একটি নির্বাচিত সরকারের আবির পূর্বাকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এক দিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এই নির্বাচন যখন হতে যাচ্ছে তখন দেশের ভিতরের ও বাইরের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত না হলেও এটাই বাস্তব যে সরকারের সব মহল একটি চমৎকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, একটি সুন্দর নির্বাচন করার জন্য আমরা সক্ষম। ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দল ও জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনি অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘চলো এক সাথে গড়ি বাংলাদেশ’। ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র পরিচালায় শরিয়াহ অনুসরণ করা হবে’। খেলাফত মজলিসের ইশতেহারে ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় কোরআন ও সুন্নাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ যখন নির্বাচনমুখী তখন ভারত সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, যেসব জায়গায় ভারতের জাতীয় স্বার্থ রয়েছে (প্রতিবেশীর নয়) সেগুলোর ওপর ভারত সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং স্বার্থগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি যখন এ কথা বলছেন তখন গণ অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এটি তাদের স্বার্থসম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এদিকে বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এটা স্বস্তির যে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতবিরোধিতা নেই। এ মূল্যায়নে নির্বাচনি ঘোষণা নিয়ে নানা পর্যালোচনা করা হয়েছে। নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে; বলা যায় সময়ের অপেক্ষা মাত্র, তখনো নানা আশঙ্কার অবসান হয়নি। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। ইনকিলাব মঞ্চের মিছিলে হামলা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীরা বিক্ষোভে রয়েছেন। পরিস্থিতিকে নির্বাচনবান্ধব করার যে প্রয়োজনীয়তা শুরু থেকে অনুভূত হয়ে আসছে তাতে ঠিক সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কোনো বিবেচনাতেই সেটি বলা যাবে না। সে বিবেচনায় বলা যায়, সারা দেশে ঠিক যেভাবে আগের নির্বাচনগুলোতে জোয়ার তৈরি হয়েছে এবার সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। মূলত সে বিবেচনায় বলা যায় এবারের নির্বাচন মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয় তাৎপর্যমণ্ডিত।
সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে নির্বাচনে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল তারেক রহমানের আগমন ও এনসিপির প্রতীক গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার প্রাথমিক অবসান হয়েছে। নির্বাচনি ট্রেন যখন চলতে শুরু করে তখন হাদি হত্যার মধ্য দিয়ে যে নয়া আশঙ্কার জন্ম হয়েছিল তারেক রহমানের সংবর্ধনা, জাতীয় অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা এবং ওসমান হাদির জানাজায় লাখো লোকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় আশঙ্কাও আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ট্রেন চলছে। নির্বাচনি ভাবনা নিয়ে দেখা যাক। শুরুতেই বলা ভালো, এবারের নির্বাচনে নতুন বিষয় হলো ইশতেহারে ইসলামি প্রসঙ্গ যুক্ত হয়েছে। এদিকে এ নির্বাচনকে জামায়াতে ইসলামী ইজ্জত কি সাওয়াল বলে বিবেচনা করছে। কেন করছে সে অলোচনা নতুন কিছু নয়। চব্বিশ-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাহী ঘোষণায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বাস্তবতায় প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর জামায়াতে ইসলামী নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জাতীয় নির্বাচন করছে। স্বাধীনতার পর থেকে নিষিদ্ধ থেকে নানা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার তারা পুরোনো মিত্র বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নির্বাচন করছে। সে বিবেচনায় এ নির্বাচন তাদের জন্য বিশেষ উদ্দীপনামূলক। সে কারণে সম্ভবত আগ্রহও খানিকটা বেশি। তাল-বেতাল যা-ই হোক এবারের নির্বাচনে জেতার জন্য তারা মরিয়া। ইতোমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সেসব থাক। মূলকথায় আসা যাক। তাদের মূলকথা রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে তারা বলছে, চলো একসঙ্গে গড়ি বাংলাদেশ। একসঙ্গে কথাটার রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে যে বিভাজনরেখা তৈরি করা হয়েছিল দালাল আইনে যাদের ক্ষমা করা হয়েছিল, তার মূলে ছিল একসঙ্গে দেশ গড়া।
একসঙ্গে দেশ গড়ার স্লোগানের মূল কারিগর ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ভিশন নির্ধারণ করেছিলেন দেশের মানুষকে নিয়ে। বাকশাল-পরবর্তী ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট জিয়া গঠন করেছিলেন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট পরে জাতীয়তাবাদী দল। সেখানে তিনি সমবেত করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে। এই জাতীয় ঐক্যের ফসল হিসেবে শাহ অজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং মসিউর রহমান যাদু মিয়া সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তখনো কথা অনেক উঠেছিল। তিনি সেসব পাত্তা না দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে মাথা তুলে দাঁড়াতে সর্বাত্মক উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে। কোথায় কার সঙ্গে কতটা সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তিনি নির্ধারণ করেছিলেন। একটি তলাবিহীন ঝুড়ির দেশকে তিনি পরিণত করেছিলেন আত্মনির্ভর দেশ হিসেবে। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন করে তিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রাচীর তৈরি
করেছিলেন। সে কারণে আজও জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গেঁথে অছেন। জামায়াত যখন সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাচ্ছে তখন কেউ কেউ মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন বিতর্ক তুলেছে ফ্যাসিস্টের বয়ানে। ঐক্যবদ্ধ ধারণায় অরেক ধাপ এগিয়ে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শত বিতর্ক এবং নানা গঞ্জনা সত্ত্বেও বিএনপি তাদের মন্ত্রিসভায় জামায়াতের মনোনীতকদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
বিএনপি বলছে, সবার আগে বাংলাদেশ। কথাটা নিয়ে ভাবুন। সবার আগে দেশের ভাবনাকে ভারতীয়রা বা কে কীভাবে দেখছে বোধ করি আজকের অলোচনায় সেদিকে না যাই। সবার আগে বাংলাদেশের ভাবনার মৌলিক দিক হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। একটি স্বাধীন দেশের জনগণের ভাবনায় এটি হচ্ছে মুখ্য বিষয়। গত সাড়ে পনেরো বছর বা স্বাধীনতা-পরবর্তী তিন বছরের আলোচনায় যদি ফিরে যান সেখানেও দেখবেন এ কথাই বড়-ওই সব সরকার ক্ষমতাকে বিবেচনা করেছে নিজেদের স্বার্থে। রাষ্ট্র এবং জনগণের স্বার্থে নয়। রাষ্ট্র পরিচালিত হতো অন্যের নির্দেশে। অন্য দেশের সঙ্গে মিলেমিশে। গোটা জাতি যে গত সাড়ে পনেরো বছর লড়াই করল রক্ত দিল জীবনবাজি রেখে ফ্যাসিবাদ রুখে দিল তার মূলকথা কী? দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা। সেসবের মূলকথা তো একটাই সবার আগে বাংলাদেশ। কারও রক্ত চক্ষু বা নির্দেশে নয় বাংলাদেশ চলবে দেশের জনগণের ইচ্ছা অনুবর্তী হয়ে। সুতরাং সবার আগে বাংলাদেশ গড়তে হলে গোটা জাতির দেশপ্রেমিক অংশের ঐক্যবদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই।
গত সাড়ে পনেরো বছরে রক্তদান এবং গত ৫৫ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিবেচনায় এবারের নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। যদি গণতান্ত্রিক বাটখারায় বিবেচনা করা যায় তাহলে বলতে হবে গত ৩০ বছরের বেশি একা বেগম জিয়াই এ দেশে সামরিক-বেসামরিক অগণতান্ত্রিক অসাংবিধানিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি তাঁর লড়াই শুরু করেছিলেন স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে। সে লড়াই গড়িয়েছিল বেসামরিক স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে। ঘরবাড়ি ব্যক্তিগত জীবন সব তছনছ হয়ে গিয়েছিল ফ্যাসিবাদের নির্মম আক্রমণে, হায়নার ছোবলে। সে লড়াইয়ের একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীও ছিল। ’৮৬-এর নির্বাচনে তারা ও আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ওই স্বৈরাচার টেকেনি। গণতন্ত্রই বিজয়ী হয়েছে। গত সাড়ে পনেরো বছরে হয়ে যাওয়া কথিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ভাগাভাগি করে লুটপাট করেছে। পাতানো সাজানো নানা নির্বাচনে নিজেরা আর মামুরা ছিঁড়েখুঁড়ে খুবলে খেয়েছে দেশ। আজ যে পরিস্থিতি দেশে বিরাজ করছে বাস্তবে সেটি হওয়ার কোনো করণ ছিল না। তবু হয়েছে। এবারের নির্বাচনি জনসভাগুলোর বিশেষ তাৎপর্য হলো বিপুল সমাগম। শহরে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানেই যারা সমাবেশ করেছে সেখানেই মানুষ উপচে পড়েছে। এই সমাগম একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা দেয়। যারা এসেছেন তার সবাই সবার হয়ে এসেছেন হয়তো তা নয়। তারা এসেছেন দেখতে বুঝতে শুনতে। দেখেশুনে বুঝে সিদ্ধান্ত দেবেন। নির্বাচনে তাদের বোঝাশোনাটাই গ্রহণযোগ্যতার শেষ মাপকাঠি নয়। যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন ভিতরে এবং বাইরে তাদের সততা ন্যায়নিষ্ঠতা আর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যেই কিছু কথা উঠেছে। অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। সব মিলে কথা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গণতন্ত্রকে বাঁচানো। যে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জাতির অভিভাবক বেগম জিয়া জীবন দিলেন তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হলে তাঁর প্রদর্শিত পথে হাঁটতে হবে। সবার ঐকান্তিকতা ও আন্তরিকতায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা গেলে সেটাই হবে বড় অর্জন। গণতন্ত্র বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। দেশের মানুষ বাঁচবে। স্বীকৃতি পাবে রক্তের মূল্য। নয়তো সবই গরল ভেল।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক