বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং সামাজিক আস্থার সংকটের ভিতর দিয়ে দেশ একটি নতুন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার প্রণয়ন ও প্রচারে ব্যস্ত। বেশির ভাগ ইশতেহারেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বা রূপরেখায় কিছু জায়গায় অভূতপূর্ব মিল দেখা যাচ্ছে, আবার আদর্শিক কারণে কিছু জায়গায় বড় ফারাক রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার কেবল ভোট আহ্বানের দলিল নয়; এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি, অগ্রাধিকার ও সক্ষমতার একটি পরীক্ষাও বটে। প্রশ্ন হলো, বর্তমান নির্বাচনি ইশতেহারগুলো বাংলাদেশের সামনে থাকা প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলো কতটা বাস্তবভিত্তিকভাবে প্রতিফলিত করতে পেরেছে? সংস্কার, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভূকৌশলগত অবস্থানের ক্ষেত্রে দলগুলোর প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার ফারাক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমস্যার লক্ষণ চিহ্নিত করা হলেও সমস্যার মূল কাঠামো পরিবর্তনের প্রশ্নে ইশতেহারগুলো সতর্ক কিংবা অস্পষ্ট।
সংস্কার ও জবাবদিহি : প্রতিশ্রুতি আছে, রোডম্যাপ নেই প্রায় সব দলই প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা বা ‘ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ’ রোধ করতে একমত। বিএনপির ‘দ্বিকক্ষ সংসদ’ এবং জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর ‘আনুপাতিক নির্বাচন’, উভয়েরই মূল লক্ষ্য সংসদে ভারসাম্য আনা। এ ছাড়াও বিচার বিভাগ এবং পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ব্যাপারে সবার অঙ্গীকার রয়েছে। সংস্কারগুলো কী নির্বাচনের পর প্রথম ১০০ দিনে হবে, নাকি ৫ বছর বা তার চেয়েও বেশি লাগবে? সংবিধান সংশোধনের মতো জটিল কাজগুলো কীভাবে দ্রুততম সময়ে করা হবে? এসব বিষয়ে সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ নেই।
ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত : ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কথা বলা হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ কেবল প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জে নয়, এটি স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা প্রধান বাধা। সরকারি ঋণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা; খেলাপি ঋণ সরকারি হিসাবে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে (আইএমএফের মতে আরও বেশি)। রিজার্ভ সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক ঋণচাপ অর্থনীতিকে কোণঠাসা করেছে। অথচ ইশতেহারগুলোতে ব্যাংকিং শাসন, রাজস্ব দুর্বলতা, রিজার্ভ অনিশ্চয়তা ও ভর্তুকি কাঠামোর বৈষম্য এসব বিষয় অনুপস্থিত। ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি, মাটি-পানি-বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নেই। ভোটাররা এখন স্লোগান নয়, সময়বদ্ধ রোডম্যাপ চায় : মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে, কর্মসংস্থান হবে কোন খাতে, কোন দক্ষতায়, কত সময়ে, এবং অও/অটোমেশনের অভিঘাত কীভাবে সামলানো হবে। বাস্তবে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি ৯-১০ ভাগের নিচে নামানো যাবে না; দরকার কঠোর মুদ্রানীতি ও রাজস্ব খাতের রূপান্তরমূলক সংস্কার। কিন্তু ‘কীভাবে’ ও ‘অর্থায়ন কোথা থেকে’, এই প্রশ্নে ইশতেহারগুলো নীরব, বিশেষত কর-জিডিপি অনুপাত ৮-৯ ভাগ থাকায়। দ্বিকক্ষ সংসদ চালানো, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়ানো বা সর্বজনীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন, এগুলোর জন্য করের বোঝা না বাড়িয়ে এই রাজস্ব কীভাবে আসবে, তার সুনির্দিষ্ট ‘ফিসক্যাল প্ল্যান’ স্পষ্ট নয়। মাত্র ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ে বেতন, ভাতা, সুদ এবং ভর্তুকিতেই বর্তমানে প্রায় ৯৩ ভাগ টাকা চলে গেলে মাত্র ৬০-৭০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বিভিন্ন ‘কার্ড’ এবং জ্বালানি বিল মওকুফ করতে লাখ লাখ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে? খেলাপি ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমিশন গঠনের অঙ্গীকার থাকলেও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। ব্যয় পুনর্বিন্যাস ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন খাতে রাষ্ট্র কম ব্যয় করবে, কোন খাতে বেশি করবে, এই কঠিন সিদ্ধান্ত ইশতেহারগুলো এড়িয়ে গেছে। জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়েই ব্যয় পুনর্বিন্যাস, অদক্ষ ভর্তুকি ও ক্ষতিকর প্রকল্প থেকে সরে আসার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সার্বভৌমত্ব : সবচেয়ে বড় নীরবতা জ্বালানি নীতিই নির্ধারণ করে চাকরি, অর্থনৈতিক স্থিতি ও জলবায়ু নিরাপত্তা। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তরুণদের বাস্তব সংকটগুলো, চাকরির অভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের অনিশ্চয়তা, এক জায়গায় এসে মিলছে। নির্বাচনি ইশতেহারগুলো এসব সমস্যার কথা বললেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, এখনো স্পষ্টভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও কেন লোডশেডিং ও দাম বাড়ে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির বোঝা কেন কমছে না, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাস্তব অগ্রগতি কেন নেই, এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর অনুপস্থিত। গত কয়েক বছরে এলএনজি আমদানি, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দেওয়া প্রমাণ করে যে জ্বালানি নীতি টেকসই ছিল না।
দলগুলো ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ’ এবং ‘গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়ন’ নিয়ে কথা বলে। মূল সংকট হলো প্রাথমিক জ্বালানির অভাব। সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ বলা হলেও বাস্তবে তা আরও বেশি (জিডিপি পরিমাপে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট এখনো রয়েছে)। আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং ব্যয়বহুল চুক্তি অব্যাহত থাকলে প্রতি বছর এ অনুপাত ২-৩ ভাগ হারে বাড়বে। তেল, এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ভর্তুকি বোঝা বেড়েছে। ইশতেহারগুলো এই নির্ভরতা কবে ও কীভাবে কমানো হবে, তার সময়সীমা ও নীতিগত রূপরেখা দেয়নি। ইশতেহারগুলোতে ‘কুইক রেন্টাল’ সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ বিলোপ এবং অসম বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের ব্যাপারে খুব সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
দুর্নীতিপরায়ণ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের ষড়যন্ত্রে গত ৫০ বছরে মাত্র ৩ ভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। দলগুলোর ইশতেহারে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার সুনির্দিষ্ট ‘ফেজ-আউট’ (চযধংব-ড়ঁঃ) পরিকল্পনা এবং স্মার্ট গ্রিড তৈরির বাজেট সোর্স নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে যায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বেলায় শুধু কথার আধিক্য, বাস্তব পরিকল্পনার অভাব। সোলার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা থাকলেও জমি, নীতি-সহায়তা, ছাদভিত্তিক ও কমিউনিটি সোলারের স্কেল-আপ, এসব বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে দ্রুত জমি ও অনুমোদন মেলে, নবায়নযোগ্য ক্ষেত্রে তা ‘অসম্ভব’ বলে চিহ্নিত হয়, এ বৈষম্যের ব্যাখ্যা ইশতেহারে অনুপস্থিত।
অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত, বাস্তবসম্মত জ্বালানি রূপান্তর ও প্রকৃতিবান্ধব চাকরির স্পষ্ট দিকনির্দেশনা চায়। ইশতেহারগুলো চাকরির কথা বললেও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের সঙ্গে চাকরির যোগসূত্র স্থাপন করেনি। এসব গ্যাপ পূরণ না হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। তরুণদের মনে যে প্রশ্নটা ঘোরে-বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত শুধু কী প্রযুক্তিগত নয়, না রাজনৈতিকও বটে?
♦ এত বড় জ্বালানি সিদ্ধান্তগুলো কে নেয়?
♦ কেন একই ভুল বারবার করা হয়?
♦ ভুল সিদ্ধান্তের বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদের ঘাড়ে পড়ে কেন?
♦ কেন ব্যর্থতার জন্য কেউ দায় নেয় না?
এই জায়গায় আসে শাসন ও জবাবদিহির প্রশ্ন। ইশতেহারগুলো দুর্নীতির কথা বলে, কিন্তু জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, লোকসান কমানো, বিতর্কিত চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতি নেই।
প্রাকৃতিক অধিকার ও জলবায়ু : উন্নয়ন ফাঁদ প্রকৃতির বিপর্যয়, অনিয়ন্ত্রিত মাটি, বায়ু এবং পানিদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ। তবু নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে প্রাকৃতিক অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ব্যবস্থাপনা এখনো মূলত প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের ভাষায় বন্দি। অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ, জলবায়ু ঋণ, নদী ও ভূমির অধিকার, জীবিকা পুনর্গঠন, এই বিষয়গুলো প্রায় উপেক্ষিত। জলবায়ু ন্যায়বিচারকে বৈদেশিক অনুদান বা প্রকল্পের বিষয় হিসেবে দেখলে ভবিষ্যৎ সংকট আরও গভীর হবে, এই উপলব্ধি ইশতেহারে অনুপস্থিত।
প্রকৃতিকে এখনো মূলত ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়। এর ফলে ‘রিসোর্স ফ্যাসিজম’ পরিচালিত উন্নয়ন ফাঁদে পরিণত হয়েছে। উৎপাদনের প্রধান প্রকৃতিকে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহারের ফলে মানুষসহ প্রকৃতির টিকে থাকার মতো কোনো মৌলিক বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে ইশতেহারগুলো দিতে পারেনি।
শাসন সংস্কার : ক্ষমতার কথা আছে, জবাবদিহির নয় জুলাই বিপ্লবপরবর্তী বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এখন প্রধান এজেন্ডা। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, এগুলো এখন আর তাত্ত্বিক আলাপ নয়, গণদাবি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সংস্কার, এসব বিষয় ইশতেহারের প্রায় নিয়মিত অনুচ্ছেদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শাসনব্যবস্থা সংস্কারের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় গ্যাপ এখানেই।
দলগুলোর রূপরেখায় রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের’ দলীয়করণের হাত থেকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি আছে। তবে কীভাবে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হবে? জবাবিদিহির আওতায় আনতে বিচার বিভাগ কতখানি সক্ষম হবে? পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা কোন কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত হবে? নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও নৈতিকতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচার কীভাবে হবে? এই প্রশ্নগুলো ইশতেহারে হয় অনুপস্থিত, নয়তো অত্যন্ত সাধারণ ভাষায় উল্লিখিত।
ভূকৌশলগত নীরবতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, এটি বাস্তবতা। অথচ ইশতেহারগুলোতে এই বিষয়টি প্রায় অনুল্লেখিত। বাংলাদেশ এখন এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। এক পাশে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ, অন্য পাশে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রত্যাশা এবং সমৃদ্ধির সহযোগী বিষয়ে সুনির্দিষ্ট চিন্তা। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের মাত্রা এবং মূল্যবোধভিত্তিক পার্টনারশিপের চিন্তাভাবনা কী?
ইশতেহারগুলতে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’, এই পররাষ্ট্রনীতিই সবার মুখে। তিস্তা ইস্যু এবং সীমান্ত হত্যা নিয়ে জোরালো আওয়াজ তোলার প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন গত সাত বছরে থমকে আছে। ইশতেহারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ দেওয়ার কথা বলা হলেও মিয়ানমারের জান্তা সরকার বা আরাকান আর্মির সঙ্গে ডিল করার নতুন কোনো কৌশল নেই। এ ছাড়া বার্মা আইন, ক্রমবর্ধমান সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে (ওচঝ) বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে দলগুলোর কৌশলগত নীরবতা লক্ষণীয়। কৌশলগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বহির্বিশ্বের চাপ ও সুযোগ, এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া হয়তো রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিশ্রুতি থেকে রূপান্তরের পথে বর্তমান নির্বাচনি ইশতেহারগুলো বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে স্পর্শ করেছে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সেগুলোকে কাঠামোগত ও বাস্তবভিত্তিক রূপান্তরের রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।
জনপ্রিয়তা ও বাস্তবতার মাঝে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব এখানে কাজ করছে। বর্তমান নির্বাচনি ইশতেহারগুলো রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক ও কাঠামোগতভাবে অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে বড় গ্যাপগুলো স্পষ্ট, অর্থনৈতিক সংস্কার, শাসন ও জবাবদিহি, জলবায়ু ও জ্বালানি বিদ্যুৎ রূপান্তর। এই গ্যাপগুলো পূরণ না হলে সরকার বদলালেও সংকট বদলাবে না। বাংলাদেশের প্রয়োজন এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা, সময়সীমা ও দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। কারণ এখানেই ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, চাকরি ও জলবায়ু নিরাপত্তার চাবিকাঠি। এই দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে না পারলে নির্বাচনের পর সরকার যেই গঠন করুক না কেন, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান বাড়বে। আর সেই ব্যবধানের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এখন শুধু নতুন সরকার নয়; প্রয়োজন একটি নতুন রাজনৈতিক সততা, যেখানে প্রতিশ্রুতি হবে বাস্তবসম্মত, শাসন হবে জবাবদিহিমূলক, উন্নয়ন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং ভবিষ্যৎ হবে মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বিত। নির্বাচনি ইশতেহার যদি সেই সাহসী সত্য বলার জায়গায় না পৌঁছায়, তবে ভোটের দিন পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের সংকট থেকেই যাবে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভ
ইমেইল : [email protected]