বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু পরিবার আছে, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই কেবল ক্ষমতার গল্প ভেসে ওঠে না, ভেসে ওঠে একটি জাতির জন্মযন্ত্রণা, গণতন্ত্রের জন্য রক্তঝরা সংগ্রাম, নিরন্তর ত্যাগ আর মানুষের অধিকারের পক্ষে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকার এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর উপাখ্যান। জিয়া পরিবার তেমনই এক নাম। এই পরিবার রাজনীতি করেছে ক্ষমতার মোহে নয়; করেছে রাষ্ট্রের জন্য, মানুষের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। আর সেই রাজনীতির মূল্য হিসেবে তারা দিয়েছে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সবকিছু।
এই ইতিহাসের সূচনা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। একজন মুক্তিযোদ্ধা, দিয়েছেন মহান স্বাধীনতার ঘোষণা। তারপর রাষ্ট্রনায়ক-যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত ও দিশাহীন বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আত্মমর্যাদা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ উন্নয়ন, খালখনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এসব ছিল কেবল নীতিমালা নয়; ছিল একটি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তাঁর নির্মম শাহাদাত শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ছিল না, তা ছিল একটি পরিবারের জীবনে নেমে আসা চিরস্থায়ী শোক এবং একটি জাতির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ওপর নেমে আসা গভীর অন্ধকার।
এই শোক বুকে ধারণ করেই রাজনীতির কঠিন পথে পা রাখেন বেগম খালেদা জিয়া। একজন শহীদের স্ত্রী, একজন গৃহিণী থেকে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠা-এ ছিল এক নারীর অসম্ভব সাহস, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের জীবনে আসে দৃশ্যমান পরিবর্তন-খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রসার। এ সাফল্যের বিনিময়ে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে নিরন্তর নিপীড়ন, অপমান ও প্রতিহিংসার রাজনীতি।
এক-এগারোর অবৈধ শাসন তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করতে চেয়েছিল। তিনি যাননি। তিনি বলেছিলেন দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা। এই দেশ ছেড়ে, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। কারণ তাঁর কাছে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানে ছিল মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করা।
এরই ধারাবাহিকতায় তাঁকে এবং তাঁর দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকা ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। প্রবাসের নিঃসঙ্গতা, মানসিক নির্যাতন আর স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় কোকোর অকালমৃত্যু জিয়া পরিবারকে ভেঙে দেয় ভিতর থেকে। যে ক্ষত আজও শুকায়নি, হয়তো কোনো দিন শুকাবেও না। ২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর ছিল সেই নিষ্ঠুরতার আরেক চূড়ান্ত অধ্যায়। স্বৈরাচার হাসিনা সরকার শহীদ জিয়ার প্রায় ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেয়। তালা ভাঙা হয়, গ্রিল কাটা হয়, লোকজনকে মারধর করা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তখন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিসহ তাঁর সম্মান সেদিন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এ দৃশ্য কেবল একজন নেত্রীর নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার সামনে এক অসহায় নারীর আর্তনাদ, যা আজও মানুষের বিবেক নাড়া দেয়।
এই দুই মহান ব্যক্তিত্ব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ, ত্যাগ ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করেই রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্ব কোনো হঠাৎ আবির্ভাব নয়; এটি এক দীর্ঘ সংগ্রাম, শোক ও অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা নেতৃত্ব। শৈশব থেকেই রাষ্ট্র ও রাজনীতির বাস্তবতা তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি দেখেছেন ক্ষমতার ভিতরের জটিলতা যেমন তেমনি দেখেছেন ক্ষমতার নির্মমতা ও নিপীড়নের অন্ধকার দিক।
১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬। এই দুই মেয়াদে সরকার পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অর্থনীতি, প্রশাসন, উন্নয়ন ও কূটনীতির জটিল পাঠ তাঁকে করেছে একজন কৌশলী সংগঠক ও পরিণত রাজনীতিবিদ। তিনি আবেগে নয়, সিদ্ধান্ত নেন অভিজ্ঞতার আলোকে; প্রতিহিংসায় নয়, রাজনীতি করেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
তবে জনপ্রিয়তা ও সম্ভাবনাই তাঁর জীবনে হয়ে ওঠে কাল। এক-এগারো-পরবর্তী সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডের নামে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। শরীর ভেঙে দেওয়া হয়, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে দেওয়া হয়। বিনা অপরাধে ৫৫৪ দিনের কারাবাস এবং শেষে চিকিৎসার নামে বাধ্যতামূলক নির্বাসন, যা আজ প্রায় ১৮ বছরের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে রূপ নেয়।
এই নির্বাসনের অন্ধকার দিনগুলোতেই নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত।
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রিয় ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছায় তারেক রহমানের কাছে। মুহূর্তেই তিনি যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন; কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারপর নেমে আসে এক দীর্ঘ, নীরব শোক। বুকভাঙা সেই কান্না, যার প্রতিধ্বনি আজও তাঁর সংযত নীরবতার গভীরে লুকিয়ে আছে। প্রবাসে দাঁড়িয়ে ছোট ভাইয়ের শেষবিদায়টুকু পর্যন্ত না দেখতে পারার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়; তা কেবল হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা এক চিরস্থায়ী ক্ষত।
প্রিয় ছোট ভাইয়ের মৃত্যু ও বিনা দোষে অসুস্থ মায়ের কারাবরণ। একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে বড় অসহায়ত্ব আর কী হতে পারে? তবু এই সীমাহীন বেদনার মধ্যেও তারেক রহমান প্রতিশোধের রাজনীতি বেছে নেননি। তিনি বেছে নিয়েছেন ধৈর্য, সংগঠনের শক্তি এবং সময়ের প্রতি আস্থা। শোককে শক্তিতে রূপ দেওয়ার কঠিন কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ পথ।
প্রবাসে থেকেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভার্চুয়াল নির্দেশনা, সংগঠনের পুনর্গঠন, ‘এক দফা’, ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ এসব আন্দোলন পরিণত হয় গণমানুষের কণ্ঠে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতন সেই সংগ্রামেরই পরিণতি। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাঁর দেশে ফেরা ছিল মানুষের জমে থাকা ভালোবাসার বিস্ফোরণ। কিন্তু নিয়তি আবারও নির্মম হয়। মাত্র কদিন পরই দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল। শোকের মাঝেই প্রমাণ হয়, জিয়া পরিবার কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবার নয়-এটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও আশা-ভরসার ঠিকানা।
আজ তারেক রহমানের নেতৃত্ব অহংকারহীন, সংযত ও মানবিক। তাঁর রাজনীতি প্রতিশোধের নয়, পুনর্গঠনের। নির্বাচনি ইশতেহারে উঠে এসেছে মানুষের জীবনের বাস্তব চাহিদা-ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি। এসব প্রতিশ্রুতি ক্ষমতার লোভ থেকে নয়; এসেছে ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ যন্ত্রণার গভীরতা থেকে।
জিয়া পরিবার দেশের জন্য কী ত্যাগ করেনি? একজন নিজের জীবন দিয়েছেন দেশের জন্য, একজন হারিয়েছেন তাঁর কলিজার টুকরা সন্তান, স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও হারিয়েছেন স্বাধীনতা, একজন হারিয়েছেন প্রিয় ভাইকে এবং কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের কষ্টকর নির্বাসন। দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে এই পরিবারের স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন প্রায় ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। তবু তাঁরা কখনো থামেননি, কখনো মাথা নত করেননি। সব কষ্ট বুকে চেপে রেখেও তারা পথচলা অব্যাহত রেখেছেন দেশের মানুষের পাশে।
এখন প্রশ্ন একটাই, এত ত্যাগের কী কোনো মূল্য নেই? ইতিহাসই তার উত্তর দেয়। মানুষ মূল্যায়ন করেছে, আজও করছে, ভবিষ্যতেও করবে। জানাজায় মানুষের অশ্রুসিক্ত ঢল, প্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তনে জনসমুদ্র, নির্বাচনি জনসভায় মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতি। এসবই স্পষ্ট করে বলে দেয়, জিয়া পরিবার কখনোই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। যাবেও না।
কারণ এই পরিবার ক্ষমতার রাজনীতি করেনি; করেছে মানুষের রাজনীতি। মানুষের দুঃখ, আশা ও অধিকারকে হৃদয়ে ধারণ করেই তাদের পথ চলা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, আহ্বায়ক, আমরা বিএনপি পরিবার ও সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল