আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের হাতে যে শক্তিটি সবচেয়ে মূল্যবান, সেটি হলো-ভোট। ভোটে প্রতিনিধিত্ব তৈরি হয়। তাই ইসলাম ভোটকে কেবল একটি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে দেখছে। কাকে ভোট দেওয়া যাবে, কী হবে এর মানদণ্ড? কোরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে’ (সুরা আন-নিসা-৫৮)। ভোট এমনই একটি আমানত, যা সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। অতএব যিনি এই আমানতের যোগ্য, তাকেই নির্বাচন করা ইমানদারের দায়িত্ব। আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ আল্লাহকে ভয় করো এবং সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গী হয়ে থাকো’ (সুরা আত-তাওবা-১১৯)। এ আয়াত ইঙ্গিত করে নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিকে সামনে আনতে হবে, যিনি সত্যবাদী, নৈতিক ও সৎচরিত্রের অধিকারী। কারণ সমাজ তার নেতার অনুসরণ করে। নেতা যদি সত্যের প্রতিনিধি হন, জনগণের মধ্যেও সত্যের চর্চা জাগ্রত হয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো’ (সহিহ বুখারি)। অযোগ্য কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা সামাজিক ধ্বংস ডেকে আনে। তাই ভোট কখনো আবেগের বশে নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে দিতে হবে। বর্তমান সমাজে অফিসের কর্মচারী, ইমাম ও মুয়াজ্জিন ইত্যাদি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাত্মকভাবে যাচাইবাছাই করা হয়। দেশের বিশাল অংশের প্রতিনিধিত্বকারীকে আরও সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা বিবেকের দাবি। সমাজ ও দেশের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচনে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোটগ্রহণের কয়েকটি মানদণ্ড-
১. ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহভীরু ব্যক্তি : কোরআন বলে, ‘ন্যায়পরায়ণ হও, ন্যায়ই তাকওয়ার নিকটবর্তী’ (সুরা আল-মায়িদা-৮)। একজন নেতার প্রথম শর্ত ন্যায়পরায়ণতা। যে ব্যক্তি স্বার্থে অন্ধ হয়ে যায়, ক্ষমতার লোভে অন্যায় করে, তাকে নেতৃত্ব দেওয়া ইমানদারের কাজ নয়।
২. সৎচরিত্র ও আমানতদার : নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উত্তম নেতা তারা তোমরা যাদের ভালোবাসো এবং তোমাদের যারা ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দোয়া করো এবং তোমাদের জন্য যারা দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম) অতএব নেতা হবে সে-ই, যে সবচেয়ে ভালো চরিত্রবান, জনগণের জন্য যে কল্যাণকামী এবং জনগণ যার কল্যাণ কামনা করে। নেতৃত্ব কোনো লেনদেন নয়, এটি আমানত। যিনি দুর্নীতিগ্রস্ত বা চরিত্রহীন, তাকে ভোট দেওয়া নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি অবিচার।
৩. জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তি : ইউসুফ (আ.) বলেছিলেন, ‘আমাকে দেশের ভান্ডারের দায়িত্ব দাও, নিশ্চয়ই আমি হেফাজতকারী ও জ্ঞানসম্পন্ন’ (সুরা ইউসুফা-৫৫)। এ আয়াত প্রমাণ করে, দক্ষতা ও আমানত এই দুইটি বিষয় নেতৃত্বের অপরিহার্য শর্ত। যিনি সংশ্লিষ্ট কাজে দূরদর্শী নন এবং যার মধ্যে বিশ্বস্ততা নেই তাকে শুধু জনপ্রিয়তার কারণে নির্বাচন করা ভুল।
৪. দুর্বলদের প্রতি দায়বদ্ধ ও ন্যায়বিচারে দূঢ় : রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দুর্বলদের মাধ্যমে রিজিক ও সাহায্য পেয়ে থাকো।’ সুতরাং যে নেতা দরিদ্র, নিপীড়িত ও অসহায়দের অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ তিনিই প্রকৃত ভোট পাওয়ার যোগ্য।
৫. সত্যবাদী ও প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ত : কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! প্রতিশ্রুতি পূরণ করো’ (সুরা আল-মায়িদা-৫৫) যারা নির্বাচনের আগে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু পরে ভুল যান, তারা বিশ্বাসযোগ্য নন। ভোটের জন্য যোগ্য ব্যক্তি হতে হবে প্রতিশ্রুতির প্রতি দৃঢ়। ভোট হলো দায়িত্বপালনের অন্যতম মাধ্যম। আপনি যদি ন্যায়, নিষ্ঠা, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেন, তবে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক মহৎ কাজে শরিক হলেন। আর যদি জানার পরও দুর্নীতিবাজ, স্বার্থপর বা অসৎ কাউকে সমর্থন করেন, তবে সেই অন্যায়ের অংশীদার আপনিও হবেন। রসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ের পক্ষে শক্তি জোগায় সে আল্লাহ ও রসুলের জিম্মাহ থেকে বের হয়ে যায়’ (আবু দাউদ)। ভোটের মাধ্যমে অসৎকে শক্তি জোগানো মারাত্মক পাপের শামিল। ভোট ভবিষ্যতের আমানত। এটি এমন একটি শক্তি যা ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আবার অন্যায়কে নেতৃত্ব তুলে দিতে পারে। তাই কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশ করে ভোট দিতে হবে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিকে। ব্যক্তি, দল বা স্বার্থের ভিত্তিতে নয়; সত্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ভোট দিতে হবে। কারণ নেতৃত্ব যদি ভালো হয়, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে; আর নেতৃত্ব যদি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে যায়, মানুষ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। আজকের এই বাস্তবতায় আমাদের করণীয় ভোটের মঞ্চে সেই মানুষটিকেই সামনে আনা, যিনি সত্যের প্রতিনিধি, আমানতের যোগ্য এবং জনকল্যাণে নিবেদিত। এটাই ইসলামের নির্দেশনা, এটাই সমাজের কল্যাণ, এটাই সাময়ের দাবি।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা