রাজনীতি কখনোই শুধু নাটক বা চিৎকারের খেলা নয়। অনেক সময় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে নিঃশব্দে, চোখে পড়ে না, কিন্তু আমাদের জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। গত কয়েক মাসে আমাদের দেশে রাজনৈতিক চিত্র ঠিক এমনটাই হয়েছে-নীরব, কিন্তু গভীরভাবে প্রভাবশালী। কোথাও কোনো বড় ধ্বনি নেই, কোনো আলো নেই, কিন্তু ‘সংস্কার’ নামক ধারণা হারিয়ে গেছে, ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ আবার ভোটের হাতিয়ার হয়ে গেছে, আর আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের চারপাশের জটিলতাকে আরও বোঝার সুযোগ দেয়।
আজকের চতুর্মাত্রায় আমি এই চারটি বিষয় নিয়ে কথা বলব : সংশোধনের নিঃশব্দ পতন, ধর্মীয় আবেগের ভোটকেন্দ্রিক ব্যবহার, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধ। সবশেষে ছোট ছোট শেষ কথায় আমি দেখানোর চেষ্টা করব কীভাবে এসব বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১. ‘সংস্কার সংহতির’ নিঃশব্দ পতন
কয়েক মাস আগে আমরা রাজনীতিতে শুনতাম- ‘সংশোধন’, ‘গঠনমূলক পরিবর্তন’, ‘সমাজ সংস্কার’। এগুলো কেবল স্লোগান নয়, মানুষের মধ্যে আস্থা জাগানোর হাতিয়ারও ছিল। কিন্তু আজ এই শব্দগুলো কোথায়? কোথায় গেল সেই সংহতি, যার নাম ‘সংস্কারের এজেন্ডা’?
আজকাল রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ‘স্থিতিশীলতা’, ‘আইনশৃঙ্খলা’, ‘নির্বাচনের প্রক্রিয়া’-এই কয়েকটি শব্দ প্রায়শই শোনা যায়। সংস্কারের স্বপ্ন এখন নিঃশব্দ, চোখে না দেখা, প্রায় ভাস্বর ছায়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কোনো কমিশন হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের প্রক্রিয়া প্রায়ই রাজনৈতিক চাপের কারণে থেমে যায়। বিচারব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা, যা একসময় জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল, কখনো সরব, কখনো নীরব।
রাজনীতিবিদরা, যারা স্বার্থপর এবং স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে চলেন? প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যারা পদ্ধতিগত বাধার মধ্যে আটকে আছেন? নাকি জনগণের ক্লান্তি, যারা বারবার প্রতিশ্রুতি শুনে হতাশ হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো আমাদের ভাবায়।
দেশীয় প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট। কয়েকটি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সংস্কারের প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ এবং নির্বাচনি স্বার্থের কারণে এই উদ্যোগগুলো মাঝপথেই আটকে যায়। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা হতাশ। সারা দেশে এ ধরনের ছোট ছোট উদাহরণ লুকিয়ে আছে যেখানে সংশোধনের প্রচেষ্টা হয়, কিন্তু নীতিগত ধারার বা রাজনৈতিক সহমতের অভাবে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না।
একটা ছোট স্মৃতি-একবার আমি একটি গ্রামে গিয়েছিলাম, যেখানে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নতুন কমিউনিটি মেডিকেল প্রোগ্রাম চালু করেছিল। ছয় মাসের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে গেল। স্থানীয়দের হতাশা স্পষ্ট ছিল-তারা বলছিল, ‘আমরা আশা করি পরিবর্তন আসবে, কিন্তু সব সময় আমাদের জন্য কেবল প্রতিশ্রুতি।’ এই নিঃশব্দ পতন প্রমাণ করে শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনা বা নির্বাচনি শোরগোল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সম্ভব নয়।
আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সংশোধনের পতন কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংলাপের ধারা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষয়ও নির্দেশ করে। মানুষ যখন রাজনৈতিক সংস্কারে
বিশ্বাস হারায়, তখন ভোটকেন্দ্রিক সামাজিক আচরণও প্রভাবিত হয়। এই চক্র ভাঙতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আস্থা এবং নেতৃত্বের দঢ়তা প্রয়োজন।
২. ধর্মীয় আবেগের পুনরায় রাজনীতিকরণ
ধর্মীয় আবেগের ভোটকেন্দ্রিক ব্যবহারও নিঃশব্দভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটার মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত হচ্ছে নৈতিক দায়বদ্ধতা, পরকালের প্রতিশ্রুতি এবং ভয়ের মাধ্যমে।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের ভোটারদের প্রায় ৪৫ ভাগ ভোট দেওয়ার সময় ধর্মীয় কর্তব্য বা নৈতিক দায়বদ্ধতাকে প্রধান প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পল্লি অঞ্চলে অনেক ভোটার মনে করেন, ভোট দিলে পরকালের মুক্তি বা আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। এমনকি শহুরে মধ্যবিত্তও প্রায়শই ধর্মীয় সামাজিক চাপের কারণে নির্দিষ্ট দলের প্রতি ঝোঁক দেখায়।
হালকা ব্যঙ্গের মতো শোনালেও এক স্থানীয় ভোটার আমাকে বলেছিলেন, ‘স্যার, যদি আমি ঠিকভাবে ভোট না দিই, হয়তো পরকালে আমার নাম ভুলে যাব।’ এটি শুধু হাস্যকর নয়; এটি দেখায় কীভাবে ধর্মীয় আবেগ ভোটের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
যখন রাজনীতি বেহেশত প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেয়, গণতন্ত্রের মাটি দুর্বল হয়ে যায়। ভোটাররা চিন্তাশীল বা সমালোচনামূলক নয়, তারা প্রায়শই আবেগ এবং ভয়ের দ্বারা প্রভাবিত। এটি শুধু ভোটিং আচরণকে প্রভাবিত করে না, সামাজিক বিভাজনও বাড়ায়।
চতুর্মাত্রা মনে করিয়ে দিতে চায়-গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়া নয়, সচেতন নাগরিক গড়ার নাম। যদি ধর্মীয় আবেগ ভোটের হাতিয়ার হয়ে যায়, সমাজ দীর্ঘ মেয়াদে বিভক্ত হয়।
একটি দেশীয় উদাহরণ-পল্লি অঞ্চলের এক বাজারে ভোট নিয়ে আলোচনা চলছিল। একজন বৃদ্ধ বলে গেল, ‘যদি ঠিকভাবে ভোট না দিই, আল্লাহ আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হবেন।’ এমন অনুভূতি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণেরও হাতিয়ার।
৩. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট : অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং নৈতিকতা
দেশীয় রাজনীতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বৈঠক করেছেন। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। তারা কোয়াডের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা প্রসারিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। এই বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনাও অস্বাভাবিক নয়, অতীতে এরকম নজির আছে, যদিও তা প্রকাশিত নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নাটক শুধু দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেফরি এপস্টাইন কাণ্ড দেখায়, অর্থ, ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্পর্ক একটি বিশাল জাল তৈরি করে। এপস্টাইনের চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক, বিদেশি রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং ইউরোপীয় রাজকীয় পরিবারের নাম এসেছে। এটি বোঝায়, স্থানীয় রাজনীতি প্রায়শই আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংযুক্ত।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলা, ভেনেজুয়েলায় ‘মাদুরোকে মুক্তি দাও’ স্লোগান এবং অলিম্পিক স্থান নির্বাচন-সবই স্মরণ করিয়ে দেয়, স্থানীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং নৈতিকতার জটিলতা কখনো আলাদা নয়। স্থানীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
এই প্রসঙ্গ আমাদের শেখায় যে স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবনও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ, দেশের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলে।
৪. ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধ
রাজনীতি বা অর্থনীতি যতই জটিল হোক না কেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং মানবিক মূল্যবোধই জীবনের কেন্দ্র। আমার আর ফাহমিদার একমাত্র পুত্র, আজমাইন, যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে, তার জন্মদিন গেল ৪ ফেব্রুয়ারি। বাবা-ছেলের সম্পর্কের অনুভূতি কখনো পুরোনো হয় না।
আর ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল আমার বাবা-মায়ের বিয়েবার্ষিকী-তাঁরা আজ আর বেঁচে নেই, কিন্তু চার সন্তানকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তৈরি করেছেন। বাবা, এ কে এম খলিলুর রহমান এবং মা, শামীম পারভীন, আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন আত্মসম্মান, দায়িত্ব এবং পারিবারিক মূল্যবোধ। আজও তাদের শিক্ষার আলো আমাদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এই ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো মনে করিয়ে দেয় যে যারা আমাদের পিতামাতার কাছের মানুষ ছিলেন, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। যারা আমাদের সন্তানদের ভালোবাসেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারও একটি নেটওয়ার্ক। আমাদের উচিত এই নেটওয়ার্ককে জড়িয়ে ধরে রাখা, যত্ন নেওয়া এবং প্রজন্মের সঙ্গে মূল্যবোধ শেয়ার করা।
আজমাইনের জন্ম, প্রথম স্কুলের দিন, সবই এখনো আমার কাছে তাজা স্মৃতি। ওর বড় হয়ে ওঠা, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, সাফল্য, পুরোটাই ওর একক কৃতিত্ব। আমার অবদান নেই বললেই চলে, তবে ওর মায়ের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমি খুশি আমার সন্তানরা মানুষ হয়ে উঠছে। একটি ছোট কথা-মানবিক সম্পর্কই জীবনের স্থিতিশীলতার মূল।
শেষ কথা
এই সপ্তাহের চতুর্মাত্রার মূল আবর্ত হলো রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মীয় প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সবই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন ‘সংস্কার’ নিঃশব্দে বিলীন হয়, তখন ধর্মীয় আবেগ ভোটের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক ঘটনা আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আর সবশেষে মানবিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধই আমাদের স্থিতিশীলতার কেন্দ্র।
রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি যতই জটিল হোক না কেন শেষ পর্যন্ত মানবিক মূল্যবোধ এবং সম্পর্কই আমাদের সমাজের ভিত্তি। আমাদের উচিত সতর্ক থাকা, চোখ খোলা রাখা এবং হৃদয় খোলা রাখা। কারণ যেভাবেই পৃথিবী পরিবর্তিত হোক, মানবিক দায়িত্ব এবং সম্পর্কের গুরুত্ব কখনো হারায় না।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ