নির্বাচন হলো জনগণের উৎসব। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সে উৎসবের ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। দেশের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের একটি আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৩তম সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করায় তাদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সর্বপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পলাতক বা আত্মগোপনে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তারা আদৌ অংশ নিতেন কি না, তা এক প্রশ্নের বিষয়। স্বীকার করতেই হবে, জুলাই গণ অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামায়। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘকাল ঐতিহ্যবাহী ওই দলটি বাঘ সেজে নিজেদের দাপট দেখিয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু জনসমর্থন হারিয়ে তারা হয়ে পড়েছিল কাগুজে বাঘ। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মোকাবিলায় তাদের নেতা-কর্মীরা রাজপথে নামার সাহসও পাননি। ফলে ছাত্র-জনতার ধাক্কাতেই ক্ষমতার সৌধ ধসে পড়ে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরই নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের পক্ষে সারা দেশে ৬-৭টির বেশি আসনে জয়ী হওয়াও কঠিন হতো।
সে দুরবস্থা থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগকে খাদের কিনার থেকে এ সুশীল সরকার উদ্ধার করেছে। গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের মনে ঠাঁই নেওয়ার মতো কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে রূপকথার ভূতের মতো তারা পেছনপানেই হেঁটেছে। ১৮ মাসে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ার বদলে কমেছে। বন্ধ হয়ে গেছে শত শত কলকারখানা। লাখ লাখ মানুষ বেকারত্বের শিকার হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে মব সন্ত্রাসে মদত থাকার কারণে।
ছাত্র-জনতার আহ্বানে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো সর্বস্তরের মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। তারা শুধু গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নয়, আশা করেছিল এ অভ্যুত্থান তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে অবদান রাখবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামানো সম্ভব হবে। কিন্তু গণ অভ্যুত্থানের রেশ না কাটতেই মানুষের আশা হতাশায় পরিণত হয়। লাখ লাখ মানুষ বেকারত্বের শিকার হয় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। আইনশৃঙ্খলা ১৪০০ বছর আগের মাৎস্যন্যায় অবস্থায় ফিরে যায়। মব সন্ত্রাসকে ‘মব জাস্টিস’ বলে অভিহিত করার প্রবণতাও দেখা দেয় দেশজুড়ে। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের অপকর্ম ঢাকা পড়ে যায় এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রবণতায়।
১৯৭৫ সালে ক্ষমতা হারানোর ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। জাতীয় পার্টির সমর্থনে তারা সরকার গঠনেও সক্ষম হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হলেও আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ছিল শতকরা হিসেবে আগের নির্বাচনের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের কাছে তারা হেরে গেলেও ভোট পায় ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ। অপরদিকে বিএনপি পায় ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সোজা কথায় ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে আগের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে ৪৯ শতাংশ ভোট নিয়ে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি পেয়েছে ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি দুই প্রধান দলের যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে ভোটযুদ্ধ হলে তা গুরুত্ব হারায়। বিগত তিনটি নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররাও ভোট দেওয়ার গরজ অনুভব করেননি। প্রতিপক্ষ না থাকলে ভোটযুদ্ধ যে জমে না ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও তা প্রমাণিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সে নির্বাচন বর্জন করে। ফলে নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপি সমর্থকদেরও গরজ ছিল না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসময়ের মিত্র বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের বিরুদ্ধে রণসাজে সজ্জিত হয়ে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার এবং তারা প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে।
আওয়ামী লীগ অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেলেও দলটি নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়নি। দলের সমর্থকদের একাংশ আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বিএনপি এবং জামায়াত দুই দলই নৌকার ভোট পেতে নানামুখী কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ জামায়াত বিরোধিতায় নিজেদের চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই ভাবে। তা জেনেও জামায়াত জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর নিজেদের নির্বাচনি কৌশল সাজায়। দেশের সর্বত্র তারা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের পাশে দাঁড়ায়। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনেও জামায়াত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আরেক প্রতিপক্ষ বিএনপির ভূমিকা ছিল মারমুখী। তবে তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বিএনপি নির্বাচনি প্রচারণায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। যা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মননে নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটিয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর ‘মজলুম’ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশে জামায়াতের সহানুভূতির হাত বাড়ানো নির্বাচনি লড়াইয়ে তাদের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এগিয়ে রাখে। তবে দলটির বি-টিম, সি-টিম, ডি-টিম বলে কথিত বিভিন্ন সংগঠনের কার্যকলাপে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভাবনায় চিড় ধরায়। লীগ সমর্থকদের একাংশ বিএনপিকে ঠেকাতে এখনো জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার পক্ষে। অন্য অংশ জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে অভিহিত করে তাদের ঠেকাতে ধানের শীষের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বড় অংশ যেদিকে যাবে সেদিকেই ভারী হবে জয়ের সম্ভাবনা।
দুই
প্রতিটি নির্বাচন জাতিকে কিছু না কিছু উপহার দেয়। সেই পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আমরা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে পেয়েছিলাম। ’৭০-এর নির্বাচনে পেয়েছিলাম স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সবক। ’৯১-এর নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে ২০০২৬-এর নির্বাচন জাতিকে কী উপহার দেবে? আমি দুই প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার পড়েছি। এ সম্পর্কে আমার কোনো সমালোচনা নেই। শুধু বলব দুই ইশতেহারের কোনোটি বাস্তবায়নের অবস্থা এখন বাংলাদেশে নেই। তবে তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ২০২৬-এর নির্বাচন জাতিকে অনির্বাচিত সরকারের কবল থেকে মুক্তি দেবে। যে সরকার দেশের উন্নয়নের বদলে বিদেশের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে বেশি উৎসাহ দেখিয়েছে। দেশের বন্দর বিদেশের হাতে ইজারা দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছে। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আমেরিকার সঙ্গে এমন এক চুক্তি করেছে, যা গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা। চুক্তিতে কী আছে, তা দেশবাসীর অজানা। সবকিছু গোপন রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগেই নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট সই করেছে বিশ্ববরেণ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্জন কী, তা স্পষ্ট নয়। চুক্তির ফলে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরাও উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, চুক্তির ফলে দৃশ্যত শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ কমবে। তবে এজন্য বাংলাদেশের ঘাড়ে কোন কোন বোঝা চাপানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। চুক্তির গোপনীয়তা বজায় রাখার যে সমঝোতা হয়েছে, তা জনমনে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। পতিত সরকারের যেসব সদস্য বিদেশে বসে জুলাই গণ অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে, এ চুক্তি তাদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের বাড়তি গরজ অনুভব করেছে তা জাতির কাছে স্পষ্ট নয়। একান্তই যদি এ ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে, তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের সম্মতি নিয়ে তা করা যেত। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার আগাম চুক্তিতে আবদ্ধ থাকায় সরকারের পক্ষে সে পথে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ী শুধু নয়, বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে জড়িত সব মহলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সরকারের জন্য অপেক্ষা করলে সেটিই হতো সর্বোত্তম। কারণ দেশের মালিক এনজিওনির্ভর অন্তর্বর্তী সরকার নয়, ১৮ কোটি মানুষ। বিদেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করলে তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের মর্যাদাই বৃদ্ধি পেত। চুক্তির প্রতি জনসমর্থনও নিশ্চিত হতো। সে পথে না গিয়ে তারা নিজেদের যেভাবে বিতর্কিত করেছে, তা সত্যিকার অর্থেই দুর্ভাগ্যজনক।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]