর পরিচিতি জ্ঞান ও প্রেম-প্রীতি ভুলে বসে, তখন এ ওলি-হাদিরাই মানব জগৎকে তাঁর (প্রভুর) স্মৃতি, প্রীতি ও প্রেম-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে তাঁর মিলন পথে পৌঁছে দেন। সম্পন্ন গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর আগমনও ঘটেছে মানবজাতির মুক্তির জন্য, স্রষ্টার সঙ্গে মানবের মিলন ঘটানোর জন্য। তিনি যুগোপযোগী ও চিত্তাকর্ষক কৌশল, ভাবধারা, কার্যকলাপ ও রীতিনীতি এবং চরিত্র মাধুর্য দ্বারা জাতিকে আল্লাহ তায়ালার প্রেম-পথে আহ্বান করে মানবের সর্বপ্রকার মুক্তির সন্ধান দিয়ে গেছেন। তিনি নিপীড়িত মানবজাতির মুক্তির জন্য যে অবদান রেখে গেছেন তাঁর বিশেষ কয়েকটি নিয়ে একটু আলোচনা করা যায়।
ধর্মসাম্যের আবেদন সমৃদ্ধ তৌহিদ ও মুক্ত বেলায়তের বিকাশ : মহান প্রভুর একত্ববাদ বা তৌহিদ প্রচারই হচ্ছে ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য এক অদ্বিতীয় মহা শক্তিমান প্রভুর একত্ব-জাতে সম্মিলিত হওয়া। হজরত নবী করিম (দ.) তাঁর আহমদি বেলায়তি শক্তি বলে মানবের ইহজগতে অবতরণের পর একমাত্র মহাপ্রভুর একত্বে মিলনের পথ আবিষ্কার করেন। মহাপ্রভুর একত্বে মিলন হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এর মূল রহস্যদ্বার। এ রহস্যদ্বারের উদ্ঘাটন প্রণালি খোদা তায়ালার রহস্যজড়িত আহমদি বেলায়তি শক্তিতে নিহিত। হজরত সাহেব (ক.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে ওলিগণ ধর্মীয় বিধিনিষেধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার কারণে উক্ত রহস্যদ্বার সব সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত করতে সক্ষম হননি। হজরত সাহেব (ক.) সর্বপ্রথম জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের জন্য উক্ত বেলায়ত উন্মোচন করতে সমর্থ হন। তাই তাঁকে স্বাধীন বাধাহীন বেলায়তের (বেলায়তে মোতলাকা) অধিপতি ও খাতেমুল বেলায়ত বলা হয়।
বলাবাহুল্য, বেলায়তি শক্তির ভাণ্ডার হজরত সাহেব (ক.)-এর ইত্তেহাদি ফয়েজের দ্বারা যে কেউ স্থায়ী খোদা-সম্পর্ক সৃষ্টিতে সমর্থ হতেন; কশ্ফ ও অন্তর্চক্ষুর দৃষ্টি লাভ করতেন। এটাই হচ্ছে হজরত সাহেব (ক.) এর বিশেষত্ব ও অপূর্ব অবদান।
হজরত সাহেব (ক.) নির্বিলাস সভ্যতা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। বিলাসবহুল জীবনের আকাক্সক্ষা, মানুষের মধ্যে অতিচিন্তা, অতিশ্রম, অতিব্যয়, অনর্থকতা, জুলুম, অবাঞ্ছিত প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলাদলি, ঝগড়া, কলহ প্রভৃতি অশুভ প্রবৃত্তির সৃষ্টি করে যা মানুষকে বিপথগামী করে তোলে, পারিবারিক তথা সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করে এবং জাতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। তিনি অনর্থক কাজকর্মে সময় নষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তিনি অপচয়বিরোধী ছিলেন। তিনি পুরুষের রেশমি কাপড় পরিধান, মেয়ে লোকদের অলংকার পরিধান ও নাক, কান ছেদন করা মোটেও পছন্দ করতেন না। যাহা ব্যবহার ও ভোগ না করলে চলে এমন কোনো সামগ্রী ব্যবহারে তিনি দারুণ অসন্তুষ্ট হতেন। তিনি দুনিয়াকে বলতেন ‘দারুল হাজন’ বা চিন্তাপূর্ণ দুঃখের খনি। হজরত সাহেব (ক.) মানবতাবিরোধী রীতিনীতি, রিপুজনিত স্বভাব ও আচরণকে ধ্বংসকারী এবং একত্ব ও উন্নত পথের সহায়ক বহু অবদান রেখে গেছেন, যা অনন্তকাল মানবজগতে আদর্শ হিসেবে সুরক্ষিত ও কার্যকর থাকবে। ফলত মানবসমাজ যুগ যুগ ধরে খোদার নৈকট্য ও চিরশান্তি ভোগে সমর্থ হবে।