ভোটাভুটির মৌসুমে কান বন্ধ করে শোনা আর চোখ বুজে দেখার কাজটা ঠিকঠাক করে ফেলার জন্য তাগিদ দিতেন জালাল আহমেদ উকিল। আমার বাবার মামা তিনি। দাদির এই খালাতো ভাই, একাত্তরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অন্তরে মহাচোট পেয়ে সেই যে বিছানা নিলেন আর সুস্থতার দেখা পেলেন না। আমরা ভাই-বোনেরা তাঁকে আড়ালে ‘উকিল দাদা’ আর প্রকাশ্যে ‘দাদাজান’ বলতাম। পাবলিকের কাছে তিনি ছিলেন ‘জালাল উকিল’।
প্রশ্ন করেছিলাম, চোখ বুজে দেখা কি সম্ভব? তিনি বলতেন, পাঁঠার মতো কোশ্চেন করবা না। তোমরাই না ফিল্মি গান গাও ‘হায়রে কপাল মন্দ/চোখ থাকিতে অন্ধ’। চোখ থাকন সত্ত্বেও আন্ধা যদি হইতে পার, চোখ বন্ধ কইরা দেখতে তোমারে বাধা দ্যায় কেডা! উকিল দাদার নাতি (মেয়ের ছেলে) ইমরান হালিম বলে, কান বন্ধ করলে তো কানে বাতাস ঢুকবে না। নো বাতাস মিনস নো সাউন্ড। আওয়াজ যদি চলাচল করতে না পারে শোনার তবে উপায়?
‘শুনতে হবে মন দিয়ে। দেখতেও হবে মন দিয়ে। তা তো তোমরা, রক্তগরম যুবকরা কর না। তোমরা তাকানো আর দেখার মধ্যকার ফারাক ধরতে ব্যর্থ’ বলেন জালাল আহমেদ উকিল, ‘এই ব্যর্থতা তোমাদেরকে সমস্যা-সংকটের গভীরে ঢুকতে দেয় না। অথচ আমরা বুড়োরা সমানে গাইছি-মাটি খুঁড়লেই জল গভীরে যাও/গভীরে যাও। গানের বাণীর তাৎপর্য উপলব্ধির প্রয়োজনবোধ থাকা চাইরে ভাই।
তাৎপর্য ফাতপর্য দিয়ে আমাদের কী কাজ! বলেছি আমি, আমরা যা দেখব যা শুনব সেটাই বিচার করব। ন্যায় মনে হলে জিন্দাবাদ, অন্যায় মনে হলে অন্যায়কারীকে বরবাদ। উকিল দাদা বলেন, তোমার সঙ্গে আমি একমত। আমার কথা হচ্ছে যারে অন্যায় মনে করতেছ সেটা শতভাগ অন্যায় কিনা শিওর হতে হবে। সেভেনটির ইলেকশনের সময়ে ওই কাজটা আমি করি নাই। সেজন্য এখনো (১৯৮২ সাল) পস্তাচ্ছি।
জালাল উকিল ছিলেন আপাদমস্তক পাকিস্তানি। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) যে দলটির ভূমিধস বিজয় ঘটেছে, সেই দলকে দমন করার জন্য মিলিটারি যে নারকীয় অভিযান চালায়, জালাল উকিলের দৃষ্টিতে তা ছিল ষোলো আনা উপযুক্ত কাজ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিষ্ঠুরতা বর্জন চিন্তা উপাদেয়। তবে সর্বদা নয়। ঘরের খুঁটি মজবুত রাখার জন্য তার চারদিকে পাথরকুচি আর সিমেন্টের মিশেল দেওয়া লাগে। ওটা করতে খোঁড়াখুঁড়ি দরকার। এতে মাটির কষ্ট তো একটু আধটু হবেই। কানারা শুধু কষ্ট দেখে, মিষ্ট তাদের দুশমন যে!
একাত্তরের এপ্রিলে প্রাণ বাঁচাতে শহর ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রামের দিকে ছোটে। তাদের সঙ্গে তিনিও ছোটেন যখন শুনতে পান যে শহরের তরুণ কাপড় ব্যবসায়ী মণীন্দ্র মজুমদারকে গুলি করে মেরেছে মিলিটারি। মণীন্দ্রর বাবা যতীন্দ্র মজুমদার ছিলেন জালাল উকিলের মক্কেল। গ্রামে গিয়ে উঠলেন দূরসম্পর্কীয় এক বোনের বাড়িতে। দিন কুড়ি পরে এক দুপুরে গ্রামের মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ছিলেন উকিল দাদা। হঠাৎ কানে আসে অবিরাম গুলির শব্দ। বুঝলেন, বোনের বাড়ি আক্রান্ত। ওই বাড়িতে হানাদার সেনারা আটজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে এক এক করে গুলি করেছিল। ঘটনাটি জালাল উকিলের চোখ খুলে দেয়। তাঁর মনে হলো : এ তো খুঁটি মজবুত করার জন্য মাটিকে কষ্ট দেওয়া নয়। হানাদাররা আমাদের লোকালয় বসতি বিনাশের মতলবে মাটির পর মাটি নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে।
২.
অন্যায়ের পক্ষাবলম্বনের স্মৃতি যে পীড়া দেয় সেরকম আর কোনো পীড়া হয় না। এরকমই বলতেন রাজনীতিক আজিজুল হক। জেলা শহরে আজিজুল হক নামে তিনজন ছিলেন। বিভ্রান্তি পরিহারে জনতা তাদের
একেকজনকে আলাদা চিহ্ন দিয়েছিল। যেমন বিউটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিককে ‘বিউটি আজিজুল হক’, সোসাইটি রেস্তোরাঁ মালিককে ‘সোসাইটি আজিজ’; বাটইয়া নামক গ্রামে বাড়ি যে রাজনীতিকের তিনি ‘বাটইয়ার আজিজুল হক’।
ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী আজিজুল হককে নিষ্কলুষ মানব হিসেবে খুব পছন্দ করতেন জালাল উকিল। ঘোরতর পাকিস্তানবিরোধী বাটইয়া আজিজের প্রতি ঘোরতর পাকিস্তানপ্রেমী জালালের অনুরাগ কীভাবে সম্ভব হয়েছে, নিন্দুকেরা বিস্তর গবেষণা করেও এর কিনারা করতে পারেনি। রাজনীতিক আজিজের মুখে শুনেছি জালাল উকিলের গভীর অনুতাপের কাহিনি।
ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্রগঠনের যে আন্দোলন হয় তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল জালাল উকিলের। সরকারি গোয়েন্দারা সতর্ক করেছিল : সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির স্বয়ং শাসনের পক্ষে বিপুল গণরায় ঘটলে পাকিস্তান টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। জালাল আহমেদ একাত্তরের মার্চে দেখলেন গোয়েন্দা বার্তাই সত্য হতে চলেছে। পারিবারিক বৈঠক ডাকলেন পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য। জালাল উকিল বলেন, বৈঠকে ভোটাভুটিতে আমি হেরে গেলামরে ভাই।
ভোটাভুটি? আজিজুল হকের প্রশ্ন। উকিল জানান, ভোট মানেই ব্যালটের ব্যবহার-সব সময় এরকম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কণ্ঠভোট, মাথা এপাশ-ওপাশ করে ভোট ‘আওয়াজ না দিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ বুঝিয়ে দেওয়াও ভোট। বৈঠকে উপস্থিত আট সদস্যের মধ্যে গৃহকর্তা জালাল আহমেদ ছাড়া অন্য সবাই চায় ‘ভুট্টোর মাথায় লাথি মারো/বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল বাঙালিরা। তবু তারা দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনি। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের গরিষ্ঠ আসনে বাঙালির বিজয় তাদের রাষ্ট্র গঠনের ২৪ বছর পর কেন্দ্রের ক্ষমতায় যাওয়ার আইনি পথ খুলে দিয়েছে। অতি স্বাভাবিক এই অবস্থাটা বরদাশত করতে পারেননি জালাল উকিল। চেতনা যখন ফিরল তখন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানায় গিয়ে আজিজুল হকের সঙ্গে দেখা করলেন। স্বীকার করলেন : পরিবারের ভোটাভুটির রায় না মেনে নিয়ে তিনি বিরাট ভুল করেছেন।
গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু করেন তিনি। সেই সঙ্গে এটাও আশা করতেন যে একদিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হবে। পরিত্যক্ত হবে মুক্তিযুদ্ধ। রক্ষা পাবে পাকিস্তানের অখণ্ডতা। কিন্তু একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ জালাল উকিলের হৃৎপিণ্ড খামচে ধরল। বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধি তাঁকে কাবু করতে থাকে। ১৯৯৫ সালে ৯২ বছর বয়সে তিনি দুনিয়া ছেড়ে গেলেন।
মৃত্যুর একুশ দিন আগে উকিল দাদাকে দেখতে গেলাম। তাকানোর জন্য নিজ হাতে চোখের পাতা ফাঁক করে আমায় দেখে হাসলেন। মশকরাও করলেন। সেদিন অনেক কথার একপর্যায়ে জালাল উকিল বলেন : জগৎ-সংসার যে চলমান রয়েছে তার প্রধান কারণ ভোট। আয়োজনে খরচ অনেক, নইলে জাতীয় পর্যায়ে এটা তিন বছর অন্তর করলে উপকার। প্রতিটি ভোটাভুটি জেতা বা হারা প্রার্থীর গুণাগুণ উন্মোচন করে। উন্মোচনের পর উন্মোচন যত ঘটবে ততই তুমি বাটইয়ার আজিজুল হকের মতন সাচ্চা জনসেবক পেতে থাকবে। আরে হাসতেছ ক্যান? হাস্যকর কথা কইলাম নাকি!
তাঁকে বলেছি, আশাবাদী আপনি। আশাবাদী হওয়া বেদনাবহ কোনো ব্যাপার নয়। তাই হাসছি। যদি বলেন, হাউমাউ কেঁদে উঠতে প্রস্তুত আছি।
৩.
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় যারা তাঁর একান্ত সহচর ছিলেন তাদের অন্যতম মকবুল আহমদ নেয়াজপুরী। মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী কোথায় কবে জনসভায় ভাষণ দেবেন, সেটা তিনি চোঙ্গা ফুঁকে এলাকায় প্রচার করতেন। সেজন্য তাঁর নাম হয়ে যায় ‘চুঙ্গা মকবুল’। তিনি ছিলেন যাকে বলে অনলবর্ষী বক্তা। আমরা যখন সদ্য কলেজছাত্র, তখন তাঁর বক্তৃতা শুনতাম মনোযোগ দিয়ে।
চুঙ্গা মকবুল পাকিস্তান জমানায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে এক প্রার্থী দিলজান আলীর পক্ষে প্রচারণায় মাইকে ভাষণ দেন : হ্যাতারে ভোটে জিতানো আঙ্গো জন্য ফরজ হই গেছে। কারণ হ্যাতে ফকিরা নয়। হ্যাতার দশরকম ব্যবসা আছে। ভালো ইনকাম রুজি আছে। পাবলিকের খেদমতে দুই/দশ টিয়া (টাকা) খরচ করন হ্যাতার কাছে ফান্তাভাতের সমান। হ্যাতার বিরুদ্ধে যেই তিনজন খাড়াইছে হ্যাতারা হ্যাতাগো ইলেকশনের খরচ চালাইতেছে ভিক্ষা কইরা। মনে রাইখেন, ফকিরা দিয়া কাম চলে না। ফকিরা ভোটে জিতলে গোটা ইউনিয়নরে বেইচ্যা দিব।
ইউনিয়ন বিক্রি করে দেবে যে বললেন, ওটা কিনবে কে? আমাদের প্রশ্নের জবাবে চুঙ্গা মকবুল বলেন, ভোটের টাইমে ভোটারগোরে ডরের মধ্যে রাখা সিস্টেম হই গেছে। মানুষ গা ঝাড়া দেয় ডরে, নয়তো মহব্বতে। যে প্রার্থী ডর তাড়ায় তার জন্য ভোটারের দিলে মহব্বত জন্মায়।
লিফলেটে দেখলাম দিলজান আলী বিস্তর ওয়াদা করেছেন এলাকায় এটা করবেন সেটা করবেন। এসব ওয়াদা পূরণের জন্য লাখ লাখ টাকা লাগবে। এত টাকা উনার আছে? মকবুল আহমদ নেয়াজপুরী বলেন, না নাই। সেটা কোনো সমস্যা না। এক শ ওয়াদার মধ্যে কেন বিরাশিটা পূরণ করা গেল না, তার এক শ একটা কারণ ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা দিলজান আলীর আছে। নইলে আমি ওর পক্ষে ভোটের মাঠে নামি?
চুঙ্গা মকবুল স্বশিক্ষিত রাজনীতিক। স্কুলে পড়েছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু আমরা এতদিন পরে একটু আধটু জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি তাঁর চিন্তা আর জগদ্বিখ্যাত রাজনীতিক উইনস্টন চার্চিলের (ইনি ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী, জন্ম ৩০ নভেম্বর ১৮৭৪, মৃত্যু : ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৫) চিন্তার মধ্যে দারুণ মিল।
চার্চিল বলতেন, রাজনীতিককে থাকতে হয় সামনের দিনে, সামনের সপ্তাহে, সামনের মাসে আর সামনের বছরে কী কী ঘটবে তা বলবার সক্ষমতা। তিনি যা যা বলেছেন, সেগুলো কেন ঘটল না তা ব্যাখ্যা করবার যোগ্যতাও তাঁর থাকা প্রয়োজন।
৪.
নির্বাচনি প্রচারণায় ভোটারদের মনে আশা সঞ্চার করার জন্য সুমিষ্ট ভাষার বাক্য রচনার জন্য লোক পাওয়া যায়। এরাই প্রার্থীর পক্ষে গান তৈরি করেন, ‘বাড়িঘর করে দিব ফিটফাট/সোনা দিয়ে মুড়ে দেব পথঘাট।’ ভোটার মনে ভীতি সঞ্চারের জন্যও খাপের খাপ বচন তৈরির বন্দোবস্ত থাকে। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ নির্বাচনের সময় শাসক দল মুসলিম লীগ বলতে থাকে-বিরোধীদলীয় জোট যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা জিতে ক্ষমতায় গেলে দেশটা ভারতের কাছে বিক্রি করে দেবে।
জবাবে যুক্তফ্রন্ট নেতা শের-ই-বাংলা ফজলুল হক কুমিল্লায় এক জনসভায় বলেন : মুসলিম লীগ নয় বছর ধরে ক্ষমতায়। তারা কুৎসাচার করে আমরা নাকি দেশ বেচে ফেলব। আরে চোরার পুত চোরারা! নয় বছর ধরে দুর্নীতি চুরিচামারিতে তোরা তো দেশটারে ফোকলা করে দিয়েছিস। এখন এই ফোকলা জিনিস বেচতে চাইলেও কেউ কি কিনবে?
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন