১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচনে ভোটের নাগরিক অধিকার প্রয়োগের জন্য মুখিয়ে আছে জাতি। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক ও সচেতন মুসলিম হিসেবে ভোট দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া উচিত ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে মৌলিক ৪টি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরি।
এক. ভোট মানে সাক্ষ্য দেওয়া
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া মানে শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ আপনি যাকে ভোট দিচ্ছেন, তার ব্যাপারে এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছেন আপনার দৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য এই ব্যক্তি সর্বাধিক যোগ্য এবং আপনার দৃষ্টিতে এ পদের জন্য তার থেকে অধিক যোগ্য কোনো প্রার্থী নেই। সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়ে ইসলামের কথা হলো, ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদান করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা হারাম। আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন ‘যখন তোমরা কোনো কথা বলো তখন ন্যায়নীতি অবলম্বন করো, সে ব্যক্তি (যার বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে) তোমাদের নিকটাত্মীয় হলেও।’ (সুরা আনআম : ১৫২)। অন্য আয়াতে ঘোষণা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো।’ (সুরা মায়িদা : ৮)। মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদান কর; তাতে তোমাদের নিজের বা পিতামাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবু।’ (সুরা নিসা : ১৩৫)। উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় এক. সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে; দুই. সত্য সাক্ষ্য এবং সত্য কথা বলতে পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। যোগ্যতম প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব বা দলীয় সম্পর্কের কারণে, অথবা বিপক্ষীয় বিরোধিতার কারণে কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা মিথ্যা সাক্ষ্যের আওতায় পড়বে। কোরআন ও হাদিসে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মিথ্যা সাক্ষ্যের নিন্দা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে ‘অতএব তোমরা মূর্তির অপবিত্রতা থেকে বিরত হও এবং মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত হও।’ (সুরা হজ : ৩০)
দুই. ভোট মানে কারও জন্য সুপারিশ করা
ভোটের দ্বিতীয় অবস্থানটি হচ্ছে সুপারিশ। অর্থাৎ প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোটদাতা যাকে ভোট প্রদান করে তার জন্য সুপারিশ করেন যে ওই প্রার্থীকে প্রতিনিধি মনোনয়ন করা হোক। ফলে শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট প্রদান করার অর্থ হচ্ছে, কোনো পদের জন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে সুপারিশ করা।
আর ইসলামে সৎ কাজের জন্য সুপারিশ করা সওয়াবের কারণ এবং অবৈধ কাজে সুপারিশ করা পাপ। আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, ‘যে লোক সৎ কাজের জন্য কোনো সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক সুপারিশ করবে মন্দ কাজের জন্য, সে তার বোঝারও একটি অংশ পাবে। বস্তুত আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।’ (সুরা নিসা : ৮৫)
তিন. ভোট অর্থ উকিল নিয়োগ
ভোটের তৃতীয় অবস্থান হচ্ছে উকিল নিয়োগ। অর্থাৎ ভোটদাতা প্রার্থীকে তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব করছেন। সুতরাং ভোট প্রদান অর্থ হচ্ছে, সম্মিলিত অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পরিষদে নিজের প্রতিনিধিত্বের জন্য উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব করা। উকিল নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সৎ, আমানতদার এবং যোগ্য ব্যক্তিকে উকিল বানানো জরুরি। বিশেষত কোনো সম্মিলিত অধিকারের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব আরও বেশি। কোনো জাতীয় দায়িত্বের প্রতিনিধিত্বে পুরো জাতির অধিকার সংশ্লিষ্ট থাকে। তাই কোনো অযোগ্য লোককে প্রতিনিধিত্বের জন্য ভোট প্রদান করা পুরো জাতির হক নষ্ট করার চেষ্টা করা, যা মারাত্মক গুনাহ।
চার. ভোট হলো আমানত
ভোটের চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আমানত। অর্থাৎ ভোট প্রদানকারী তার কাছে গচ্ছিত আমানত তার হকদারকে পৌঁছে দিচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিনিধি নিয়োগের জন্য ভোটাধিকার আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানদের কাছে আমানতস্বরূপ। সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তার কাছে থাকা আমানতটি তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানতগুলো তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেবে। (সুরা নিসা : ৫৮)
অতএব, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ ব্যাপারটি এমন সরল নয়। বরং বাস্তবতা হলো, ‘আমার ভোট আমি দেব, বুঝেশুনে যোগ্য ব্যক্তিকে দেব।’ আল্লাহ আমাদের সেই তওফিক দান করুন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী, গাজীপুর